শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৬:৫৭ এএম


দেশে বিজ্ঞান গবেষণার নেতৃত্বে ১৬ প্রতিষ্ঠান

সাইফ সুজন

প্রকাশিত: ১০:২০, ১৭ জুন ২০১৯   আপডেট: ১০:২১, ১৭ জুন ২০১৯

গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রভাব—তিনটি বিষয়কে ভিত্তি ধরে শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে স্পেনের সিমাগো ল্যাব ও যুক্তরাষ্ট্রের স্কপাস। সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র্যাংকিংস (এসআইআর) নামে নিয়মিত প্রকাশিত এ তালিকার চলতি বছরের সংস্করণে স্থান পেয়েছে দেশের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের ৬ হাজার ৪৬১টি প্রতিষ্ঠানের এ তালিকায় প্রথম এক হাজারের মধ্যেই রয়েছে দেশের এসব প্রতিষ্ঠান।

এসআইআর ২০১৯-এ বিজ্ঞান গবেষণায় দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম এসেছে সেন্টার ফর হেলথ অ্যান্ড পপুলেশন রিসার্চের, যেটি আইসিডিডিআর,বি নামেই পরিচিত। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ৫৭৬তম। গত বছরও দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানেই ছিল প্রতিষ্ঠানটি। ডায়রিয়া ও কলেরা রোগের টিকা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে আইসিডিডিআর,বির। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে হাইতি, পাকিস্তানে কলেরা রোগ নিরাময়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে নানামুখী গবেষণা।

তালিকার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, খুলনা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।

সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র্যাংকিংয়ে গত বছর স্থান পেয়েছিল দেশের মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান। এ বছর এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান বাদ পড়েছে এবং নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়। যুক্ত হওয়া নতুন চারটি প্রতিষ্ঠান হলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। আর বাদ পড়েছে চিকিৎসাবিষয়ক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)।

তালিকায় থাকা দেশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ৬৯২তম। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজ্ঞানবিষয়ক নানা গবেষণা রয়েছে। গত বছর গরুর খুরা রোগের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের একদল গবেষক। এছাড়া খাদ্যে কী পরিমাণ সেলোমিনা ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তা নির্ণয়, পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ নির্ণয়, লবণ প্রতিরোধক ধান উৎপাদন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, ভূমিকম্প, পোলট্রি ফার্ম থেকে কী ধরনের ব্যাকটেয়িরা সরাসরি পরিবেশে প্রবেশ করেছে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, বিজ্ঞান গবেষণাসহ সব ধরনের উদ্ভাবনমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই হলো গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে।

এ বছর তালিকায় বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমবারের মতো এসআইআরে স্থান করে নিল। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি লবণ সহনশীল ফল গাছের জাত উদ্ভাবন, পাটভিত্তিক সিমেন্ট বন্ডেড পার্টিকেল বোর্ড এবং গলদা ও রুইয়ের সঙ্গে মলা মাছ চাষের মতো বিভিন্ন উদ্ভাবন রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের।

চতুর্থ অবস্থানে থাকা বাকৃবির বৈশ্বিক অবস্থান ৭৩৩তম। কৃষি, মত্স্য ও প্রাণীসম্পদ গবেষণায় বাকৃবির অবদান নতুন নয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) অধীনেই গত তিন দশকে এক হাজারের বেশি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন করেছে বাকৃবি। চলমান রয়েছে আরো আড়াই শতাধিক প্রকল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রথমে আলোচনায় আসে কৃত্রিম মাছের প্রজনন গবেষণার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ধান কাটার যন্ত্র বা থ্রেশার মেশিন এবং ঘাস নিড়ানো ও আগাছা নিধনে যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে আলোচনায় আসে। এছাড়া বিভিন্ন জাতের ফল ও মাছের জাত উদ্ভাবন নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশির ভাগ গবেষণা ল্যাবরেটরি বা প্রকাশনার চেয়ে সম্প্রসারণে বেশি কার্যকর।

বাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুত্ফুল হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের কৃষি খাতে যে অভাবনীয় সাফল্য, এর পেছনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন বাকৃবির কৃষিবিদরা। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, মাছ ও মাংস উৎপাদনে বাকৃবির গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ সব পর্যায়ে তা দ্রুত হস্তান্তর ও বিস্তারে আমাদের গবেষকরা কাজ করছেন। সব মিলিয়ে কৃষি গবেষণা ও শিক্ষায় সবসময় অগ্রসর ভূমিকা পালন করছে বাকৃবি।

জাতীয় পর্যায়ে পঞ্চম অবস্থানে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে অবস্থান ৭৩৭তম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ও

প্রথমবারের মতো তালিকায় স্থান করে নিল।

জানা গেছে, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ১০০টি গবেষণা বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকেই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সিমাগো রিসার্চ গ্রুপ ও স্কপাসের জরিপের ক্ষেত্রে আটটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আউটপুট বা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া প্রকাশনার সংখ্যা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, প্রকাশনার গুণগত মান, স্পেশালাইজেশন ইনডেক্স বা প্রকাশনার ওপর মনোযোগ, এক্সিলেন্স হার বা প্রকাশনাগুলো শীর্ষ ১০ শতাংশ জার্নালে কী হারে প্রকাশিত হয়েছে তা। এছাড়া সায়েন্টিফিক লিডারশিপ বা প্রকাশনাগুলোর অবদান ও এক্সিলেন্স উইথ লিডারশিপ প্রকাশিত প্রকাশনাগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের অবদানের ক্ষেত্রে কী হারে শীর্ষে রয়েছে, তাও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

তালিকায় দেশী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৬৬৬তম। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল দেশে পঞ্চম ও বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ৭০৯তম। কিছুটা অবনমন হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের।

প্রথমবারের মতো তালিকায় স্থান পাওয়া চুয়েটের জাতীয় পর্যায়ে অবস্থান সপ্তম ও বৈশ্বিক অবস্থান ৭৪২তম। বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রথমবারের মতো তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান দেশে অষ্টম ও বিশ্বে ৭৫৩তম।

গতবারের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেশে নবম আর বৈশ্বিক অবস্থান ৭৫৫তম। বিশ্ববিদ্যালয়টি থেকে বিরল প্রজাতির ব্যাঙ শনাক্তকরণসহ দেশের একমাত্র টাইডাল নদীতে রুইজাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে গবেষণাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এক্ষেত্রে। তাছাড়া বিরল প্রজাতির অর্কিড উদ্ভাবন, ওয়েব সিমান্টিকসের ওপর কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগ গবেষণা করেছে। তাছাড়া ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য জাতীয় পরিবেশ পদকও অর্জন করেছে।

দেশে দশম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান ৭৫৬তম। এছাড়া তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেশে ১১তম ও বিশ্বে ৭৭৫তম। শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অবস্থান দেশে ১২তম ও বিশ্বে ৭৭৮তম। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেশে ১৩তম ও বিশ্বে ৭৮০তম। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অবস্থান দেশে ১৪তম ও বিশ্বে ৭৮৫তম। খুলনা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির জাতীয় পর্যায়ে অবস্থান ১৫তম ও বিশ্বে ৭৯১তম এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অবস্থান দেশে ১৬তম ও বিশ্বে ৮১৫তম।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর