মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১২:৩২ পিএম


নার্সিং কলেজে ননমেডিক্যাল পারসন সরাসরি নিয়োগের আদেশ

এডুকেশন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮:৩২, ২৬ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫৯, ২৬ নভেম্বর ২০১৯

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন শাখা-৩ সম্প্রতি সরকারি নার্সিং কলেজে ১১২ জন প্রভাষক পদে ননমেডিক্যাল পারসন (নার্সিং শিক্ষাবহির্ভূত) সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার আদেশ জারি করেছে। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রথম শ্রেণির মাস্টার্স ডিগ্রি অথবা দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতকসহ (সম্মান) দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হবে বলে ঐ আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সারাদেশে নার্সদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

নার্সিং সংগঠনের নেতারা জানান, বর্তমানে ৫ সহস্রাধিক উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্স আছেন। প্রতি বছর ১৬টি নার্সিং কলেজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কয়েকশ নার্স পাশ করে বের হচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নার্সিং বিষয়ে এমপিএইচ, এমএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করছেন। বিদেশ থেক উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্স আছেন কয়েক হাজার।

এই প্রতিনিধি প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, দেশে কয়েক হাজার উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্স থাকা সত্ত্বেও নার্সিং কলেজে সরাসরি ননমেডিক্যাল পারসন নিয়োগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক? উত্তরে ঐ কর্মকর্তা বলেন, সিনিয়র স্টাফ নার্সরা কেন প্রভাষক হবেন? তাদের সেই যোগ্যতা নেই। একই কথা বললেন ঐ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব গোলাম মোস্তফাও।

নার্সিং নিয়োগের ঐ আদেশে বলা হয়েছে, সাতটি নার্সিং কলেজে ১৬ জন করে মোট ১১২ জন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইংরেজি, কম্পিউটার, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অ্যাডাল্ট মেডিক্যাল, সার্জিক্যাল নার্সিং, মিডওয়াইফারি, অবস্টোট্রিক ও রিপ্রোডাকটিভ হেলথ, ফান্ডামেন্টাল নার্সিং, হেলথ অ্যাসেসমেন্ট, পেডিয়াট্রিক নার্সিং, সাইকিয়াট্রিক অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ নার্সিং, ইমারজেন্সি ও ক্রিটিক্যাল নার্সিং, নার্সিং এডুকেশন ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। অধিকাংশ পদ নার্সিং সেবাসংক্রান্ত। অথচ এসব পদ পূরণ করা হবে ননমেডিক্যাল ব্যক্তি দিয়ে। এক্ষেত্রে তারা কী ধরনের শিক্ষা দেবেন—এমন প্রশ্ন এখন অনেকের মধ্যে।

নার্সিং পেশায় দীর্ঘদিন রয়েছেন এমন কয়েকজন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং দীর্ঘদিন রোগীদের সেবা দিয়ে তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন রয়েছেন, যারা নিজেরাই একেকটি প্রতিষ্ঠান। তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর শিক্ষা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে না পারলে নার্সিং শিক্ষার মান নিম্নমুখী হবে। তারা আরো বলেন, অবস্টোট্রিক ও রিপ্রোডাকটিভ হেলথ, ফান্ডামেন্টাল নার্সিং, হেলথ অ্যাসেসমেন্ট, পেডিয়াট্রিক নার্সিং, সাইকিয়াট্রিক অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ নার্সিং, ইমারজেন্সি ও ক্রিটিক্যাল নার্সিং, নার্সিং এডুকেশন ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ে দেশেই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নার্স রয়েছেন।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগদানের শুরুতে নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেন। একই সঙ্গে নার্সিং শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার নির্দেশনা দেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাখালী নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজ থেকে প্রতি বছর শতাধিক উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্স বের হচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে আটটি নার্সিং ইনস্টিটিউটকে কলেজে উন্নীত করেন এবং আরো সাতটি নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব নার্সিং কলেজের শিক্ষা সম্পর্কিত সব বিষয় দেখভাল করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা অনুষদ বিভাগ। সার্টিফিকেটও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রদান করে।

চিকিত্সাব্যবস্থায় ও রোগীদের সেবার বিষয়ে ৯০ শতাংশই দায়িত্ব পালন করে থাকেন নার্স বা সেবক-সেবিকাগণ। তবে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও অবহেলার কারণে কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি নার্সিং পেশা। অভিযোগ আছে, একশ্রেণির আমলাদের কারণে বাংলাদেশে নার্সিং সেক্টরের অগ্রগতি হচ্ছে না। উচ্চতর ডিগ্রিধারী হয়েও এদেশে নার্সরাও হচ্ছেন অধিকারবঞ্চিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রকৃত মেধাবী নার্সিং অফিসারদের অবমূল্যায়ন, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে যোগ্যরা গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে পারছেন না। এই সুযোগে নার্সিং প্রশাসন পরিচালনা করছেন এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তারাই। আর এ কারণেই নার্সিং পেশার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন হচ্ছে না। এসব কর্মকর্তা দুই-এক বছরের জন্য নার্সিং অধিদপ্তরে এসে নিয়োগ-বদলি ছাড়া আর কোনো কাজই করেন না।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চিকিত্সক ও নার্সের অনুপাত হওয়ার কথা ১ :৩। অর্থাত্ একজন চিকিত্সকের সঙ্গে অন্তত তিন জন নার্স থাকতে হবে। সেই হিসাবে দেশে প্রায় ৩ লাখ নার্সের প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারিভাবে কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ হাজার, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এতে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে চিকিত্সাসেবার স্বাভাবিক গতি।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব (বিএমএ) ডা. এহতেশামুল হক দুলাল বলেন, ডাক্তার ডাক্তারই তৈরি করবেন। নার্সরা নার্সদের তৈরি করবেন। এ দুই পেশার লোকেই চিকিত্সাসেবা দেবেন, এটাই নিয়ম। এর বাইরে কিছু করার নেই। নার্সিং কলেজে সরাসরি ননমেডিক্যাল পারসন নিয়োগের আদেশটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিএমএর ২১ দফা দাবির একটি ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিত্সক দিয়ে পরিচালিত করা। কারণ বাইরে থেকে যারা আসেন, তারা চিকিত্সা বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কিংবা বাস্তবায়নে বিলম্ব করেন। ধারণা করছি, নতুন আদেশটি এ ধরনের কর্মকর্তারা মিলেই করেছেন। এতে চিকিত্সাসেবায় আন্তর্জাতিক মান থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।

এসব বিষয় জেনেও এমন একটি আত্মঘাতী আদেশ জারি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র কি না, তা তদন্ত করে দেখতে বলেছেন ডাক্তার ও নার্সরা।

নার্সিং নিয়োগ বিধিমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (নার্সিং) বর্তমানে অন্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বরত সুভাস চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, নার্সিং নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী অর্থ বিভাগের (বাস্তবায়ন শাখা) আদেশ কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, নার্সিং নিয়োগ বিধিমালা মন্ত্রিপরিষদ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অনুমোদন পেয়ে এটা বাস্তবায়নের জন্য গেজেট করা হয়।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নার্সদের পদোন্নতিসহ মানোন্নয়নে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলেও মন্ত্রণালয়ের একটি সিন্ডিকেটে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে তা আটকে রেখেছে। উচ্চতর ডিগ্রিধারী নার্সদের অধিদপ্তর ও নার্সিং কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হলেও তাদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ে না। তাদের মূল পদ সিনিয়র স্টাফ নার্সই বহাল থাকে। অথচ তাদের কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করছেন প্রশিক্ষক ও প্রিন্সিপালসহ বিভিন্ন পদে।

সৌজন্যে: ইত্তেফাক
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর