রবিবার ১২ জুলাই, ২০২০ ১২:৪২ পিএম


নীতিমালা এবং গ্রেডিং এমপিওভুক্তিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে

শরীফুজ্জামান আগা খান

প্রকাশিত: ১২:৩২, ৭ মে ২০১৮  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আশ্বাস এবং সেই আশ্বাস প্রতিপালিত না হওয়ার বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। ২০১২ সালের ৫ অক্টোবর এমপিওভুক্তির আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষক সমাজ তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে অসম্মানিত হোক, হেনস্তা হোক তা চাই না। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা চলছে। আবার বিগত বছরের শেষদিনে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এমপিও দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। আমরা এমপিও দেয়ার পক্ষে আছি, সে জন্য লড়াই করছি। সেটা আপনারাও জানেন। এমপিও দেয়ার বিষয়টি অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও জড়িত। এমপিও দেয়ার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় কমিটি করেছে। আমাদের চেষ্টার ফলেই আজকে এ পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। এ খাতে অর্থ বরাদ্দ দিলে তাৎক্ষণিকভাবেই এমপিও দেয়া হবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সর্বশেষ ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৮ এমপিওভুক্তির দাবিতে অবস্থান ও অনশন কর্মসূচির শেষদিনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার একান্ত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান অনশনস্থলে এসে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি করার আশ্বাস দিয়েছেন এবং শিক্ষামন্ত্রী কাজ শুরু করেছেন। আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে ১৪ মার্চ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী আগামী বাজেটে এমপিওভুক্তি খাতে অতিরিক্ত ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে বলে জানান। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এবং অর্থমন্ত্রীর অর্থছাড়ের সম্মতি প্রদানের পর এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া যে রকম দৃশ্যমান হওয়া উচিত ছিল তা এখনও হয়নি। ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের ৩-৪ মাস আগে ছোট আকারে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত ৩ মাস সময় লাগবে। কাজেই এখনই শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ না নিলে এ সরকারের মেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সরকারের শীর্ষ পদের দুই ব্যক্তির সবুজ সংকেতের পর নতুন করে আবার নীতিমালা এবং গ্রেডিং করার উদ্যোগের কথা হচ্ছে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ১০০ নম্বরের গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে এবার দেড় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতিতে ২৫ নম্বর। প্রতি দুই বছরের জন্য পাঁচ নম্বর। ১০ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫ নম্বর। শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ২৫ নম্বর (নির্দিষ্ট সংখ্যার জন্য ১৫ নম্বর। এরপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে পাঁচ নম্বর)। পরীক্ষার্থীর সংখ্যার জন্য ২৫ নম্বর (নির্দিষ্ট সংখ্যার ক্ষেত্রে ১৫ ও পরবর্তী প্রতি ১০ জনের জন্য পাঁচ নম্বর। পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের জন্য ২৫ নম্বরের (নির্দিষ্ট হার অর্জনে ১৫ নম্বর ও পরবর্তী প্রতি ১০ শতাংশ পাসে পাঁচ নম্বর) গ্রেডিং করা হবে।

আমাদের শঙ্কা জাগে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পর নীতিমালা এবং গ্রেডিং করতে গেলে এমপিওভুক্তির বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। এমপিওভুক্তির কার্যক্রম শুরু না করে এখন নীতিমালা ও গ্রেডিং করতে গেলে অহেতুক সময়ক্ষেপণ হবে এবং অনাবশ্যক জটিলতার উদ্ভব ঘটবে। ২০১০ সালেও নীতিমালা এবং গ্রেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়েছিল। এমপিওভুক্তির তালিকা ৩ দফা রদবদল করা হয়। নীতিমালা ও গ্রেডিং কোনো কাজে আসে না। অর্থ এবং লবিং এমপিওভুক্তির নিয়ামক উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। সৃষ্ট জটিলতায় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ পর্যন্ত করতে উদ্যত হন। এরপরও দেখা যায় অনেক যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হলেও কম যোগ্যতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি স্বীকৃতি নেই এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওর তালিকায় স্থান পেয়েছে।

গ্রেডিং করে এমপিওর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হলে ওই গ্রেডিংয়ের নিচে কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা সমীচীন নয়। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ২৭ হাজার। এখন গ্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হারের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করতে চাওয়া হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ওই মান কার্যকর থাকা উচিত। কিন্তু জরিপ চালালে ওই মানদণ্ডের নিচে কয়েক হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে। তবে কি ওইসব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধ করা হবে? আর একদিকে এক কী দেড় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে চাওয়া, অন্যদিকে গ্রেডিং করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা যাচাই করা স্ববিরোধীও বটে। কোনো একটি মানদণ্ডের আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা পরিমাপ করতে চাওয়া হলে কতসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেই মানদণ্ডে উন্নীত হবে তা আগেভাগে বলা সম্ভব নয়।

সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওর হকদার। তদুপরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে এমপিওভুক্তির যোগ্য ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছে। এখন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যোগ্য হয়ে থাকলে এর ভেতর থেকে প্রতিষ্ঠান বাদ পড়বে কিভাবে? কোনো ধরনের কায়দাকানুন করে বড় একটি সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওবঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতির পর নতুন করে এমপিওর নীতিমালা গ্রেডিং করতে যাওয়া সমীচীন নয়। বছরের পর বছর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বিনা বেতনে চাকরির পাশাপাশি জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অপর কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এমতাবস্থায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক মান আশা করাও ঠিক হবে না।

সন্তান যেমন পিতার ঔরসে মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তেমনি সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন জনপদে স্থাপিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উইং এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকেছে। ডিজির প্রতিনিধির মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়োগ পেয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার দূরত্বের সনদ দিয়েছেন। পরিসংখ্যান অফিসারের কাছ থেকে জনসংখ্যার সনদ মিলেছে। ডিডিপিআই এবং শিক্ষা বোর্ড থেকে সরেজমিন পরিদর্শনের পর শর্তপূরণ সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে। এরপর ৩টি বছর সফলভাবে অতিবাহিত করার পর স্বীকৃতি মিলেছে। এখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনিয়মের ভেতর জন্মলাভ করলে তার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দফতর এড়াতে পারে না। অতিরিক্ত সন্তান ভালো নয়। কিন্তু অভিভাবকের উদাসীনতা এবং অসতর্কতার কারণে সন্তান জন্মে গেলে তাকে ফেলেও দেয়া যায় না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নীতিনির্ধারক মহল অতিরিক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। তবে সদিচ্ছা থাকলে সব সমস্যারই একটি সমাধান বের করা সম্ভব। অর্থমন্ত্রী এমপিওভুক্তি খাতে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে সম্মত হয়েছেন। এই অর্থে ১ লাখ ১৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্তি সম্ভব। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবলোপনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি না করে সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত করা যেতে পারে। এরপর অতিরিক্ত বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত করে একটা সমন্বয় সাধন করা সম্ভব। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩৫-৪০ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগের পরিবর্তে ১৫-২০ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরিরত অতিরিক্ত বিবেচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ দিলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে। সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারিকুলামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলা এ রকম বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ রকম ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ৩ থেকে ৬ মাসের কোর্স করিয়ে নিয়োগ দিলে একটি সংখ্যক শিক্ষকের আত্তীকরণ করা সম্ভব।

এদেশে ভয়াবহ রকমের বেকারত্ব রয়েছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রকৃত বেকার চার কোটি ৮২ লাখ। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ। বাকি ১৫ লাখ বেকার থাকে। এর মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায় শেষ করা উচ্চশিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর একটা অংশ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। তারা ২০ লাখের মতো শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োজিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে তাদের বেতন মিলবে এই আশায় তারা চাকরিতে যোগ দেন। সেই ভরসা না থাকলে তারা ভিন্ন কোনো পেশায় যুক্ত হতেন। দেশে কর্মসংস্থান না হলে অগত্যা বিদেশে পাড়ি জমাতেন।

দীর্ঘ ৮ বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তির কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে আর টিকে থাকাতে পারবে না। আন্দোলনরত শিক্ষক সংগঠন নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন সে কারণে একবারে সামগ্রিকভাবে এমপিভুক্তির সমস্যার সমাধান চায়। বাজেটে কী পরিমাণ বরাদ্দ থাকছে তা কোনো সমস্যা নয়। বাজেটে বরাদ্দ কম হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা আংশিক বেতন নিতেও প্রস্তুত। পুরো বেতন পেতে ২-৩ বছর অপেক্ষা করতেও তাদের আপত্তি নেই।

সাম্প্র্রতিককালে শিক্ষামন্ত্রী নানা কারণে সমালোচিত হয়েছেন। কয়েক বছর পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে না পারা অন্যতম সমালোচনা। কিন্তু চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ১০ বছর এমপিওভুক্তির আশায় রয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী এতদিনেও সমস্যাটির সমাধান করতে পারেননি। আমরা আশা করি তিনি চলতি দায়িত্বের শেষ মেয়াদে এমপিওভুক্তির চূড়ান্ত ফয়সালা করে সাফল্যের পরিচয় দেবেন।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর