রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২০:৩৯ পিএম


প্রাথমিক শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টির অপপ্রয়াস চলছে

মো. সিদ্দিকুর রহমান

প্রকাশিত: ১১:০২, ৩১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১১:১২, ৩১ অক্টোবর ২০১৯

গত ২৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রাথমিক শিক্ষকদের যে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল, তা অনেকটা ১৯৮১ সালের মহাবিক্ষোভের কথা মনে করিয়ে দেয়। সরকারের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সংশ্লিষ্টরা সমাবেশে বাধা প্রদান করে প্রাথমিক শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের উষালগ্নে চরম অভাবের মাঝেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের জাতীয়করণ করে ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তার আদর্শ অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন।

এছাড়াও শিক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশে-বিদেশে শিক্ষাবান্ধব সরকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু সরকারের অনেক অর্জনের পরও প্রাথমিক শিক্ষকরা বৈষম্যের যন্ত্রণায় অস্থির। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তিনি আজীবন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামী ইতিহাস জানার মাধ্যমে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে বর্তমান প্রজন্ম। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিক্ষকরা বৈষম্য দূরীকরণের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা লাভ করবেন।

দীর্ঘ একযুগ এ প্রজন্মের নেতারা প্রাথমিক শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা না জেনে এসেছে। তারা শুধু অজানা আলোর পেছনে ছুটেছে। ফলে তারা জানতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাস।

প্রাথমিক শিক্ষায় এখনও চরম বৈষম্য বিদ্যমান। এ বৈষম্য দূর না হওয়ার জন্য সর্বাগ্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায় উপলব্ধি করছি। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক শিক্ষা আজ সংকটে।

সংকট উত্তরণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রাথমিক শিক্ষকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেমন- শিক্ষার্থী কম কেন? শিক্ষার্থীরা পাঠে দুর্বল কেন? বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত কেন? শুধু হইচইয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ কেন তাদের কর্মকাণ্ড? কেন প্রশ্নের জবাব শুধু ‘যত দোষ নন্দ ঘোষে’র প্রবাদের মতো। বিদ্যালয় দীর্ঘসময় থাকে শিক্ষকশূন্য, কারণ শিক্ষকদের নানা কাজে টানাটানি করা হয়।

ভাবখানা এমন, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কর্মজীবীদের মতো সকাল ৯টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করাবেন আর কিন্ডারগার্টেন চলবে ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত! একদিকে কিন্ডারগার্টেনের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি ও প্রসারে সুযোগ দেয়া হবে আর অন্যদিকে শিক্ষকদের নানা কাজে ব্যস্ত রেখে প্রাথমিক শিক্ষায় ভালোবাসার নামে প্রতারণা করা হবে! এমনটি কাম্য নয়।

অপরদিকে মিথ্যাচারের কশাঘাতে চলছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছেন শিক্ষক নেতারা। প্রাথমিক শিক্ষকদের ঐক্য পরিষদ, মহাজোট, প্রধান শিক্ষকদের দুটি সংগঠন, পুল, প্যানেল, মা শিক্ষক সংগঠন নামে তিনটিসহ সহকারীদের অসংখ্য সংগঠনের মাঝে অবস্থান করছে প্রাথমিকের শিক্ষকসমাজ। এসব সংগঠন অস্তিত্ববিহীন নেতাসর্বস্ব, যাদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছাড়া কেউ নেই

। তারাও মঞ্চে শরিক সংগঠন হিসেবে ঐক্য পরিষদ বা মহাজোটে অবস্থান করছেন। অতি দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, প্রাথমিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে কোনো সংগঠন দৃশ্যমান নয়। তাদের আদর্শ হল যখন যে কর্মকর্তা, মন্ত্রী থাকবে তখন তাদের সেবায় মশগুল থাকা।

তাদের শিক্ষা বা শিক্ষকদের সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদের ভাষায় কথা বলার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার সময় আজকের ঐক্য পরিষদ বা মহাজোট কারও মধ্যে প্রতিবাদের সুর দেখা যায়নি। আজ যখন সাধারণ শিক্ষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন নেতারা ১১তম গ্রেড নিয়ে মায়াকান্না কাঁদছেন। তারা এ ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক তা সময়ই বলে দেবে।

আমার বদ্ধমূল ধারণা, নেতারা নেতৃত্ব করছেন তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তা না হলে ঐক্য পরিষদ ২৩ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে, অথচ আগের কর্মসূচি বাতিল করে মহাজোট একই দিনে কেন বিভাগীয় সমাবেশ ডেকেছে? শিক্ষকদের বিভিন্ন সভায় যোগদান করে যা আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে তা হল, নেতারা নেতৃত্বের মোহ থেকে এখনও বের হতে পারেননি।

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে আন্দোলন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আন্দোলন গাছের ফল নয়, আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনে নিঃস্বার্থ কর্মী থাকতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।’

প্রাথমিকের শিক্ষক নেতাদের অনৈক্য ১১তম গ্রেড প্রাপ্তির প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। সচিব, প্রতিমন্ত্রীর নীরবতা কখন ভাঙবে জানি না। প্রায় চার লাখ শিক্ষকের প্রত্যেকের মনে এক দফা দাবি আদায়ের আগুন জ্বলছে।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিন। একটি প্রবাদ আছে- ‘মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা’ সমান কথা। প্রাথমিক শিক্ষকদের মনে অশান্তি থাকলে কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ সফল হবে না। প্রাথমিক শিক্ষকদের এক দফা দাবি বাস্তবায়ন হলে বঙ্গবন্ধুর বৈষম্যহীন নীতির জয় হবে।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

সূত্র দৈনিক যুগান্তার

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর