বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১:৫২ এএম


পতিসরে হোক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬:৩১, ৬ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ০৬:৩২, ৬ আগস্ট ২০২০

কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ব্যাংকে মূলধন বৃদ্ধি এ সব কর্মকাণ্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি সমাজভাবনার পূর্বাপর লক্ষ্য। তিনি পুত্র ও জামাতাকে কৃষিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে তাদের লিখেছেন `তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্ন গ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ।`...সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জমিদারি রবিতীর্থ পতিসরে গিয়েছিলাম গত বছরের ৬ আগস্ট, ২২ শ্রাবণ, কবির মহাপ্রয়াণ অনুষ্ঠানে। দীর্ঘ কর্মজীবনে রবিতীর্থে যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে না পারার যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হলো কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশনের আয়োজনে রবীন্দ্রনাথের `গ্রাম উন্নয়ন ও সমাজ ভাবনা` নিয়ে মূল প্রবন্ধ পাঠের পর। পতিসর যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল মূলত এম মতিউর রহমান মামুনের কারণে। পঞ্চাশের দশকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পতিসর কাচারিবাড়ি থেকে কবির সব স্মৃতিই হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মামুন রবীন্দ্রনাথের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিচিহ্নের ওপর গবেষণা করে যা উদ্ধার করতে পেরেছে তা নেহায়েত কম নয়। কবির লেখা ছয় পৃষ্ঠার মূল্যবান চিঠি, কবির নোবেল প্রাইজের অর্থে প্রতিষ্ঠিত পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকের হিসাবের খাতা, কালীগ্রাম পরগনার শেষ জমিদার কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবির পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর লেখা চিঠি পত্রাদি, কবির ব্যবহূত খাট, টি-পট, আলমিরা, কবির চা পানের পাত্র, ভাত খাওয়ার পাত্র, আরামকেদারা, কলের লাঙলের কিছু অংশ, বাথটাব, দেয়াল ঘড়িসহ আরও অনেক কিছুই উদ্ধার করেছেন মামুন। দেখে সত্যিই বিমোহিত হয়েছি। তার উদ্ধার কর্মের প্রশংসা না করে উপায় নেই। নানা প্রতিকূলতা পায়ে দলে মামুন রবীন্দ্রনাথের কৃষি সমবায় ব্যাংকের লেজারটি যথাযথ সরকারকে দিতে পেরেছেন। এ জন্য তিনি আজীবন সমাদৃত হবেন। তিনি নিজেই `রবীন্দ্রস্মৃতি` সংগ্রহশালা নির্মাণ করেছেন। এ সবই প্রমাণ করে তিনি কতটা রবীন্দ্রপ্রাণ।

আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ঘুরে দেখেছি ১৯০৫ সালে কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত এমই স্কুল, রবীন্দ্র মিউজিয়াম ও `রবীন্দ্রস্মৃতি` সংগ্রহশালা। মাটির দেয়ালের ওপর টিনের টালির ছাউনিতে স্কুলটির যাত্রা। `শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, উপদেশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং শিলাইদহ ও কালীগ্রামে হাতে-কলমে এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন` (রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল, পৃষ্ঠা ৩১২)। সেদিন অনেক মানুষের কথা শুনেছি। তাদের প্রধান চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তা ছাড়া কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশনটি জাতীয়করণ, পতিসর হাসপাতালের আধুনিকীকরণ, পতিসরে বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজের জাতীয়করণ ইত্যাদি। এ নিয়ে দেনদরবার, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনে গোলটেবিলে আলোচনা অনেক শুনেছি। তা হোক না হোক মহামান্য রাষ্ট্রপতি পতিসর গিয়েছেন তাতেই পতিসরের মানুষ অনেক খুশি। মহামান্য রাষ্ট্রপতিরও আশা, একদিন হয়তো কবিগুরুর নামে আধুনিক কৃষির প্রসারে হয়তো একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা সম্ভব হবে। এমন একটি স্বপ্ন সদ্য প্রয়াত সংসদ সদস্য ইস্রাফিল আলমও দেখতেন। এ নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপও করেছেন।

এলাকাবাসীর এমন চাওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। `দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর অনেক পরে জমিদারি রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে থাকাকালে শেষ বাটোয়ারায় সত্যেন্দ্রনাথের পুত্র সুরেন্দ্রনাথ নেন অপেক্ষাকৃত সুফলা বিরাহিমপুর জমিদারি। আর রবীন্দ্রনাথের ভাগে থেকে যায় অপেক্ষাকৃত কম রাজস্বের অনুর্বর কালীগ্রাম পরগনা` (রবীন্দ্রভুবনে, আহমদ রফিক)। জমিদারি ভাগবাটোয়ারার পর পতিসর হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জমিদারি।

১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারদিকে ঘুরেফিরে বেড়িয়েছেন। যেমন নাগর নদীতে ভেসে, তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আশপাশে হেঁটে হেঁটে বেড়িয়েছেন। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে। তাই তাকে বলতে শুনি- `তোমরা যে পার যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার-সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করে` (রবীন্দ্ররচনাবলী দশম খণ্ড পৃ. ৫২০-২১)। এ প্রভাব তার মানবিক চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেই সম্ভবত তাকে সাধারণ মানুষের, দুস্থ গ্রাম্য চাষির জটিল সমস্যা-সংকুল জীবনের গভীরে নিয়ে গেছে খুবই স্বাভাবিকভাবে।

এমনই এক আত্মিক সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা রবীন্দ্রনাথ চরম সত্য উপলব্ধি করে বুঝতে পারেন যে, এই এলাকার প্রজা চাষিদের দুঃখ-দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা। অন্যদিকে নিজ জমিদারি কালীগ্রামের সহজ-সরল অল্প আয়ের স্বল্প শিক্ষিত মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্য দিয়ে কবি লিখেছেন `কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট-সম্প্রদায়ের উদ্দাম-উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক` (ছিন্নপত্রাবলি, ১১১ সংখ্যক চিঠি)। সেই উপলব্ধি থেকে প্রায় ২০০টি গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা এবং তিনটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

পাশাপাশি প্রজাদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য দাতব্য চিকিৎসালয়, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপনের মাধ্যমে তিনি পতিসরে সমাজ সংস্কারে হাত দিয়েছিলেন। আজ থেকে শত বছর আগে পল্লী গঠন, গ্রাম উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচির গোড়াপত্তন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সংস্কারের কাজটা শুরু করেছিলেন নিভৃত পল্লী পতিসরে। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করে গরিব চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে মহাজনদের দাসত্ব ও গোলামির জিঞ্জির থেকে কৃষকদের মুক্ত করার যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তা তো তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়।

আধুনিক চাষবাদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, খামার ব্যবস্থাপনা, হস্ত ও কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যে ঋণ কর্মসূচি তিনি হাতে নিয়েছলেন, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল ওই এলাকায়। তাই এ কথা সহজেই বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচির প্রভাবেই মহাজনদের ওই এলাকা ছাড়তে হয়েছিল। আর মহাজনরা এলাকা ছাড়ার পর কৃষক ও কৃষির উন্নতি হতে শুরু করল। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ব্যাংকে মূলধন বৃদ্ধি এ সব কর্মকাণ্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি সমাজ ভাবনার পূর্বাপর লক্ষ্য। তিনি পুত্র ও জামাতাকে কৃষিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে তাদের লিখেছেন `তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্ন গ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ। ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্ন গ্রাস কিছু পরিমাণেও যদি বাড়িয়ে দিতে পারো তাহলে মনে সান্ত্বনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে` (চিঠিপত্র ১৯ পৃ. ১১১)।

রবীন্দ্রনাথ তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে বোধ থেকেই অনুমান করেছিলেন শিক্ষা ব্যতীত বিত্ত রক্ষা সম্ভব নয়। তাই তিনি শিক্ষাবঞ্চিত অসহায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে, অর্থবিত্তে স্বাবলম্বী করতে তার নিজেস্ব জমিদারি পতিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামাঞ্চলের মানুষকে যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবে পরিণত হলো স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শাহাজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। খবরটা আমাদের জন্য নিশ্চয় আনন্দের এবং গর্বের। তবে কবির নিজস্ব জমিদারি পতিসরে আনুষ্ঠানিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুরূপ আরেকটি ঘোষণা এলে ষোলোকলা পূর্ণ হতো। সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যার রবীন্দ্রপ্রীতি ও কৃষকপ্রীতির কথা দেশবাসী জানেন। তাই কালীগ্রামবাসীর এই দাবি নিশ্চয় একদিন পূরণ হবে। আমরা সেই শুভদিনের অপেক্ষায় রইলাম।
[email protected] gmail.com

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক

সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর