রবিবার ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ৫:৩৪ এএম


তরুণদেরই বেছে নিতে হবে কাজের ক্ষেত্র

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রকাশিত: ০৯:১২, ৮ জুন ২০১৯  

মানুষের জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সমষ্টি। মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সেখান থেকে অনেকগুলো ধারণা পেতে পারি, যা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং নিজেদের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে। অনেক সময় আমরা বুঝে উঠতে পারি না কোন সিদ্ধান্তটি আমাদের নিতে হবে কিংবা আমাদের নিজেদের বিকাশের জন্য কোন বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে।

এর কারণ হল ভুল সিদ্ধান্ত ও নেতিবাচক বিষয় গ্রহণ আমাদের জীবনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে পারে। জ্যাক মার কথা এখন আমরা সবাই জানি। তিনি একজন চীনা উদ্যোক্তা এবং জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট আলিবাবা ডটকমের ফাউন্ডার। তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে সারা পৃথিবীতে তিনি সমাদৃত হয়েছেন।

ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের ২৬তম ধনী ব্যক্তি তিনি। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলারের ওপর। খুব চমৎকার একটা কথা বলেছেন তিনি, যার একটি গভীর অর্থ আছে। কথাটা এমন : আপনি যদি একটা বানরের সামনে একটি ১০০ ডলারের নোট এবং একটি কলা ফেলে দেন, তাহলে বানরটি কলাটিকেই বেছে নেবে, কারণ বানর জানে না যে ডলার দিয়ে আরও অনেক বেশি কলা কেনা যায়।

ঠিক তেমনিভাবে আমাদের যুবসমাজের সামনে যদি চাকরি আর ব্যবসাকে বেছে নিতে বলা হয়, তারা চাকরিকে বেছে নেয়, কারণ তারা বুঝতে পারে না যে, ব্যবসার মাধ্যমে আরও অনেক চাকরি দেয়া যায়। এমনটি কি আমাদের তরুণরা ভাবছে? কিংবা তাদের এমন করে ভাবার মতো পরিবেশ কি আমরা তৈরি করতে পারছি?

তরুণরা চাকরির পিছে হন্যে হয়ে ছুটছে। বেসরকারি চাকরির চেয়ে সরকারি চাকরিতেই তরুণদের বেশি ঝোঁক। কারণ সরকারি চাকরিতে জব সিকিউরিটি বেশি। পেনশনসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। আরেকটি নেতিবাচক দিক রয়েছে, যেটিকে কেউ কেউ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে। সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি করার সুযোগ আছে, কাজে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ আছে।

গতানুগতিকভাবে বছরের পর বছর কাজ করার প্রবণতা আছে। সরকারি জব যারা করছেন, তাদের মধ্যে এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতাগুলো থাকায় ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পেলেও দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে না। তাছাড়া একই ধরনের কাজ বছরের পর বছর করায় চিন্তাশক্তি বা মেধাশক্তির অপচয় ঘটছে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন ও পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠছে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিভিন্ন অনিয়ম জায়গা করে নিচ্ছে। তবে বেতন কাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যাই হোক না কেন, তরুণদের মধ্যে সরকারি চাকরির আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে।

কিন্তু সমস্যা হল ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়, সরকারি চাকরিজীবীদের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এ সময়ে এসে এই সংখ্যা বাড়লেও যে পরিমাণ তরুণ সরকারি চাকরি পেতে চান তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে তরুণরা সরকারি চাকরি চাইলেও তা পাচ্ছে না। সরকারি চাকরির বিকল্প হিসেবে তরুণরা বেসরকারি চাকরি বেছে নিচ্ছে। বেসরকারিভাবে চ্যালেঞ্জ নেয়ার বিভিন্ন বিকল্প সুযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরিতে যে কর্মঘণ্টা বেঁধে দেয়া হয়েছে, বেসরকারি চাকরিতে অনেক ক্ষেত্রেই তা অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে একজন চাকরিজীবী তার সন্তানদের ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে খুব ভোরে বের হন। আবার গভীর রাতে ফিরে সন্তানদের ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এতে করে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের যে প্রাণশক্তি ও প্রণোদনা, তা একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে থাকে না। সন্তানদের সঙ্গে চাকরিজীবী বাবা বা মায়ের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক ও মানবিক কাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের কাছে বেসরকারি চাকরি সরকারি চাকরির চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ হলেও আমাদের দেশে এ ধরনের সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। এর প্রধান একটি কারণ হল বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে জব সিকিউরিটি না থাকা।

বেসরকারি চাকরির কাজের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের মতো এখানে কোনো ধরনের বেতন স্কেল অনুসরণ করা হয় না। আমাদের দেশের তরুণরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে বেসরকারি চাকরি করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তাদের থাকে না।

সরকারি বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন স্কেল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আইনগতভাবে নির্ধারণ করে দিলে সরকারি জবের ওপর চাপ কমবে। সরকারি চাকরিজীবীদের যখন বেতন বাড়ানো হবে তখন বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও বেতন বাড়াতে হবে। তা না হলে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে, যা এক ধরনের মানবিক বৈষম্যেরও প্রতীক।

বেসরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাকে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কাজের গুণগত মানের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। গবেষণায় উঠে এসেছে, বেসরকারি জব একটি দেশের অর্থনীতিতে সরকারি জবের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। বেসরকারি জব আরও জব সৃষ্টি করে এবং অর্থনীতির বাজারকে সম্প্রসারিত করে।

এখন সময় এসেছে বেসরকারি জবের সংস্কার ঘটিয়ে এর প্রতি তরুণদের আকৃষ্ট করা। সরকারি জবের তুলনায় বেসরকারি জবের বেশি সুযোগ থাকলেও এটিরও একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক সীমারেখা আছে। এ ছাড়া অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ওপর নির্ভর করে বেসরকারি জবের সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।

কেবল সরকারি বা বেসরকারি জবের ওপর তরুণদের নির্ভরশীল হলে চলবে না, নিজেদেরও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় তরুণরা উদ্যোক্তা হলে যেভাবে তাদের লক্ষ্যকে অর্জন করার চিন্তা করছে সেটি সেভাবে অর্জিত হবে কিনা এ বিষয়ে তাদের আশঙ্কা থেকে যায়। এর ফলে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও এক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাদের তরুণরা জানে না কিভাবে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।

একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য কী কী পদক্ষেপ ও কৌশল গ্রহণ করতে হবে এ বিষয়ে আমাদের তরুণদের ধারণা নেই। এ জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যে বিষয়গুলো তরুণদের আগামী দিনে সহায়ক হতে পারে, তা পাঠ্যক্রমে সহজ ও ধারাবাহিকভাবে শেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির কাজে বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিনিয়োগকে ভর্তুকি হিসেবে বিবেচনা করে বিনা শর্তে ও সুদে তরুণদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে তরুণরা যাতে জটিলতার সম্মুখীন না হয় সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। স্বল্প বিনিয়োগে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করে সেগুলো কিভাবে দেশীয় বাজারে ও বিদেশে রফতানি করা যায় সে বিষয়ে তরুণদের ট্রেনিং ও ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ ও হাইটেক পার্ক গড়ে উঠছে। তরুণরা যাতে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে নিজেরাই উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারে সে বিষয়ে সরকারকে এখন থেকেই ভাবতে হবে। বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করার পর আমরা ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা ভাবছি। ব্লু ইকোনমির সঙ্গে তরুণদের কিভাবে সম্পৃক্ত করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে তরুণদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের কাজের ক্ষেত্র যাতে তারা নিজেরাই সৃষ্টি করতে পারে সে বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের দেশ এখন মূলত কয়েকটি শিল্পপণ্য উৎপাদন করছে।

কিন্তু এগুলোই যথেষ্ট নয়। এর বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্র ও অঞ্চলে যে শিল্পপণ্যগুলো বিশ্ববাজারে চাহিদা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, সে ধরনের শিল্পপণ্য আমাদের দেশেও তরুণ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে করে এ পণ্যগুলো রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা ও কৌশল গ্রহণ করেছে, তার ইতিবাচক কৌশলগুলো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

আমাদের তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে প্রধান বাধা গতানুগতিক জটিল প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিরূপ পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা এবং দুর্নীতি। এসব প্রতিবন্ধকতাকে কিভাবে দূর করে আমরা তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি সে বিষয়ে ভাবতে হবে। কারণ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হলে তাদের মাধ্যমে অনেক তরুণের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে, দেশের বেকারত্ব দূর হবে, অলস শক্তি শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে পারি। আমাদের তরুণরাই আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন ও বিশ্বাস। তারাই আমাদের আগামী দিনের সম্ভাবনা। এখন দরকার পরিকল্পিত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা তৈরি করে তরুণদের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়া।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর