মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯ ১৫:২৪ পিএম


পরীক্ষার আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:৩৫, ১১ জুন ২০১৯   আপডেট: ২০:৪৩, ১১ জুন ২০১৯

দুটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও তিন পদের প্রার্থীদের পরীক্ষা হচ্ছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ে।

বাণিজ্যর মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই এ ধরনের উদ্যেগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন এর বিরুদ্ধে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি বিধি ভঙ্গ করে এ নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তিনি।

জানা যায়, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ভাবনদত্ত গ্রামে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রধান শিক্ষক ও বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিদ্যালয়টির তৎকালিন প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী খান অবসরে গেলে পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়টি।

২০১৮ সালের শেষের দিকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই প্রধান শিক্ষকসহ আরো বেশ কয়েকটি পদে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম বজলুর রহিম রিপন।

গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কসহ তিনটি পদে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে বয়সসীমা ৩৫ বছর উল্লেখ করে এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় প্রধান শিক্ষক পদসহ অন্যান্য পদে আবেদন নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। এর ফলে পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রধান শিক্ষক পদ বাদ দিয়ে পুনরায় অফিস সহকারী, পরিচ্ছনতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদে পুণঃ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। তবে সেটিও সরকারি বিধি মোতাবেক না হওয়ায় পুনরায় বাধাগ্রস্থ হয় বিদ্যালয়ের ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া। অভিযোগ উঠে পছন্দের প্রার্থীকে নিতেই তাড়াহুড়া করে কোন প্রকার সরকারি বিধি বিধান না মেনেই অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছনতাকর্মীর পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। কিন্তু পদ দুটির নিয়োগ এবং বেতন কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় সে বারও সকল পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

বার বার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও নানা জটিলতার কারণে নিয়োগ দিতে না পেরে বেপরোয়া হয়ে উঠেন বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন। অভিযাগ উঠেছে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই আবারো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ গত ১৬ মে এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমএলএসএস (দপ্তরী) ও এমএলএসএস (নৈশ প্রহরী) পদ উল্লেখ করা হলেও অফিস সহকারী, পরিচ্ছনতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদ উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিজ্ঞপ্তির নিচের অংশে উল্লেখ করা হয়েছে ইতোপূর্বে যে সকল প্রার্থী পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও অফিস সহায়ক পদে আবেদন করেছিলেন সেই সকল প্রার্থীদেরকে অবশ্যই পুনরায় এমএলএসএস (দপ্তরী) পদে আবেদন করতে হবে। কিন্তু তাদের পুনরায় ব্যাংক ড্রাফট দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদনকৃত প্রার্থীদের নামমাত্র পরিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ে প্রার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার সকল আয়োজন করা হয়। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি নিয়ে বিভ্রান্তির দেখা দেওয়ায় পূর্বের আবেদনকারী প্রার্থীদের অনেকেই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না।

দুটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও তিন পদের প্রার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া, সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে অফিস সহকারী, পরিচ্ছনতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদ উল্লেখ না থাকলেও পূর্বের আবেদনকারী পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও অফিস সহায়ক পদের প্রার্থীদের পুনরায় একটি পদে আবেদন করার কথা উল্লেখ থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি। পূর্বের প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি গুলো বহাল রাখা হয়েছে নাকি বাতিল করা হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আর সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিটি দুটি পদের জন্য নাকি তিনটি পদের জন্য তা নিয়েও দ্বিধাদন্ধে প্রার্থীরা। পূর্বের বিজ্ঞপ্তি গুলো বাতিল হলে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিটিতে কেন সংশোধনী শব্দটি উল্লেখ নেই এরকম নানা প্রশ্নের দেখা দিয়েছে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ঘিরেই।

বিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটি সূত্রে জানা যায়, তিন বার প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ফলে প্রধান শিক্ষক পদে ১০জন, অফিস সহকারী ২৯, এমএলএসএস (দপ্তরী) ৫ ও এমএলএসএস (নৈশ প্রহরী) পদে ৪ জন।

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, নিয়োগ পরিক্ষা ব্যতিতই তিনটি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই রহস্যময় নিয়োগ বাণিজ্যের বিতর্ক এড়ানোর কৌশল হিসেবে নামমাত্র পরিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা চালাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। তিনটি পদে আনুমানিক ৪০ লক্ষ টাকার লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আরো অভিযোগ উঠেছে, তিনটি পদের প্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম বজলুর রহিম রিপন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এ কে এম শামসুল হকসহ নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ভাগ বাটোয়ারা করছেন।

এছাড়া পত্রিকায় দুটি পদে নিয়োগ দেয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও তিনটি পদে প্রার্থী নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন আগ্রহী অন্যান্য প্রার্থীরা।

সূত্রটি আরো জানায়, উপজেলার বাগুনতা গ্রামের আব্দুল মতিনকে অফিস সহকারি, বাড়ইপাড়া ঢেলুটিয়া গ্রামের মিনহাজকে এমএলএসএস (নৈশ প্রহরী) ও বাড়ইপাড়া ঢেলুটিয়া গ্রামের আব্দুল জলিলকে এমএলএসএস (দপ্তরী) পদের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়াও পরিক্ষায় অংশ গ্রহণের আবেদন করা স্বত্তেও এ পরিক্ষায় অংশ গ্রহণের অ্যাডমিট কার্ড না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। এছাড়া দপ্তরী ও নৈশ প্রহরী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত দুই প্রার্থীর বাড়ী সভাপতির গ্রামে হওয়াসহ টাকার বিনিময়ে তাদের নিয়োগটি চ‚ড়ান্ত হয়েছে বলেও জানা গেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে নিয়োগ পরীক্ষা অংশ নেওয়া থেকে বি ত আবেদনকারী আব্দুর রাজ্জাক জানান, গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত বিদ্যালয়ের এ নিয়োগ পরিক্ষার প্রার্থী হিসেবে আবেদন করা স্বত্তেও তিনি আজকে আয়োজিত পরিক্ষার অ্যাডমিট কার্ডটি পাননি।

এমএলএসএস (দপ্তরী) পদে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রসঙ্গে বাড়ইপাড়া ধেলুটিয়া গ্রামের আব্দুল জলিল এর বাবা আব্দুল আজিজ এর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও টাকা দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

তবে নিয়োগ চূড়ান্তের বিষয়ে তিনি জানান, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তার আত্মীয় হওয়াসহ নিয়োগ বোর্ডের অন্যান্যদের সদস্যদের অনুরোধের মাধ্যমেই তার ছেলে আব্দুল জলিলের চাকুরি নিশ্চিত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুফিয়া খাতুন বারবার প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা ও নিয়োগ বানিজ্যর বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে বলে দাবি করেন। তবে দুই পদে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তিন পদে নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে তিনি কোন উত্তর দিতে রাজি হননি।

সন্তোষ ইবি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন জানান, আয়োজিত পরিক্ষার প্রশ্নপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে। এ পরিক্ষায় অফিস সহকারি পদে ১৫ আর বাকি দুটি পদে যথাক্রমে ৫ এবং ৩জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছে। তবে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা অবশ্যই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্পন্ন করবেন বলেও জানান তিনি।

টাকার বিনিময়ে নিয়োগ ও নিয়োগ প্রাপ্ত প্রার্থীদের পরীক্ষার আগেই চ‚ড়ান্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন বলেন, পরিক্ষায় ভালো করা প্রার্থীদেরই নিয়োগ দেয়া হবে।

ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রসঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এ কে এম শামসুল হক জানান, দুপুরে এই নিয়োগ পরিক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও সম্পূর্ন স্বচ্ছতা আর বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে তিনিও দুই পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিন পদের নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরিক্ষার বিষয়টি অবগত নন বলে নিশ্চিত করে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানান, যদি নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে কোন প্রার্থী তাকে অভিযোগ করেন, তবে অবশ্যয় তিনি ওই অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখবেন। এ ছাড়াও যে কোন গুরুতর বিষয়ের অভিযোগকারীদের সরাসরি উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর