সোমবার ১৭ জুন, ২০১৯ ১৫:০৬ পিএম


দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ভরসা দেয় ঢাবি রিসোর্স সেন্টার

ইমাদ উদ্দিন মারুফ

প্রকাশিত: ০৭:৩২, ১০ জুন ২০১৯  

প্রতিবন্ধীকে এখনও সমাজের বোঝা মনে করা হয়। শুধু সমাজ নয়, অনেক পরিবারই প্রতিবন্ধী সন্তানকে সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ বলে মনে করে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রতিবন্ধীরাও সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে প্রতি বছর অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের বেশিরভাগই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অন্যান্য প্রতিবন্ধীর তুলনায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধকতা একটু বেশি থাকায় তাদের সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। তাদের সেই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়াশোনা, বিভাগীয় কাজ, গবেষণাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে রিসোর্স সেন্টার।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় অবস্থিত। এখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি নিজেদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০০৬ সালের ১৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা এনজিও সংগঠন `সাইট সেভারস ইন্টারন্যাশনালে`র যৌথ উদ্যোগে সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

রিসোর্স সেন্টার সূত্রে জানা যায়, পড়াশোনা ও বিভাগীয় অন্যান্য কাজ করার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এখানে আসেন। শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রটি তাদের জন্য উন্মুক্ত।

রিসোর্স সেন্টারের প্রায় সব শিক্ষা ও গবেষণা উপকরণ ব্রেইল সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ পদ্ধতিটি বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়তে ও লিখতে ব্যবহূত হয়। এই সেন্টারের ব্রেইলে বিভিন্ন বিভাগের ২৩টি বই, ২টি ব্রেইল টাইপরাইটার মেশিন রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ২৭ লাইন ব্রেইল গাইড (যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্রেইলে লিখতে পারেন), ব্রেইল লেখনী (লেখার জন্য একটি কলম বিশেষ) এবং ক্যাসেট ও সিডির চিত্তাকর্ষক কালেকশন। শেখার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার জন্য এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি আধুনিক যন্ত্র। এসব যন্ত্রে কম্পিউটার স্ট্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার ইনস্টল করা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে `জাউস টকিং`, যেটি `ব্রেইল` বা `টেক্সট টু স্পিচ` সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের স্ট্ক্রিনে প্রদর্শিত তথ্যে প্রবেশাধিকার প্রদান করে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে কম্পিউটারের সঙ্গে বিস্তৃত কিবোর্ডের মিথস্ট্ক্রিয়া ঘটানো যায়। এখানে আরও রয়েছে তিনটি ডিজিটাল কম্পিউটার, স্ক্যানার মেশিন, ব্রেইল প্রিন্টার, প্লেক্সটক সিডি (একটি মেশিন, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শব্দ রেকর্ড করতে ও শুনতে পারেন), টেপরেকর্ডার এবং প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম। রিসোর্স সেন্টারটিতে মোট চারজন কাজ করছেন, সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।

সেন্টারের সঙ্গে ৭০ জনের বেশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যুক্ত থাকলেও একই সময়ে মাত্র ১০ জন রিসোর্স সেন্টারটি ব্যবহার করতে পারেন। সবার একসঙ্গে সুযোগ দেওয়ার জন্য এটি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন বলে জানান সংশ্নিষ্টরা। এ ছাড়া ব্রেইল বইও পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই এবং এর অধিকাংশই পুরনো।

এ বিষয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, রিসোর্স সেন্টারটি আমাদের ব্যবহারের জন্য এখন পর্যাপ্ত নয়। ভেতরে জায়গা খুবই কম। এ ছাড়া ব্রেইল বইয়ের সংখ্যাও খুবই কম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন খান নিজেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। তিনি বলেন, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করেছি। আমরা যখন ছাত্র

ছিলাম, তখন এই সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা হয়নি। ওই সময় আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। তিনি

বলেন, পড়াশোনা শেষে আমি এখানে যোগদান করি। এখানে যোগদান করার অন্যতম কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে থাকা। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এখানকার কর্মীরাও দৃষ্টিশক্তিহীন। এ কারণে শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়ে তারা আরও বেশি বুঝে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. এস এম জাবেদ আহমদ বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রিসোর্স সেন্টার থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ওই সময় খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে আমরা এই রিসোর্স সেন্টারের কাজ শুরু করেছিলাম। এখন সেটি সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছি, যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি আরও বেশি উপযোগী হয়। এর পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।

ব্রেইল বইয়ের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্রেইল বই ও প্রিন্টার খুবই ব্যয়বহুল। কিছু আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে এতদিন আমরা নতুন ব্রেইল বই ও প্রিন্টার কিনতে পারিনি। তবে সম্প্রতি নতুন ব্রেইল বই, প্রিন্টার ও নতুন কম্পিউটার কেনা হয়েছে।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর