সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৫:৫৮ এএম


ধানের ন্যায্যমূল্য দাবিতে আপত্তিকর প্ল্যাকার্ড: ১৪ ছাত্রকে নোটিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ১ জুন ২০১৯  

ধানের ন্যায্যমূল্য দাবিতে মানববন্ধন করায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থীকে। গত ৩০ মে জারি করা এক নোটিশে তাদের সাত দিনের মধ্যে ‘সরকার ও প্রশাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন বহন’ ও ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার জন্য কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মানববন্ধনের কারণেই এই নোটিশ কিনা তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন টেলিফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।


মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পর এ ধরনের নোটিশ তাদের ধারণার বাইরে ছিল। তবে তাদের অভিযোগ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও অধিকারের কথা বলতে গেলেই এ ধরনের নোটিশ পাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে কথা বলার কারণে কারণ দর্শানোর নোটিশের মুখোমুখি হতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।


আর প্রশাসন বলছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধী প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা গর্হিত অপরাধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক নাকি সরকারি−এই প্রশ্নে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় চলে সরকারি অর্থে।’


এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা বলছেন, মানববন্ধন বা পরবর্তী সময়ে নোটিশের বিষয়গুলো নিয়ে সংবাদ প্রচারে তাদের নানারকমভাবে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির কথা উল্লেখ করে সবসময়ই তাদের সংবাদ প্রকাশে নিরুৎসাহিত করা হয়। যদিও প্রক্টর বলছেন, ‘এ ধরনের কিছু করা হয়নি।’

গত ১৬ মে, ধানের ন্যায্যমূল্য চেয়ে একটি মানববন্ধন করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল−‘আর করব না ধান চাষ দেখব এবার কী খাস’, ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, পাকা ধানে আগুন কেন’, ‘কৃষক মরে হীরক রাজার টনক কী নড়ে, ফসল জ্বললে জ্বলবে গদি’।


প্ল্যাকার্ডের ভাষাকে সরকার ও প্রশাসনবিরোধী উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. নুরউদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষর করা কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করার অভিপ্রায়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সরকার ও প্রশাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন বহন ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং অত্যুৎসাহী হয়ে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করার আগেই আন্দোলনের সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী একটি গর্হিত কাজ। সুতরাং এহেন কাজের জন্য আপনার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা পত্র জারির সাত (৭) দিনের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর দফতরে লিখিতভাবে জবাব দেওয়ার জন্য বলা হলো।’

নোটিশ পাওয়া এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি কৃষকের সন্তান। আমি জানি কী ঘটে চলেছে কৃষকের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যদি এই ঘটনায় কথা বলতে না পারে তাহলে বলবে কে?’ তিনি বলেন, ‘আমি আয়োজকদের কেউ ছিলাম না, কিন্তু সেখানে উপস্থিত ছিলাম। পরবর্তী সময়ে ঘটনার প্রায় ১৫ দিন পর এসে এ ধরনের নোটিশ দেওয়ার কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন ছুটি। না খোলা পর্যন্ত কিছুই বলতে পারছি না।’

এদিকে যে সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের নাম সংবাদে এলে আবারও নোটিশ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভেতর পড়তে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় প্রক্টর অফিস থেকে তাদের রেজিস্ট্রারের কাছে এবং রেজিস্ট্রার অফিস থেকে শৃঙ্খলা কমিটির কাছে পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। সংবাদ প্রকাশের আগে তাদের অবহিত করা বা দেখানোর কথাও বলা হয়েছে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর আশিকুজামান ভূইয়া বলেন, ‘এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেনি। এ রকম কাউকে কিছু বলা হয়নি।’

কী কারণে ১২ শিক্ষার্থীকে নোটিশ দেওয়া হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মানববন্ধন করে।’ কী বিষয়ে মানববন্ধন ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানববন্ধনে আপত্তিজনক প্ল্যাকার্ড ছিল। ধান পুড়লে গদি পুড়বে এসব সরকারকে ইন্ডিকেট করে নেগেটিভ করে লেখা ছিল। যে কারণে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেন তারা এ রকম কাজ করলো।’

‘অনুমতি সব ধরনের কর্মসূচিতেই লাগে কিনা জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে যাই করুক অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি যদি না থাকে তাহলে প্রশাসন তো চালাতে পারবো না। যে কেউ যেকোনও কিছু করে বসবে। আমরা তো এদের অভিভাবক, যাই করুক আমাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে অনুমতি নিয়ে তারপর করুক। এ প্ল্যাকার্ড যদি আমাদের দেখাতো তাহলে এগুলো এ রকমভাবে লিখতে বলতাম না। ধান পুড়লে গদি পুড়বে এ কথাগুলো সরকার ও প্রশাসনকে আঘাত করে বলা।’

প্ল্যাকার্ডের লেখাগুলো উল্লেখ করে সেসব বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কোথায় আঘাত করলো প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি তো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারকে আঘাত করবে তা কি হয়?’ বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকারি না পাবলিক জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকার যদি অর্থের জোগান না দেয় তাহলে চলবে কীভাবে? এখন এই শিক্ষার্থীদের নোটিশ পরবর্তী কী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে প্রশ্নে প্রক্টর বলেন, ‘তাদের কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছি, তারা জবাব দেবে। এখন পর্যন্ত কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর