বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই, ২০২০ ১১:১৮ এএম


টিভিতে প্রচারিত ক্লাসে উপকারভোগী কারা?

শরীফুল আলম সুমন

প্রকাশিত: ১১:১৬, ২২ জুন ২০২০   আপডেট: ১১:৩৫, ২২ জুন ২০২০

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সংসদ টেলিভিশনে গত ২৯ মার্চ থেকে মাধ্যমিকের এবং ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিকের ক্লাস প্রচার শুরু হয়েছে। কিন্তু শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা টিভিতে প্রচারিত এসব ক্লাস দেখতে পারলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা সেভাবে সুযোগটা নিতে পারছে না। এতে পড়ালেখায় তারা পিছিয়ে পড়ছে। করোনায় একদিকে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে, অন্যদিকে পড়ালেখার সঙ্গে সংযোগ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত শনিবার ‘বাংলাদেশে শিক্ষার ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্র্যাক। তাতে বলা হয়েছে, সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ক্লাসে ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই অংশ নিচ্ছে না। যে ৪৪ শতাংশ অংশ নিচ্ছে তাদের মধ্যেও ৬৪ শতাংশ জানিয়েছে যে এসব ক্লাস তাদের কাজে লাগছে।

ব্র্যাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ৭৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা সংসদ টেলিভিশনের ক্লাসে অংশ নিচ্ছে না। এরপর রয়েছে মাদরাসা, গ্রামাঞ্চল ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। টেলিভিশনের ক্লাসে কেন অংশ নিচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—তাদের কারো বাড়িতে টিভি নেই, আবার কারো বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। কারো কারো বাড়িতে আবার স্যাটেলাইট কেবল সংযোগ নেই।

বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে অধ্যয়ন করছে তিন কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এক কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থীই সংসদ টিভিতে প্রচারিত ক্লাস দেখছে না। তাদের প্রায় সবাই মফস্বলের। শহরের শিক্ষার্থীরাও আকর্ষণহীন এসব ক্লাস থেকে দিন দিন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন  বলেন, ‘বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী ৫০.৬ শতাংশ পরিবারে টেলিভিশন আছে। ফলে আমাদের ক্লাস এর চেয়ে বেশি শিক্ষার্থীর পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। তবে সব শিক্ষার্থীর জন্য আমরা রেডিওর মাধ্যমে ক্লাস প্রচারের ব্যবস্থা করছি। ৯৬ শতাংশ অভিভাবকের মোবাইল ফোন আছে। তারা মোবাইলের মাধ্যমেও রেডিওর ক্লাস শুনতে পারবে। এ ছাড়া ৩৩৩৬ নম্বরে ফোন করেও শিক্ষার্থীরা পাঁচ মিনিট ফ্রি শিক্ষা পরামর্শ নিতে পারবে। সেটাও চালু হচ্ছে।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, ‘করোনায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়বে। এই ক্রান্তিকালে দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করবে। বিশেষ করে চর, হাওড় ও শহরের বস্তি অঞ্চলের শিশুরা বেশি সমস্যায় পড়বে।’

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থীই সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত ক্লাস দেখছে। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই ক্লাস দেখছে। এমনও শিক্ষার্থী আছে যারা এখনো একটি ক্লাস দেখেনি। রমনা ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এনামুল হক বলেন, ‘নদীভাঙনকবলিত এই এলাকায় বেশির ভাগ মানুষের ঘরে টিভি নেই। কারো আবার ডিশ লাইনের সংযোগ নেই। বিটিভিতে ক্লাসটি নিলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কিছুটা বাড়ত।’

চিলমারী পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৈয়ব আলী জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের ৯০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০-৩০ শতাংশের বেশি সংসদ টিভির ক্লাসে অংশ নিচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে অভ্যস্ত। এই একমুখী পড়ালেখা তাদের কাজে আসছে না।

চিলমারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমার স্কুলের ৩-৪ শতাংশ মেধাবী শিক্ষার্থী সংসদ টিভির পাঠ কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছুটা উপকৃত হচ্ছে। বাকিরা এতে মনোযোগী হতে পারেনি।’

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলাসংলগ্ন আটখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিত কুমার বলেন, ‘পৌর এলাকার শিক্ষার্থীরা সংসদ টিভি দেখছে। মফস্বলের শিক্ষার্থীরাও দেখছে, তবে সংখ্যায় খুবই কম।’

উপজেলার তাফালবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবর মিয়া বলেন, ‘এখানে গ্রামের ৫০ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী সংসদ টিভি দেখলেও বেশির ভাগই অনাগ্রহী বলে খবর পাচ্ছি।’

গলাচিপার চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এলাকার অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থীর টিভি দেখার কোনো সুযোগ নাই।’ বড়চত্রা গ্রামের অভিভাবক আসুদল পালোয়ান বলেন, ‘ঘরে কারেন্ট নাই, টিভি পামু কই। দিন আনি দিন খাই। এহন তো বাইচ্চা থাহাই দায়।’

গলাচিপা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষার্থী সংসদ টিভিতে পাঠে অংশগ্রহণ করছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইমরান হোসেন বলে, ‘বেশির ভাগ সময় কারেন্ট থাকে না। তাই টিভি দেখতে পারি না।’ নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডলের কাজিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রানা মোল্লা জানেই না যে টিভিতে ক্লাস হচ্ছে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর