বৃহস্পতিবার ২০ জুন, ২০১৯ ২০:৫৮ পিএম


পরীক্ষা কেন্দ্রের 'ভেন্যু' থাকছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:৪৫, ১১ মে ২০১৮   আপডেট: ০৭:৪৯, ১২ মে ২০১৮

চলমান এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে বরিশাল শিক্ষাবোর্ড আলহাজ জালাল উদ্দিন কলেজে ‘ভেন্যু’র অনুমোদন দেয়। অনুমোদনের চিঠি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৌঁছালে এ কর্মকর্তা ভেন্যু বাতিলের পাল্টা চিঠি দেন বোর্ডে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রশ্নের প্যাকেট খুলে কোনোভাবেই ভেন্যুতে প্রশ্নপত্র পৌঁছানো সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত বোর্ড অনুমোদন বাতিল করতে বাধ্য হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জালাল উদ্দিন কলেজের মতোই জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০টি শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা সারা দেশে কয়েকশ ভেন্যুর অনুমোদন দিয়েছেন। আর হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। যত্রতত্র ভেন্যু অনুমোদনের কারণে প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ মিলেছে। আগামীতে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সারা দেশের পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেন্যু বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উপকমিটি। গত মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত পরীক্ষা কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো অননুমোদিত স্থানে পরীক্ষা দিতে পারবে না। বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী অখণ্ড ক্যাম্পাসেই কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রসংলগ্ন কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নিতে হলে বোর্ড থেকে ভেন্যুর অনুমোদন নিতে হয়। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (কেন্দ্র সচিব) প্রতি ভেন্যুতে একজন হল সুপার নিয়োগ দেবেন। তবে পরীক্ষার এই নীতিমালাকে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাত্তাই দেয় না। চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় রাজধানীর ট্রাস্ট কলেজে কেন্দ্র পরিদর্শন করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নানা অনিয়ম পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীতে ভাড়া বাসায় পরিচালিত অনেক স্কুল-কলেজে এমনিতেই শিক্ষার পরিবেশ নেই। অথচ পরীক্ষা কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেন্যুর অনুমোদন দিয়েছেন শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। মূল কেন্দ্রে থেকে অনেক দূরে ভেন্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বোর্ডের অধীন রাজধানীতে ব্যাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত অনেক স্কুল ও কলেজে কেন্দ্র ও ভেন্যুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাসের হার ও জিপিএ’র সংখ্যা বাড়াতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অলিখিত চুক্তি করেন নিজেদের মধ্যে। চুক্তি অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় মহামারি আকারে প্রশ্নফাঁস হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীরকে আহ্বায়ক করে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। যত্রতত্র ভেন্যুর অনুমোদন প্রশ্নফাঁসের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটির সদস্যরা।

এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের সভাকক্ষে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উপকমিটির সভায় ভেন্যু না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড় নির্বাচনী বছর হওয়ায় বিজি প্রেসে কাজের চাপ বেড়ে যাবে। সে আশঙ্কায় আগেভাগেই প্রশ্ন ছাপার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগের মতোই ১ নভেম্বর পরীক্ষা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে আগামী জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা আয়োজন করতে বোর্ডগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র স্কুলের নিজস্ব ভবন ও সীমানা দেওয়াল আছে কি না, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ আছে কি না, কেন্দ্র স্কুলের নিয়মিত শিক্ষকের সংখ্যা, কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, পরীক্ষা কক্ষের সংখ্যা, বেঞ্চ পাঁচ থেকে ছয় ফুট দৈর্ঘ্য কি না, বেঞ্চের সংখ্যা, মূল কেন্দ্রের অধীনে ভেন্যুর সংখ্যা জানতে চেয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা ভেন্যু রাখব না। কেন্দ্রের সংখ্যাও কমিয়ে আনা যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষার কাজ শেষ করব।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় সুষ্ঠুভাবে পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনে জাতীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তরা উপস্থিত ছিলেন। সবাই যত্রতত্র ভেন্যুর অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এ সময় ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের সচিব শাহেদুল খবির মাথা নিচু করে বসে থাকেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে ভেন্যুতে প্রশ্ন পৌঁছাতে দেরি হয়। প্রশ্নফাঁসসহ আরও বেশকিছু অভিযোগ আমাদের কাছে আছে। ভেন্যু প্রয়োজনে বাতিল করা হবে। কেন্দ্রের সংখ্যা কমানো হবে। কারণ এখন প্রশ্নসেট লটারি মাধ্যমে ২৫ মিনিট আগে নির্ধারিত হয়। সেই প্রশ্ন ভেন্যুতে পৌঁছাতে দেরি হয়।’ সচিব আরও বলেন, ‘আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এখনও রাজনৈতিক বিবেচনায় পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ হয়। এটা বন্ধ করতে হবে।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে যে কয়টি কারণ পেয়েছি তার মধ্যে বিতর্কিত কেন্দ্র ও ভেন্যুগুলো দায়ী। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ২৫ মিনিট আগে লটারির মাধ্যমে সেট নির্ধারণ হওয়ায় এসব ভেন্যু নিয়ে আরও ঝামেলা হয়েছে। কারণ ২৫ মিনিটে কেন্দ্র প্রশ্ন পৌঁছানো যায়নি। এর আগে এসএসসি পরীক্ষায় ভেন্যুতে প্রশ্ন পৌঁছানো সময় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।’ এসব কারণে বিতর্কিত কেন্দ্র ও ভেন্যু বাতিলের পরামর্শ তার।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফৌজিয়া রহমান বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে ভেন্যুতে প্রশ্ন নিতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। কেন্দ্রে প্রশ্নের প্যাকেট খুলে ভেন্যুতে নেওয়ার সময় প্রশ্নফাঁসের সুযোগ রয়েছে। তিনি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার ভেন্যু নিয়ে প্র্রশ্ন তুলেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ভেন্যু বালিত করা উচিত। না হলে ভেন্যুগুলোকে কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হোক। ভেন্যু বাতিল করলে প্রশ্নফাঁসের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাবে।’

আজকালের খবর

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর