শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৮:৫৪ এএম


প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সমন্বিত ডিগ্রি নিশ্চিত করুন

ড. মো. সহিদুজ্জামান

প্রকাশিত: ০৮:৫৪, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাণিসম্পদ খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ-সবল ও মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে এ খাতের কোনো বিকল্প নেই। এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখতে বর্তমান সরকার এ সম্ভাবনাময় খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

কৃষির অন্যান্য সেক্টর যেমন- কৃষি ও মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এগিয়ে গেলেও প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে যে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে, তা হল সংশ্লিষ্ট শিক্ষার গ্র্যাজুয়েটদের দ্বিধাবিভক্তি বা দ্বন্দ্ব।

ভেটেরিনারি ও পশুপালন দুটি সম্পূরক পেশার পরস্পরবিরোধী মনোভাব এবং অবস্থান দখল এ দ্বন্দ্বের মূল কারণ। পেশাগত এ বিভাজন ও দ্বন্দ্বের ইতিহাস এই উপমহাদেশে দীর্ঘদিনের।

যৌথ ইন্দো-আমেরিকান ও পাক-আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা ভারতবর্ষের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় সমন্বিত ডিভিএম-ভেটসায়েন্স (ভেটেরিনারি) ও এএইচ (পশুপালন) ডিগ্রিকে দুটি পৃথক ডিগ্রিতে বিভক্ত করার সুপারিশ করে।

আমেরিকার এ সুপারিশে ভারতের ২২টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩টি এবং পাকিস্তানের ২টি বিশ্ববিদ্যালয় দুটো ডিগ্রিকে আপাতত আলাদা করে দিলেও পরবর্তী সময়ে ভারতের ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল কমিশন এ দুই ডিগ্রির বিভক্তি প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আবারও সমন্বিত ডিগ্রি চালু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ভারতের খ্যাতনামা তামিলনাড়ু ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারত বিভাজনের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভেটেরিনারিয়ানরা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) এসে কুমিল্লায় একটি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে ‘ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’ নামে ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে।

কলেজটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ১৯৫১ সালে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান ভেটেরিনারি কলেজ অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি রাখা হয় ১৯৫৭ সালে।

মাঠপর্যায়ে প্রাণীর সেবা বা ব্যবহারিক কাজকে অপূর্ণাঙ্গ ও অবিচ্ছেদ্য বিবেচনা করে প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে উভয় ডিগ্রিকে একীভূত করে ডিগ্রির নাম দেয়া হয় বিএসসি ভেটসায়েন্স অ্যান্ড এএইচ, যা ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

পূর্ব বাংলার ন্যাশনাল এডুকেশনাল কমিশন এবং ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার কমিশনের সুপারিশে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ময়মনসিংহে) যা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ভেটেরিনারি ও পশুপালন নামক দুটি পৃথক অনুষদে বিভক্ত করে ৬৯-৭০ শতাংশ কোর্স নিয়ে ডিভিএম ডিগ্রি (ভেটেরিনারি) এবং ২০-৩০ শতাংশ কোর্স নিয়ে বিএসসি এএইচ ডিগ্রি (পশুপালন) প্রবর্তন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (পবিপ্রবি) ডিগ্রি দুটি আলাদাভাবে চালু করা হয়।

ভারতবর্ষে প্রাণিসম্পদের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে আমেরিকান সুপারিশ একটি চক্রান্ত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের সুপারিশে ভারত ও পাকিস্তান এ দুই পেশার বিভক্তি প্রাণিসম্পদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা বুঝতে পেরে পরবর্তী সময়ে একটি সমন্বিত বা একক ডিগ্রি ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেও বাংলাদেশে এটি সময়ের পরিক্রমায় প্রকট আকার ধারণ করে। বাধাগ্রস্ত হয় সেবা এবং ব্যাহত হয় উন্নয়ন।

উদ্যোক্তাদের চাহিদা এবং সম্ভাবনাময় প্রাণিশিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের আমিষের জোগান বা পুষ্টির নিশ্চয়তা দিতে দুটি ডিগ্রিকে এক করে স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্ঞানসমৃদ্ধ গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রয়োজনীয়তা বহুদিন থেকে প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে।

চাহিদার আলোকে সরকার উদ্যোগী হয়ে যৌথ কারিকুলাম সমৃদ্ধ গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। প্রাণিসম্পদের উচ্চশিক্ষায় বর্তমানে বাংলাদেশে ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বিত কোর্সের সমন্বয়ে ডিভিএম বা বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি ডিগ্রি প্রদান করা হলেও মাতৃসম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিভিএম ও পশুপালন নামে দুটি আলাদা ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

এতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী মনোভাব বা দ্বন্দ্বের জের গড়ায় মাঠপর্যায়ে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্রে এ দুই পেশার গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে তিক্ততার জের নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এ দুই পেশার মুখোমুখি বিরোধ বা পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রায়ই উদ্যোক্তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। এভাবে শুধু প্রাণিসম্পদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও মাঠ পর্যায়ে সেবা ব্যাহত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উভয় পেশা এবং বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণিসম্পদের উন্নয়নও।

কোনো পেশাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের অবদান অনস্বীকার্র্য। তবে একজন উদ্যোক্তা বা খামারির কাছে যেমন প্রাণী চিকিৎসকের প্রয়োজন, ঠিক একইভাবে সঠিক পশুপালন পদ্ধতি ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞও প্রয়োজন। অথচ একীভূত ডিগ্রির গ্র্যাজুয়েট দিয়ে উভয় চাহিদা মেটানো সম্ভব।

প্রাণিজশিল্পের উদ্যোক্তারা এখন নিয়োগের ক্ষেত্রে সমন্বিত গ্র্যাজুয়েটদের প্রাধান্য দিচ্ছে। এ শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮০ শতাংশের বেশি গ্র্যাজুয়েট সমন্বিত ডিগ্রিধারী। তাই বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত ডিগ্রিকে একীভূত করা জরুরি, যাতে এ দুই প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মক্ষেত্রে অনুপ্রবেশের সম্মুখীন হতে না হয়।

এ ছাড়া আলাদা ডিগ্রি হওয়ায় একই সেক্টরে পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিষয়গুলো অনুধাবন করে ২০১৭ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করলেও কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি পৃথক ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়দ্বয়ের তৎকালীন প্রশাসন।

সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের (ডিএলএস) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে শুধু ডিভিএম ডিগ্রিধারীদের জন্য এক বছর ও এএইচ ডিগ্রিধারীদের জন্য এক বছর ছয় মাস মেয়াদি মেকআপ কোর্স প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

এদিকে সরকারের একীভূত ডিগ্রির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪১তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডারে ৭৬ পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে শুধু ডিভিএম ডিগ্রিধারীদের জন্য ৫৯ এবং শুধু এএইচ ডিগ্রিধারীদের জন্য ১৭ পদ রয়েছে অথচ সমন্বিত ডিগ্রিধারীরা সব পদেই আবেদন করতে পারবে; কিন্তু বাকৃবি ও পবিপ্রবিতে পৃথক দুটি ডিগ্রি চালু থাকায় পাসকৃত গ্র্যাজুয়েটরা সমস্যায় পড়ছেন চাকরি ক্ষেত্রে।

একটি নির্দিষ্ট সময় পরে মেকআপ কোর্স প্রদান বন্ধ হয়ে গেলে এ দুটি পৃথক ডিগ্রির গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সরকারি ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দেশব্যাপী অভিন্ন কোর্স-কারিকুলামে একক ডিগ্রি সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। প্রাণিসম্পদে শিক্ষা, গবেষণা ও সেবাকে এক ছাতায় নিয়ে আসার জন্য সরকার ও মন্ত্রণালয় যেখানে কাজ করে যাচ্ছে, সেখানে সবার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা একান্তই কাম্য।

বিশ্বে যেখানে পেশাগত উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট সেক্টরের সমৃদ্ধিতে যুগোপযোগী কোর্স বা ডিগ্রি চালু করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে আসে, সেখানে উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। মনে রাখতে হবে, ডিগ্রি বা কোর্স শিক্ষকদের জন্য নয় বরং শিক্ষার্থীদের জন্য, স্টেকহোল্ডারদের বা দেশের চাহিদা পূরণের জন্য।

গ্র্যাজুয়েটরা যাতে চাকরি পায় এবং খামারি বা উদ্যোক্তারা যাতে স্বল্পমূল্যে সেবা পেতে পারে- সেটিই কাঙ্ক্ষিত। একই দেশে একই কাজের জন্য দুই ধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে একদিকে সরকারের শত শত কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষক বা প্রাণী পালনকারীরা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের চাহিদা এবং সম্ভাবনাময় প্রাণিশিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের আমিষের জোগান বা পুষ্টির নিশ্চয়তা দিতে এ ধরনের যুগোপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরি এখন সময়ের দাবি।

ড. মো. সহিদুজ্জামান : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

এডুকেশন বংলা/এজেড

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর