বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১:৪৮ এএম


প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ছাপানো হবে ৩৫ কোটি বই

মুসতাক আহমদ

প্রকাশিত: ০৬:৩৩, ৯ আগস্ট ২০২০  

করোনাভাইরাসের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজে। গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় ৩৫ শতাংশ কম দামে এসব বই ছাপানোর প্রস্তাব দিয়েছেন মুদ্রকররা। এছাড়া জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়েও গড়ে ৪২ শতাংশ কম দাম পড়েছে। এতে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে সরকারের।

তবে কমদর প্রস্তাব দেয়ায় বইয়ের মানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তারা মনে করছেন নিুমানের কাগজ, কালি ও বাঁধাই হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর কাগজ-কালিতে ছাপা বই হাতে গেলে শিশুরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে সময়মতো মানসম্পন্ন পাঠ্যবই হাতে পাওয়াই চ্যালেঞ্জ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দর কম পড়ায় উল্লিখিত বাজেট থেকেই এবার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এর কারণ হচ্ছে, কাগজ তৈরির কাঁচামাল ‘মণ্ড’র দাম এবার আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক কমেছে। এছাড়া করোনার কারণে কাগজ রফতানি কমেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাগজের ব্যবহার বন্ধ। গত বাজেটে কাগজের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট (২৫ থেকে ১৫ শতাংশ) কমানো হয়েছে। এছাড়া কাগজের মিলগুলো করোনাকালীন ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য নগদ টাকার জন্য কম দামে কাগজ বিক্রি করছে। এসব কারণে কাগজের দাম কমেছে প্রতি টনে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এ বছর মুদ্রকদের মধ্যে কোনো সিন্ডিকেট হয়নি। এ কারণে দরপত্রে বই ছাপানোর মূল্য কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা শুক্রবার বলেন, এ বছর প্রাক্কলনের চেয়েও কম দামে বই ছাপার রাস্তা তৈরির মূল কারণ হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের দাম বেশ কমে গেছে। এতে বিপুল পরিমাণ টাকা সাশ্রয় হবে। তবে কম মূল্যে কাজ নিলেও কারও ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই। যেসব ‘প্যারামিটার’ (বইয়ের সামগ্রীর গুণ) নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা বুঝে নেয়া হবে। মান নিশ্চিতে এবার মন্ত্রণালয় তৎপর। মনিটরিং এজেন্সিসহ এনসিটিবির নিজস্ব টিমের পর্যবেক্ষণও বাড়ানো হবে।

আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৫ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে মাধ্যমিকের ২৪ কোটি ৪১ লাখ বই ছাপানোর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা। প্রাথমিকের সাড়ে ১০ কোটি বই ছাপাতে সম্ভাব্য খরচ প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। মোট ৭টি দরপত্রে এসব বই ছাপানো হবে। এরমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের জন্য ৫টি দরপত্র দেয়া হয়েছে। কোনো কোনোটি মূল্যায়ন শেষে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। প্রাক-প্রাথমিকের টেন্ডার ১২ আগস্ট হতে পারে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বইয়ের দরপত্রের তারিখ নির্ধারিত হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য গত বছর যে বই ছাপানো হয় তার কাগজ প্রতি টন ৯৩ হাজার ২২৪ টাকা হিসাবে কেনা হয়েছিল। এ বছর তা এনসিটিবি প্রতি টন ৬৫ হাজার ৭২ টাকায় কেনার প্রস্তাব করেছে। বইয়ের আরেক উপাদান কভারের কাগজ বা আর্টকার্ড গত বছর প্রতি টন কেনা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ২০০ টাকা করে। এ বছর তা ৯৩ হাজার টাকা হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এভাবে এ দুই ধরনের কাগজ কেনায় এনসিটিবি কমপক্ষে ৭৫ কোটি টাকা সাশ্রয় করছে।

এদিকে গত বছর মাধ্যমিকের এক রঙের বইগুলো প্রতি ফর্মা ছাপানো হয়েছে ১ টাকা ২৫ থেকে ৪০ পয়সায়। এবার তার দর পড়েছে ৭৫ থেকে ৯০ পয়সা করে। আর চার রঙের বইয়ের প্রতি ফর্মার দাম ২ টাকা ১০ পয়সার স্থলে এবার পড়েছে ১ টাকা ১০ থেকে ২০ পয়সা। অপরদিকে গত বছর প্রাথমিকের প্রতি ফর্মা বইয়ের দাম পড়েছিল ১ টাকা ৭৫ থেকে ৮০ পয়সা। এবার পড়েছে ১ টাকা ৩০ পয়সা করে। ফলে একদিকে কম দামে কাগজ ক্রয় এবং আরেকদিকে কম দামে মুদ্রণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

অবশ্য এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, গত বছরের তুলনায় টাকা সাশ্রয় হবে, কিন্তু এর পরিমাণ হয়তো ৩০০ কোটি হবে না। কেননা, গত বছর একটি বই মুদ্রণের গড়ে ব্যয় ছিল ২৩ টাকা। এ বছর তা ১৭ থেকে ১৮ টাকা হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে কয়েকজন মুদ্রক যুগান্তরকে জানান, বাজারের বাস্তবতার বাইরে তারা দর দিলেও তা গ্রহণযোগ্য হতো না। এনসিটিবি ৬৫ হাজার টাকা দরে কাগজ কিনলেও বাস্তবে ৫৫ থেকে ৫৭ হাজার টাকায় প্রতি টন কাগজ কেনা সম্ভব। তাছাড়া প্রতিযোগিতা ও করোনাকালীন ব্যবসায় টিকে থাকতে তারা কম লাভ করার কৌশল নিয়ে দরপত্র জমা দিয়েছেন। তবে মুদ্রকদের কয়েকজন বলেছেন, যে কৌশলই নেয়া হোক না কেন, কেউ ব্যবসায় লোকসান দিয়ে বই ছাপবে না। এবার কাগজের মসৃণতা ও ‘ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর’সহ (কাগজের শক্তি) বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বাড়ানো হয়েছে। ফলে বেশি দামেই কাগজ কিনতে হবে। এ অবস্থায় নিুমানের কাগজ, কালি, গ্লু (বই বাঁধাইয়ের উপাদান) দিয়ে বই ছাপানোর প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রক ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, যদি আমরা কম দর দেই তাহলে এনসিটিবির বেশি দামে কাজ দেয়ার সুযোগ নেই। এখন এনসিটিবির দায়িত্ব হচ্ছে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী যথাযথ মানসম্পন্ন বই আদায় করে নেয়া। তিনি বলেন, প্রাথমিকের বইয়ের দর গত বছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ আর মাধ্যমিকের বই ৪৭ শতাংশ কম পড়েছে। আমাদের শঙ্কা, যথাযথ মানের বই শিক্ষার্থীরা নাও পেতে পারে। কারণ বছর শেষে সরকারের লক্ষ্য থাকে যে করেই হোক বই দাও। এ সুযোগে অনেকে নিয়ে নিুমানের বই দেয়। সরকারি আইন অনুযায়ী, শর্ত ভাঙলে মোট কাজের ১০ শতাংশের বেশি টাকা জরিমানা করা যায় না। এখন কেউ যদি ২০ শতাংশ লাভ করে ১০ শতাংশ জরিমানা দেয় তাহলে তো তার লোকসান নেই। এসব দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। কেননা, শিশুদের অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর