সোমবার ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ২২:১০ পিএম


ঝুঁকি নিয়ে ঈদের দিনেওকওমী শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহের কাজে

প্রকাশিত: ০৭:১৬, ২ আগস্ট ২০২০  

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের সিদ্ধান্তে সেপ্টেম্বরের আগে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলছে না। কিন্তু এ সময়ে ঈদের দিন সকাল থেকে পথে পথে দেখা গেলো কওমি মাদ্রাসার শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের। বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে ব্যস্ত তারা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের মুখে দেখা যায়নি মাস্ক। অভিযোগ উঠেছে, মাদ্রাসার ফান্ড সংগ্রহের জন্য মহামারির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে ঈদের দিনেও শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে চামড়া সংগ্রহের কাজে।

শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে—এমন অজুহাতে ঈদের আগেই মাদ্রাসা খোলার দাবি জানিয়ে আসছিল সংশ্লিষ্টরা। কওমিপন্থী আলেমদের একটি অংশ তৎপরতা চালিয়ে আসছিল কোরবানি ঈদের আগেই মাদ্রাসা খোলার। দাবির মুখে দেশের সব হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও হিফজখানা ১২ জুলাই থেকে চালুর অনুমতি দিয়েছিল সরকার। একইসঙ্গে বলা হয়েছিল এসব মাদ্রাসাকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে। কিছু দিন না যেতেই ২৩ জুলাই আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়াই ৮ আগস্ট থেকে সারা দেশের সব কওমি মাদ্রাসা খোলার ঘোষণা দেয়।

এভাবেই পথে পথে চামড়া সংগ্রহ করতে দেখা যায় কওমী শিক্ষার্থীদের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ঈদের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানের মাদ্রাসাগুলো শিক্ষার্থীদের ঈদের চামড়া সংগ্রহের কাজে অংশ নিতে মাদ্রাসায় আসার জন্য নির্দেশনা দেয়। অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা খাওয়া খরচ বাবদ কম টাকা দেন তাদের মাদ্রাসায় আসা বাধ্যতামূলক, কেউ না এলে তাদের আর কম খরচে খাওয়ার সুযোগ থাকবে না। রাজধানীর মিরপুরের আজরাবাদ মাদ্রাসায় ঘোষণা দেওয়া হয়, কেউ না এলে তাদের খাওয়া খরচ বাবদ ১ হাজার টাকা দিতে হবে।

ঈদের সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চামড়া সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করছে, সেটি সংগ্রহ করে রিকশা ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও শিক্ষার্থীরাই ভ্যান চালাচ্ছে, কোথাও শিক্ষার্থীরা ভ্যান ঠেলছে। সঙ্গে থাকা মাদ্রাসার শিক্ষকদের মধ্যে অনেককে মাস্ক পরতে দেখা গেলেও শিক্ষার্থীদের মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। শরীরে চামড়ার ময়লা, পশু রক্তে একাকার হয় এসব শিক্ষার্থী।

রাজধানীর আরজাবাদ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করেছে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায়। মিরপুরের টোলারবাগ এলাকায় ৬-১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে। তাদের কেউ হেফজ বিভাগে পড়ছে, কেউ কিতার। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, মাদ্রাসায় এখনও ক্লাস শুরু হয়নি, তারা শিক্ষকদের নির্দেশে চামড়া সংগ্রহে এসেছে।

রাজধানীর আজিমপুরে কথা হয় মোহাম্মদপুর জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসার (হেদায়াতুন নাহু) ছাত্র শাহদাত হোসেনের সঙ্গে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি বলেন, তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে কোরবানির গরুর চামড়া সংগ্রহ করা। কিন্তু এখনও কোনও চামড়া সংগ্রহ করতে পারেনি। তবে সকাল থেকে ৩টি গুরু জবাই করেছেন। তা থেকে পাওয়া অর্থ মাদ্রাসায় জমা দেওয়া হবে।

মুখে মাস্ক না থাকা ও চামড়া সংগ্রহের কাজে এসে স্বাস্থ্যবিধি মানা যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে শাহদাত বলেন, মাস্ক ছিল, কিন্তু গরু জবাইয়ের সময় তাতে রক্ত লেগে যায়। এ কারণে তা ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর একটি গরু জবাই করতে একসঙ্গে ৫ থেকে ৭ জন মানুষের দরকার হয়। ফলে চাইলেও তখন সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব হচ্ছে না।

লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার কাফিয়া জামাতের ছাত্র মো. ছফিউল্লাহ বলেন, আমাদের মাদ্রাসার একশ থেকে দেড়শ ছাত্র চামড়া সংগ্রহের কাজ করছে। সবাই নিজেদের ইচ্ছায় এই কাজে যুক্ত হয়েছে। কাউকে বাধ্য করা হয়নি। ৫টার মতো চামড়া সংগ্রহ করেছে তারা। আশা করছি আরও কিছু চামড়া সংগ্রহ করতে পারবো।


করোনার মধ্যে ঘরেই বাইরে তো মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, তাহলে মাস্ক নেই কেন জানতে চাইলে বলেনি, মাস্ক ছিল। খুলে পকেটে রেখেছি। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এ কারণে খুলে রেখেছি। গরু জবাইয়ের সময় ছাড়া এমনিতে যতটুকু সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখছি।

একই মাদ্রাসার আরেক ছাত্র মো. জাকারিয়া (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, `আমার পরিবার এগুলো পছন্দ করে না, এই কারণে তার নাম বলা এবং ছবি তোলাতে আপত্তি।‘ জাকারিয়া বলেন, আমার লেখাপড়া শেষ। মাদ্রাসার খেদমতের জন্য নিজের ইচ্ছায় এই কাজ করছি। ১০টার মতো চামড়া সংগ্রহ করেছি। আশা করি ৩০টার মতো করতে পারবো। মুখে মাস্ক না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যার করোনা হওয়ার মাস্ক পরলেও হবে, আবার না পরলেও হবে। তারপরও মাস্ক পরি। এখন খুলে রেখেছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, মাদ্রাসাগুলোর খোলার দাবির নেপথ্যে আসলে চামড়া সংগ্রহ করা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নয়। অনেক মাদ্রাসার শীর্ষ ব্যক্তিরা ট্যানারি মালিকদের থেকে সুবিধা নিয়ে চামড়া সংগ্রহে শিক্ষার্থীদের মাঠে নামাতে তৎপর ছিলেন। ট্যানারি মালিকরা তো মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেন না। মাদ্রাসাগুলো শিক্ষার্থীদের মাঠে না নামলে তাদের এই চামড়া সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য কওমি নেতাদের কাউকে কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে এ বিষয়ে তৎপর করা হয়। অনেক আলেম সভা-বিবৃতি দিয়ে এ বিষয়ে ‘চামড়া গরিবের হক’ বলে মাদ্রাসাগুলোকে চামড়া সংগ্রহে সক্রিয় হওয়ার জন্য চেষ্টা চালান। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে মাঠে নামানো মানবিক কাজ হতে পারে না।

তবে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনও শিক্ষার্থীকে চামড়া সংগ্রহের কাজে বাধ্য করা হয়নি। কেউ না এলেও কোনও জরিমানা করা হবে না। দীর্ঘদিনের প্রচলন থেকেই অনেক মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) সহ-সভাপতি মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাসে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতির কারণে মাদ্রাসাগুলো খোলার দাবি ছিল। সরকার হেফজ বিভাগ খোলার অনুমতি দিয়েছে। চামড়া সংগ্রহের কাজে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে না। বরং অনেক শিক্ষার্থী নিজ উদ্যোগ মাদ্রাসায় চলে এসেছে। দ্বীনের জন্য, মাদ্রাসারা জন্য তারা তাদের ভালোবাসা থেকে চামড়া সংগ্রহের কাজ করছে। কেউ না এলে শাস্তি দেওয়ার কোনও কারণ নেই।

/এমআর/এমওএফ/

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর