মঙ্গলবার ২০ আগস্ট, ২০১৯ ০:০৯ এএম


পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ১৯ গুণ বেশি খরচ বেসরকারিতে

শরীফুল আলম সুমন

প্রকাশিত: ০৭:৩৪, ৭ মে ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪২, ৭ মে ২০১৯

দেশসেরা পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো তাদের মাসিক ফি বা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে খরচ কত। কিন্তু তা তারা জানাতে পারেনি। অথচ পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দেয় খরচের হিসাব। মাসে অথবা সেমিস্টার-প্রতি কোন খাতে কত খরচ সবই তাদের মুখস্থ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ফি এতই কম যে শিক্ষার্থীরা তা মনে রাখার তাগিদ বোধও করে না। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে চিত্র পুরোপুরি উল্টো। তাদের খরচ এতই বেশি যে নাভিশ্বাস ওঠে অভিভাবকদের। ফলে খরচের সব হিসাব মুখস্থ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় একটি মাঝারি মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিক্ষার্থীদের ১৯ গুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। আর নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মতো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় আরো অনেক বেশি।

কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ১৯ গুণ বেশি ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। আবাসিক ব্যয়, খাবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দুই ক্ষেত্রে খরচের বিস্তর ফারাক লক্ষ করা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যেখানে মাসে মাত্র ছয় হাজার টাকা ব্যয় করে চলতে পারে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মাসে ব্যয় হয় ২৫ হাজার টাকা।

জানা যায়, ২০১৮ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় আট লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জন। তবে ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চালু থাকা ৩৮টিতে আসনসংখ্যা ৪৮ হাজার। আর সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে আসন মোট চার হাজার। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করতে চায় না, তাদের ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তে হয় বাধ্য হয়ে হলেও। কিন্তু সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়লেও মানের দিক দিয়ে পিছিয়েই থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে গড়ে পৌনঃপুনিক ব্যয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে গড় ব্যয় বেশি। ওই বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয় ছিল চার লাখ ৬৭ হাজার ৭৮৮ টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ ৯৬ হাজার ৫৩ টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ৯৪ হাজার ৩৯০ টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ৯৫ হাজার ১১০ টাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ওই টাকার প্রায় পুরোটাই দেয় সরকার।

অন্যদিকে ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থী প্রতি গড়ে ব্যয় করেছে ৮১ হাজার ১৮২ টাকা। তবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ব্যয় করেছে ৯২ হাজার ৭৪৪ টাকা, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) দুই লাখ ১৩ হাজার ৪৫০ টাকা, আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ৮৩ হাজার ৬৩৪ টাকা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ৮৭ হাজার ২৮৩ টাকা, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এক লাখ ৪৯ হাজার ২৩৭ টাকা, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এক লাখ ৯ হাজার ৫৭৫ টাকা শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় করেছে।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষা এমন একটি খাত যেখানে সরকারকে ভর্তুকি দিতেই হবে। শ্রীলঙ্কার সরকার উচ্চশিক্ষায় শতভাগ ভর্তুকি দেয়। তবে ভারতে আমাদের চেয়ে কম। আর পাকিস্তানে অভিভাবকদের আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আমাদের অনেক আগে যেটা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটাই আছে। এখন যদি আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আরেকটু বেশি আদায় করতে পারি, তাহলে তা তাদের কল্যাণেই ব্যয় করা যেত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আবির হোসেন বলেন, ‘ছয় মাসের সেমিস্টারে আবাসিক হলের সিটভাড়াসহ বিভিন্ন ধরনের ফি মিলিয়ে দিতে হয় তিন হাজার ৮২৫ টাকা। পড়ালেখার জন্য লাইব্রেরিতে গেলেই হয়। ক্লাসগুলো ঠিকমতো করলে আর কোনো চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।’

সেই হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর মাসে ব্যয় ৯১৬ টাকা, বছরে ব্যয় ১০ হাজার ৯৯২ টাকা। আর খাওয়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কেউ ছয় হাজার টাকার মধ্যেই চলতে পারেন বলে অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জানা যায়। এই হিসাবের সঙ্গে ইউজিসির হিসাব তুলনা করে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার ভর্তুকি দেয় বছরে এক লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৮ টাকা।

জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসিক ফি ১৪ টাকা, সেশন চার্জ ২০০ টাকা, পরীক্ষার ফরম পূরণের ফি ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আবাসিক সিটভাড়া ২০ টাকা। সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মাসে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যয় ২০০ টাকার বেশি নয়। বছরে এই ব্যয় দুই হাজার ৪০০ টাকা। সরকার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ভর্তুকি দেয় বছরে এক লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা।

স্টামফোর্ডের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমার মোট কোর্স ফি ছয় লাখ ৯০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ভর্তি ফি দিতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা, প্রতি সেমিস্টারে রেজিস্ট্রেশন ফি চার হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরেও বই-খাতা, ফটোকপি, যাতায়াতসহ নানা খরচ রয়েছে।’ তাঁর কোর্স ফি মাসে পড়ে ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা আর বছরে এক লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। এর পুরোটাই দিতে হয় তাঁর পরিবারকে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগের শিক্ষার্থী বায়জীদ মাহমুদ জানান, তাঁর মোট কোর্স ফি সাত লাখ ৯৯ হাজার টাকা। প্রতি সেমিস্টারে ল্যাব ফি দুই হাজার ৬০০ টাকা। ভর্তি ফি একবারে দিতে হয়েছে ২৬ হাজার টাকা। এর বাইরেও কিছু খরচ রয়েছে। ফলে বায়জীদের মাসে খরচ ১৭ হাজার ২৯৫ টাকা। বছরে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে খরচ দুই লাখ সাত হাজার ৫৪০ টাকা। এর পুরোটাই অভিভাবককে পরিশোধ করতে হয়।

দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রতি মাসের খরচ গড় করলে দাঁড়ায় জনপ্রতি ৮৩৭ টাকা। আর বেসরকারি দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ গড়ে জনপ্রতি ১৫ হাজার ৮৩৫ টাকা। সেই হিসাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ গুণ বেশি খরচ করে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হার্ভার্ড ও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি। দুটিই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেখানে ওই দেশের সরকার অনুদান দেয়। আর টিউশন ফির একটা সিলিং নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের কোনোই সহায়তা নেই। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফি বাড়াতে থাকলেও সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আগে আমাদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে, এরপর চাপ দিতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে জমি দেওয়া তো দূরের কথা বর্তমান আইন অনুযায়ী আমরা জমি কিনে ব্যাংক ঋণও নিতে পারব না। তাহলে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ কে দেবে?’

তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও এর মান নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ ইউজিসিরই। ইউজিসির ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীপ্রতি বছরে ব্যয় করে এক হাজার ৩৬২ টাকা। ওই অর্থ দিয়ে কোনোভাবেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রদান করা সম্ভব নয় বলে মনে করে ইউজিসি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই বললেই চলে। কর্মকর্তাদের অধীনে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে সন্দেহ থাকাটা স্বাভাবিক। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী, ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেওয়া হয়েছে। এই কলেজগুলোর মান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এখন দেশের অন্য সরকারি কলেজগুলোর ক্ষেত্রেও একই মডেল অনুসরণ করা উচিত।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর