বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট, ২০২০ ১:৩৮ এএম


ঢাবিতে উন্নতি নেই শিক্ষা গবেষণায়

রফিকুল ইসলাম ও হাসান মেহেদী

প্রকাশিত: ০৯:১৩, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৯:১৪, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং করা দুই প্রতিষ্ঠান ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ ও ‘কিউএস র‍্যাংকিং’য়ের তালিকায় ভালো অবস্থানে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের অন্যতম সেরার তকমাধারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কিউএস র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান ৮০০-১০০০, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৩৫। আর টাইমস হায়ারের বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান আরো খারাপ, ১০০১ প্লাস।

কিউএস র‍্যাংকিংয়ে ২০২০ সালে ১ নম্বরে রয়েছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ হাজার ১৬১ জন, যাঁদের মধ্যে বিদেশি তিন হাজার ৭৩২ জন। স্নাতকে শিক্ষার্থী ১৭ শতাংশ। বাকি ৮৩ শতাংশই স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি গবেষক। শিক্ষক রয়েছেন দুই হাজার ৯৭৭ জন, যাঁদের মধ্যে বিদেশি এক হাজার ৬৭৭ জন।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৩৩ হাজার ৩৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদেশি মাত্র ৪৮ জন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে ৮০ শতাংশ আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাত্র ২০ শতাংশ। অর্থাৎ গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। শিক্ষক রয়েছেন দুই হাজার ২৬৮ জন।

কিউএস র‍্যাংকিং অনুযায়ী ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৬০০-এর ঘরে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অবস্থান নেমে যায় ৭০০-এর ঘরে। ২০১৯ সালে এ অবস্থানের আরো অবনমন হয়। ২০২০ সালে তা চলে গেছে ৮০০-১০০০-এর ঘরে। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ২০১-২৫০-এর ঘরে। ২০১৭ সালে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবস্থান ১০৯ নম্বরে উঠে আসে। তিন বছরে ফের অবনতি হয়েছে, ২০২০ সালে অবস্থান ১৩৫তম।

প্রশাসনিক ভবন সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ অনুষদ, ৮৪ বিভাগ, ১৩ ইনস্টিটিউট, ৬০টি গবেষণাকেন্দ্র, ১৯টি আবসিক হল ও চারটি হোস্টেল রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৩৯৬ জন, যার মধ্যে ছেলে ২২ হাজার ৪৯৭, মেয়ে ১৩ হাজার ১৯৫ জন। পিএইচডি গবেষক এক হাজার ১৬১, এমফিল গবেষক এক হাজার ৪৩ জন। শিক্ষক এক হাজার ৯৯২ জন।

বার্ষিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে কলা অনুষদভুক্ত ১৭ বিভাগে গবেষণা মাত্র ৩৬টি, আর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২৬টি। বিজ্ঞান অনুষদে আট বিভাগে গবেষণা ১১৬, প্রকাশিত প্রবন্ধ বা আর্টিকেল ১৬ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ৯ বিভাগে ৫২টি প্রবন্ধ বা পাবলিকেশন প্রকাশ পায়। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ১৬ বিভাগে গবেষণা ৬৪, প্রকাশিত প্রবন্ধ বা বই ১৪; জীববিজ্ঞান অনুষদের ১১ বিভাগে গবেষণা ২১১, প্রকাশনা ২৩৩; ফার্মেসি অনুষদে গবেষণা ৬২, পাবলিকেশন ১০৪; আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের পাঁচ বিভাগে গবেষণা ৩৪, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদে গবেষণা ১৫৮, পাবলিকেশন ৪১; চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে গবেষণা চার এবং ১৩টি ইনস্টিটিউটে গবেষণা ১৮ ও পাবলিকেশন ৪৮টি।

গবেষণা ও পাবলিকেশন নেই ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি, সংগীত, ভাষাবিজ্ঞান, আইন, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, অপরাধ বিজ্ঞান, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন, মনোবিজ্ঞান, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, সমুদ্র বিজ্ঞান, দুর্যোগ বিজ্ঞান, আবহাওয়া বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট এবং লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসিক হলগুলোতে লেখাপড়ার পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই। ক্লাসরুমের সংকট। আবাসিক হলে কক্ষগুলো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের দখলে। হল প্রশাসন শুধু নামেই। আসন বণ্টনের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অবৈধভাবে থাকছে অনেকে, অন্যদিকে বৈধ শিক্ষার্থীরা থাকার জায়গা পাচ্ছে না।

শিক্ষকরা বলছেন, ক্লাসরুমে পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণায় আগ্রহ থাকলেও গবেষণার জন্য বরাদ্দ না থাকায় তা হয় না। অবশ্য কোনো কোনো শিক্ষক নিজ উদ্যোগে জ্ঞান সৃষ্টির কাজ করেন। এমন উদ্যোগ আরো বেশি হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা বাজেটের মধ্যে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ৪০ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এটা মোট বাজেটের মাত্র ৫.৪ শতাংশ। বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটা ছিল ৩৬ কোটি ৫৫ লাখ এবং এর আগের বছরে ছিল ১৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও তা একেবারেই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জ্ঞানে বিশ্ববিদ্যালয় সমৃদ্ধ হয় আর গবেষণার মাধ্যমেই জ্ঞানের সৃষ্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাদানের প্রয়োজন আছে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। শিক্ষা ও গবেষণার সংকট বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সংকট দেখা গেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যে প্রত্যাশা, সেটা পূরণ করতে পারছে না। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন অনেক এগিয়ে যাচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘উচ্চতর গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় গবেষণা হচ্ছে না। স্নাতকোত্তরে গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অনেক দেশে স্নাতকোত্তরে শিক্ষার্থী বেশি। কারণ তারা গবেষণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা তা পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বাড়াতে হলে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর