শনিবার ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০:০০ এএম


প্রাথমিকে পুরোনো প্রযুক্তিতে ডিজিটাল প্রকল্প!

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশিত: ০২:১৭, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:০০, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রায় এক দশক আগের পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের ব্যয়বহুল `মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম` স্থাপনের প্রকল্প `প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প-৪` নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এখন অপেক্ষাকৃত কম খরচে যেখানে `ডিজিটাল বা স্মার্ট ক্লাসরুম` স্থাপন করা যায়, সেখানে কেন অতিরিক্ত ব্যয়ে পুরোনো মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করা হবে- সে সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছে না সংশ্নিষ্ট অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শুরুতে ব্যবহূত প্রযুক্তিই এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবেও (ডিপিপি) প্রযুক্তিগত বিষয়ে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের এ পর্যায়ে প্রযুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, `এখন স্মার্ট টিভি ও ট্যাবলেটের যুগ; মাল্টিমিডিয়া নয়, স্মার্ট ক্লাসরুমের যুগ। তাই প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়া প্রযুক্তির মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনা মানে অর্থের অপচয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই হালনাগাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।` তিনি বলেন, `এ প্রকল্পে শুধু যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে, কনটেন্ট বা বিষয় সংযোজন করা হয়নি। তাই পুরোনো প্রযুক্তির এ প্রকল্প ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।`

প্রযুক্তি পাল্টেছে, প্রকল্প বদলায়নি : ২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের অংশ হিসেবে `মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম` স্থাপনের প্রকল্প নেয়। তখনও স্মার্ট টিভি, ট্যাবলেটের মতো ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার না ঘটায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রকল্প নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট কিছু স্কুলে পাইলট প্রকল্প হিসেবে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমও তৈরি হয়। এখানে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম এবং পর্দা ব্যবহার করা হয়।

২০১৩ সালের পর দ্রুতগতিতে ডিজিটাল স্মার্ট ডিভাইস যেমন- স্মার্টফোন, ট্যাব এবং স্মার্ট টিভির প্রসার ঘটতে থাকে। ফলে মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি পুরোনো হয়ে পড়ে। এই প্রযুক্তিতে ল্যাপটপের সঙ্গে তারের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সংযুক্ত করে সাবজেক্টকে পর্দায় প্রক্ষেপণ করতে হয়। পৃথকভাবে সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে শব্দ সংযোজনের ব্যবস্থা করতে হয়। এর ব্যবহার তেমন সহজসাধ্যও নয়। তা ছাড়া মাল্টিমিডিয়ায় তাড়াতাড়ি প্রজেক্টর অকেজো হয়ে যায়, তাই পুরো ক্লাসরুম পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চলা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পাইলট প্রকল্পের আওতায় কেনা অধিকাংশ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরই অকেজো হয়ে যায়। সঙ্গত কারণেই এসব মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমও বন্ধ হয়ে যায়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত না করায় এগুলো মেরামত করাও সম্ভব হয়নি।

এদিকে ২০১৩ সালের পর `স্মার্ট ক্লাসরুম প্রযুক্তি` বাজারে আসে। এ প্রযুক্তিতে ৫৫ থেকে ৬৫ ইঞ্চির মানসম্মত একটি স্মার্ট টিভি এবং একটি স্মার্ট ট্যাব ব্যবহার করেই একজন শিক্ষক ডিজিটাল পর্দায় বিষয়বস্তু তুলে ধরে ক্লাস নিতে পারেন। এমনকি স্মার্টফোন ব্যবহার করেও তিনি ক্লাস নিতে পারেন। ২০১৬ সালের মধ্যেই চলে আসে `স্মার্ট মিররিং` প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে স্মার্ট ট্যাবকে কোনো তার ছাড়াই স্মার্ট টিভির সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হয় এক সেকেন্ডেই। ট্যাবটি ওয়াইফাই প্রযুক্তিতে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলে ওয়েব দুনিয়ার বিশাল ভান্ডার থেকে পাঠদানের অসংখ্য বিষয়ের অনুসন্ধানও সহজ হয়ে যায়। একজন শিক্ষক স্মার্টফোন দিয়েও স্মার্ট মিররিংয়ের মাধ্যমে স্মার্ট টিভি ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ট্যাব দিয়ে তাদের বইয়ের ওজন বহনের হাত থেকেও মুক্ত করা সম্ভব।

মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের পুরোনো পদ্ধতির ক্লাসরুম তৈরিতে যে ব্যয় হয়ে থাকে, স্মার্ট টিভি ও ট্যাব প্রযুক্তি দিয়ে তার অর্ধেক ব্যয়েই কাজটি করা সম্ভব। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ভিয়েতনাম ও ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ডিজিটাল বা স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করে। অন্যদিকে ভারত ২০১৭ সাল থেকে কয়েকটি রাজ্যে পরীক্ষামূলকভাবে `স্মার্ট ক্লাসরুম` চালুর পর ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছে। মালয়েশিয়া, জাপান এবং শ্রীলংকায়ও স্মার্ট ক্লাসরুম বাস্তবায়ন চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি প্রকল্পে ২০১৯ সালে এসেও ২০১০ সালেরও আগের `মাল্টিমিডিয়া` প্রযুক্তির ব্যবহার বড় ধরনের বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

আরও অনেক প্রশ্ন :প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্পে ২৬ হাজার ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনার দরপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মান নির্ধারণ সংস্থা এফসিসির সনদ দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এ শর্তের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি করা ল্যাপটপ কেনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরোনো ও প্রায়-পরিত্যক্ত মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনার ক্ষেত্রে পূর্বঅভিজ্ঞতা হিসেবে এ ধরনের পণ্য সরবরাহে চাহিদার প্রায় দেড় গুণ পণ্য সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কোনো বিশেষ আমদানিকারক সিন্ডিকেটকে কাজ দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এ প্রকল্পে আলাদাভাবে সাউন্ড সিস্টেম কেনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এক দশক আগের ইন বিল্ট সাউন্ড সিস্টেম-সমৃদ্ধ হালনাগাদ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর নয়, বরং দুই দশক আগের একেবারে বেসিক মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর কেনা হচ্ছে- যা কোনো স্মার্ট প্রযুক্তির ডিভাইসের সঙ্গে ব্যবহার করা একেবারেই সম্ভব হবে না। পৃথকভাবে সাউন্ড সিস্টেম কেনার কারণে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারের পরও পৃথকভাবে অ্যান্টি-ভাইরাস কেনার উল্লেখ ইঙ্গিত দিচ্ছে- এ প্রকল্পে লাইসেন্স নেওয়া আসল উইন্ডোজ নয়, বরং পাইরেটেড অপারেটিং সিস্টেম এবং সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে। কারণ লাইসেন্সড বা আসল উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমে ইন বিল্ট নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য উইন্ডোজ ডিফেন্ডার রয়েছে এবং মাইক্রোসফট বিনামূল্যে নিয়মিত এটি হালনাগাদ করে।

স্মার্ট প্রযুক্তি ও মেইড ইন বাংলাদেশ : বর্তমানে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডসহ স্থানীয় একাধিক ব্র্যান্ডের উন্নত মানের স্মার্ট টিভি, ট্যাব ও স্মার্টফোন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। ফলে `স্মার্ট ক্লাসরুম` প্রকল্প নেওয়া হলে দেশে উৎপাদিত গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য দিয়েই পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি পণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা বা `ওয়ারেন্টি` যথাযথভাবে নিশ্চিত করা যাবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ই ভালো বলতে পারবে, কেন তারা এ ধরনের পুরোনো প্রযুক্তির পেছনে এত ব্যয় করছে। এ প্রযুক্তিতে শুধু যন্ত্র আছে, কিন্তু পাঠদানের বিষয়বস্তু বা `কনটেন্ট` নেই। অথচ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে দুর্গম অঞ্চলের স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপনের একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। যেখানে একেবারে হালনাগাদ স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫০০ স্কুলে এটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্প হলে পুরোনো প্রযুক্তির ব্যয়বহুল মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং অত্যাধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুমের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।` সূত্র: সমকাল

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর