বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১৯:০৮ পিএম


দেশের সাড়া জাগানো ৭ গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:০৮, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮  

গবেষণামুখী হচ্ছেন দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। মূলত গবেষণার জন্য সরকারের বাড়তি অর্থায়নই এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছে। তবে আলোচিত প্রকল্পের সংখ্যা কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অবহেলা ও কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকির অভাবে তেমন সাফল্য পায়নি বেশ কিছু প্রকল্প। অবশ্য ইতোমধ্যে সাতটি গবেষণা প্রকল্প ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

রক্ত পরীক্ষায় ক্যান্সার শনাক্ত

বিশ্বে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। তবে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন বাংলাদেশের এক দল গবেষক। তাদের গবেষণায় শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ক্যান্সার নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে একদল গবেষক নন-লিনিয়ার অপটিক্স গবেষণায় ক্যান্সার শনাক্তকরণের সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই পদ্ধতিতে একজন রোগীর দেহে কোনো ধরনের যন্ত্রপাতি প্রবেশ না করিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন একটি পদ্ধতিতে রক্ত পরীক্ষা করে ক্যান্সার শনাক্তকরণের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্যের সাহায্যে ক্যান্সার রোগীর শরীরের তরল পদার্থ ব্যবহার করে ক্যান্সার নির্ণয়ের পদ্ধতি’ শীর্ষক একটি পেটেন্টের আবেদন একযোগে বাংলাদেশ ও ইউএসএ পেটেন্ট অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, এটি অল্প খরচে এবং কম সময়ে করা সম্ভব হবে। মাত্র ৫০০ টাকা ব্যয়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা যাবে দেশেই।

গবাদি পশুর রোগের টিকা

প্রতিবছর দেশের গবাদি পশুর একটা বড় অংশ ‘ফুট এন্ড মাউথ’ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সঞ্চারণশীল ভাইরাসের ভিন্নতার কারণে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত টিকা এদেশের গবাদি পশুর ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকরি হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল গবেষক গবাদি পশুর ‘ফুট এন্ড মাউথ’ রোগের একটি কার্যকরি টিকা উদ্ভাবন করেছেন। স্থানীয় গবাদি পশুর উপর এই টিকার পরীক্ষা ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে এই উদ্ভাবনের পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন দাখিল করা হয়েছে এবং ভারতে অ্যাপ্লিকেশন দাখিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর ‘ফুট এন্ড মাউথ’ রোগের কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ১২৫ মিলিয়ন ডলার। এই উদ্ভাবন দেশের রোগটি প্রতিরোধ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

সয়েল টেস্টিং কিট উদ্ভাবন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সয়েল টেস্টিং কিট উদ্ভাবন করেছেন। ইন্ডাস্ট্রি পার্টনার এসিআই লিমিটেড ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত সয়েল টেস্টিং কিট বাজারজাতকরণ শুরু করেছে। এই কিট ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ও স্বল্পখরচে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকরা মাটির চাহিদা অনুযায়ী সার ব্যবহার করতে পারছেন। এটির ব্যবহার অত্যন্ত সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফসল উত্পাদন করতে কৃষকরা অবাধে কৃষি জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন। এসব রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ফসল উত্পাদন বাড়লেও মাটির স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মাটিতে বসবাসকারী নানা উপজীবের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত হারে হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টের সাথে সাথে মানুষের মাঝে নানা ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে। ফলে মাটিতে সার প্রয়োগের পূর্বে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। গবেষকদের উদ্ভাবিত এ নতুন সয়েল টেস্টিং কিটের সাহায্যে কৃষক তার নিজের জমিতে বসেই মাত্র ৫০ টাকা ব্যয়ে মাটির গুণাগুণ নির্ধারণ করে চাহিদা মাফিক সার প্রয়োগ করতে পারবেন।

সিরামিক সামগ্রী তৈরিতে স্থানীয় খনিজ পদার্থ শনাক্ত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লাস এন্ড সিরামিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফকরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল গবেষক এনার্জি সাশ্রয়ী আল্ট্রা লাইট ওয়েট হিট ইনসুলেটিং সিরামিক সামগ্রী তৈরির জন্য স্থানীয় খনিজ পদার্থ শনাক্ত করেছেন। এ উদ্ভাবনের ফলে সিরামিক সামগ্রী উত্পাদনে জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড এই সাব-প্রজেক্টের ইন্ডাস্ট্রি পার্টনার। উদ্ভাবনটির দেশে ও বিদেশে পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন দাখিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ক্যান্সার নিরাময়ে অ্যান্টিবডি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামিস্ট্রি এন্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাদাত মোহাম্মদ নোমানের নেতৃত্বে একদল গবেষক ক্যান্সার নিরাময়ে মনোক্লোন্যাল অ্যান্টিবডি উদ্ভাবনে প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে অর্জনটা বেশ আশাব্যঞ্জক এবং এটা যদি প্রত্যাশা মাফিক কাজ করে তবে তা হবে বিশ্বের মধ্যে ক্যান্সার নিরাময়ের প্রথম প্রযুক্তি। বর্তমানে উদ্ভাবনটি পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পাটকাঠি থেকে পার্টিক্যাল বোর্ড

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইফতেখার শামসের তত্ত্বাবধানে একদল গবেষক কোন ক্যামিকেল ব্যবহার ছাড়া পাটকাঠি থেকে টেকসই ও সাশ্রয়ী পার্টিক্যাল বোর্ড উদ্ভাবন করেছেন। উদ্ভাবিত এই পার্টিক্যাল বোর্ড জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া উদ্ভাবনটির বিশ্বব্যাপী বেশ চাহিদা রয়েছে; যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে এটিকে পানি প্রতিরোধী করার কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশে এই উদ্ভাবনের পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন দাখিল করা হয়েছে।

পরিবেশবান্ধব প্রি-ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এপ্লায়েড ক্যামিস্ট্রি এন্ড ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমের তত্ত্বাবধানে গবেষকগণ দেশের টেক্সটাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব প্রি-ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। টেক্সটাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিটির সংযোজন পানির ব্যবহার ৪৫ শতাংশ হ্রাস করবে। এছাড়া প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে এটি জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। এতে টেক্সটাইল প্রি-ট্রিটমেন্টে পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পাবে।

প্রসঙ্গত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় উচ্চশিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) গ্রহণ করে। এই প্রকল্প থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন উপপ্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। ইতোমধ্যে ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪৪২টি সাবপ্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭৬০ কোটি টাকারও বেশি। এই প্রকল্প ছাড়াও প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্পটির পরিচালক ড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহান্ত বলেন, হেকেপ এর মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন জ্ঞান সৃজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর