সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:২৯ এএম


প্রাথমিক শিক্ষার আধুনিকায়ন ও বাস্তবায়নে কিছু সুপারিশ

মোহাম্মদ হেলাল হোসেন

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ২৩ জানুয়ারি ২০২০  

সহস্রাব্দের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে লেখার মাধ্যমে। যে কোনো বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান, ধারণা, তত্ত্ব, উদ্ভাবন, বোধ, অনুভূতি সংরক্ষণ করার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে লিখন। সৃষ্টির আদি থেকে মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান লিপিবদ্ধ করে গেছেন প্রাঞ্জল লেখনীর মাধ্যমে। আর সেই জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে যায় প্রাঞ্জল পঠনের মাধ্যমে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রাঞ্জল পঠন ও লিখন শেখানো অত্যন্ত জরুরি।

কেননা শিশু বয়সে শেখার যোগ্যতা ও আয়ত্ত করার দক্ষতা থাকে সর্বাধিক। আর শিশুদের যথার্থ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখন শেখানো অত্যাবশ্যক। আর এর মাধ্যমে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নত হতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) অভীষ্ট-৪ (মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ) অর্জনের ক্ষেত্রে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখনশৈলীর উন্নয়ন অন্যতম গুরুত্ববহ উপাদান।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইতিমধ্যে সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। আর প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের পঠন ও লিখনশৈলী বৃদ্ধিকরণসংক্রান্ত ৯ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখনশৈলীর উন্নয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখনের গুরুত্ব

প্রাঞ্জল পঠন বলতে মূলত শুদ্ধ উচ্চারণে সঠিক অভিব্যক্তি সহকারে সুখশ্রাব্য গতিতে পাঠ করা বোঝায়। উচ্চারণ, অভিব্যক্তি এবং গতি এ তিনটি অনুষঙ্গের যে কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে প্রাঞ্জল পঠন সম্পূর্ণ হয় না। একইভাবে প্রাঞ্জল লিখন বলতে মূলত বোঝায় শুদ্ধ শব্দচয়নে, সঠিক বানানে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো বিষয়ের লিখিত উপস্থাপন।

আন্তর্জাতিকভাবে ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার যেসব মানসম্মত পদ্ধতি আছে যেমন : ইংরেজি ভাষা দক্ষতার জন্য ওঊখঞঝ, ঞঙঊঋখ, জেঊ, গেঅঞ-এর মতো পরীক্ষার উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ইংরেজি পঠন ও লিখন দক্ষতা। ইংরেজির মতো বাংলা ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্যও বাংলা পঠন ও লিখন জরুরি। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজিতে তো বটেই, বাংলা ভাষার পঠনেও যথেষ্ট দুর্বলতা দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘রুম টু রিড’-এর শিশু শিক্ষার্থীদের বাংলা পঠন দক্ষতা নিয়ে এক রিপোর্টে দেখা গেছে, আমাদের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠে শিক্ষার্থীরা শব্দ বুঝে উচ্চারণ করে মিনিটে ৩৩টি শব্দের বেশি পড়তে পারে না। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার এ ধাপে শব্দ বুঝে মাতৃভাষা উচ্চারণ করে পড়তে পারার হার মিনিটে ৪৫ থেকে ৬০টি শব্দ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারে না। প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন’। সেমতে আমাদেরও বাংলা লিখন ও পঠনের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। আর এর পাশাপাশি ইংরেজি লিখন ও পঠনে গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।

প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের পঠন ও লিখনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো

সঠিক বই না থাকার কারণে লাইব্রেরিতে না যাওয়ার প্রবণতা। মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব। শিক্ষার্থীদের প্রেরণা না জোগানো। গণমাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত অনুষ্ঠানমালার অভাব, সঠিক আকৃতিতে বর্ণগুলো লিখতে না পারা। শব্দ শনাক্ত ও সঠিক উচ্চারণ করতে না পারা। বিরাম, যতিচিহ্ন অনুসরণ না করা এবং ভুলভাবে ও না বুঝে পড়া।

প্রাঞ্জল পঠনশৈলীর উন্নয়নে প্রস্তাবিত রোডম্যাপ

শিক্ষকদের করণীয় : নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস করা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ইংরেজি ও বাংলা ম্যাগাজিন ও পত্রিকা পাঠ। বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বই পড়ার জন্য সময় দেয়া। ফেসবুক বা ইউটিউবে সময় অপচয় না করে ভালো গল্প, উপন্যাস পড়ার অভ্যাস করা। পঠন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দৃষ্টির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডার বাড়ানো। বেশি বেশি বই পড়া। প্রাথমিক স্কুলে শুদ্ধ পাঠের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করানো। সম্মিলিতভাবে সাপ্তাহিক স্কুল পত্রিকা প্রকাশনার ব্যবস্থা গ্রহণ।

প্রাঞ্জল লিখনশৈলীর উন্নয়নে প্রস্তাবিত রোডম্যাপ

শিক্ষার্থীদের করণীয় : সুন্দর হাতের লেখা দেখে দেখে অভ্যাস করা। এক প্যারা থেকে আরেক প্যারার মাঝে পর্যাপ্ত ফাঁকা রাখা। বামে ও পরে সোয়া এক ইঞ্চি ফাঁকা রাখা ও মার্জিন মেইন্টেইন করা, যাতে হাতের লেখা সুন্দর দেখায়। হাতের লেখা দ্রুত করার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর করার ওপর জোর দেয়া। বাংলা ও ইংরেজি লাইন টানা খাতায় লেখা চর্চা করা। অক্ষরগুলো যেন খুব ছোট না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখা।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেরণা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা। কীভাবে লিখতে হবে তার নিয়মগুলো জানানো (যেমন শব্দগঠন, সঠিক শব্দের ব্যবহার ইত্যদি)। লেখার অনুশীলন প্রদান। শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে গঠনমূলক মতামত প্রদান করা। ভালো লেখার খাতাগুলো অন্যদের পড়ে শুনিয়ে কেন ভালো তা ব্যাখ্যা করা। দুর্বল লেখার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কীভাবে তা উতরে যেতে হবে তা বলে দেয়া। ক্লাসে নিয়মিত লেখার অনুশীলন করানো।

উপর্যুক্ত রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সুপারিশগুলো

দারিদ্র্যপীড়িত উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবারগুলোতে বাচ্চারা বাসায় গিয়ে হোমওয়ার্ক চর্চার মতো উপযুক্ত পরিবেশ পায় না। তাই এ অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষেই বাংলায় শ্রুতলিপি ও দ্রুতপঠন এবং ইংরেজিতে জধঢ়রফ ডৎরঃরহম ও জধঢ়রফ জবধফরহম অনুশীলনের মাধ্যমে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখন দক্ষতা অর্জন করা যায়।

শুধু পাঠ্যবই নয়, এর পাশাপাশি অন্যান্য বয়সোপযোগী গল্প, উপন্যাস, পত্রিকা, সংবাদপত্র, ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস ও বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। যত বেশি পড়া হবে, ততই পড়ার এবং বোধগম্যতার গতি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বোধগম্য পাঠের গতি বৃদ্ধির সঙ্গে লেখার ক্ষমতা এবং গতিও বৃদ্ধি পাবে। তাই বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও যেন বাচ্চারা পড়ে সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সব প্রাথমিক স্কুলে সাপ্তাহিক স্কুল পত্রিকা প্রকাশনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উক্ত পত্রিকায় স্থান পাবে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের লেখা গল্প, কবিতা, চিত্রাঙ্কন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-সংস্কৃতি পরিচিতি, কুইজসহ স্কুলের কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্র। উক্ত পত্রিকাটি ওই জেলার প্রাথমিক স্কুলের সব শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করতে হবে; ফলে তাদের মাঝে পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

শিশুদের পঠন দক্ষতা বাড়ানার জন্য বেশি বেশি বই পড়তে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এমন বই নির্বাচন করতে হবে, যেন বইটিতে বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা থাকে, শিশুদের বইয়ে শিশুদের পরিচিত শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি থাকে, বাক্যগুলো অর্থপূর্ণ হয়। বাক্যের মধ্যে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, শিশুদের পরিচিত জগৎ সম্পর্কে কথা থাকতে হবে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে আকর্ষণীয় রঙিন ছবি থাকতে হবে, শব্দের পুনরাবৃত্তি থাকতে হবে, বইয়ের লেখাগুলো পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ামূলক হতে হবে।

পঠন দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রতিদিন রিডিং পড়ানোর মাধ্যমে, বিভিন্ন রিডিং গেম করানোর মাধ্যমে, শব্দ গেমের মাধ্যমে, বর্ণ দিয়ে শব্দ তৈরির মাধ্যমে, নিজস্ব চিন্তায় খাতায় লিখতে দেয়ার মাধ্যমে, ছবি ও শব্দের মিল করার মাধ্যমে দৃষ্টির আয়ত্তাধীন শব্দভান্ডার বাড়ানো সম্ভব।

লিখন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষকরা যদি নিয়মিত প্রেরণা দেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের লেখার উন্নতি করার চেষ্টা করবে এবং নিয়মিত প্রচেষ্টা চলতে থাকবে। ভালো লেখার জন্য শিক্ষার্থীদের যথাযথ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করতে হবে। হাতের লেখা খারাপ হলে তা পাঠককে আকৃষ্ট করে না। বিশেষত শিক্ষার্থীদের জন্য হাতের লেখা গুরুত্বপূর্ণ; তাই হাতের লেখার চর্চা ছোটবেলা থেকেই করাতে হবে।

সংগীত, আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থাপনা, অভিনয়ের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ দ্রুত ও প্রাঞ্জল পঠনের অভ্যাস তৈরি করে। একই সঙ্গে রচনা বা গল্প লেখার প্রতিযোগিতা আয়োজন প্রাঞ্জল লেখার দক্ষতাও বৃদ্ধি করে। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা যেতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ঘোষিত ‘ঙহব ফধু ড়হব ড়িৎফ’ কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মাধ্যমে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে শুদ্ধভাবে পড়তে ও লিখতে শিখবে।

প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করার জন্য লাইব্রেরিতে শিশুদের উপযোগী বই রাখতে হবে, যেমন রঙিন ছবি ও মজাদার ছড়া, গল্প যা শিশুদের পঠন দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক।

প্রাঞ্জল পঠন ও লিখন একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ ও প্রমিত ভাষায় কথা বলতে শেখায় এবং তার যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি তাকে তার নিজের দক্ষতার ওপর আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে যে প্রজন্ম, তাদের জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি, আবিষ্কার, সৃজনশীলতা, গবেষণার মতো কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি একটি আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই প্রাথমিক স্তরে প্রাঞ্জল পঠন ও লিখনের গুরুত্ব অপরিসীম।

মোহাম্মদ হেলাল হোসেন : জেলা প্রশাসক, খুলনা

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর