বুধবার ২১ আগস্ট, ২০১৯ ২:৫৫ এএম


জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় এমসিকিউ থাকছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ১৮ মে ২০১৮   আপডেট: ০৮:১৭, ১৯ মে ২০১৮

এবারের জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) ও জেডিসি (জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট) পরীক্ষায় এমসিকিউ (নৈবক্তিক) থাকছে। শিক্ষাবর্ষের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাওয়ায় আগামী রবিবার সভা করে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাবে মন্ত্রণালয়। ২০০ নম্বরের পরীক্ষা কমানোর চূড়ান্ত সিদ্বান্ত হবে ওই সভায়। তবে প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষার হলে উত্তর বলে দেওয়ার অভিযোগে আগামীতে পাবলিক পরীক্ষায় এসসিকিউ তুলে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
 
সূত্র জানিয়েছে, গত ৩ মে শিক্ষামন্ত্রী আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেন। এরপর পরীক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শিক্ষাবর্ষের অর্ধেক সময় পরে পরিবর্তন আনা হলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানুষিক চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। ছয় মাস পরে নতুন প্রশ্ন কাঠামোতে পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। এমনকি শিক্ষাবিদরা মন্ত্রী ও সচিবকে এ বছর নতুন পদ্ধতি চালু না করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, হঠাৎ পরিবর্তন করা হলে অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলনে নামতে পারেন। এসব কারণে চলতি বছরের জেএসসি ও জেডিসে পরীক্ষায় এমসিকিউ তুলে দেওয়া হচ্ছে না। তবে প্রশ্ন তৈরির ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হতে পারে।
 
অপরদিকে গত ৮মার্চ আন্তঃশিক্ষাবোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উপ কমিটির সভায় বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় ঐচ্ছিক বিষয় (গার্হস্থ অর্থনীতি/কৃষি) পরীক্ষা না নিয়ে শ্রেণি কক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমাতে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড সমন্বয় সাব কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘মন্ত্রণালয় আমাদের প্রস্তাব অনুমোদন দিলে চলতি বছরের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে। এমসিকিউ আগের মতোই থাকবে।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা কমানোর বিষয়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত  নেওয়া হবে রবিবারের সভা থেকে। সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন সভাপতিত্ব করবেন। তাতে মাধ্যমিক শাখার দুইজন অতিরিক্ত সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক, আন্তঃশিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

পাবলিক পরীক্ষার মানবন্টন নির্ধারণ করার দায়িত্ব এনসিটিবির। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (শিক্ষাক্রম) প্রফেসর মসিউজ্জামান বলেন, ‘এমসিকিউ যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে। এ বছরের পরীক্ষায় এমসিকিউতে কোনো পরিবর্তন আসছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনেছি আন্তঃবোর্ডের সমন্বয় সভায় বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ৫০ নম্বর কমিয়ে আনার সিদ্বান্ত হয়েছে। আন্তঃবোর্ড মন্ত্রণালয়কে জানবে। মন্ত্রণালয় আমাদের নির্দেশ দিলে নম্বর বন্টনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবো।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ ১৫০ নম্বরের পরীক্ষা ১০০ নম্বরের হলে ৩০ নম্বর এমসিকিউ প্রশ্ন থাকবে। তবে আগের ১৫০ নম্বরের পরীক্ষার কোন অংশ থেকে কত নম্বরের এমসিকিউ ও সিকিউ (বহুনির্বাচনী) প্রশ্ন করা হবে তা নির্ধারণ করতেই হয়তো মন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে।’

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ধারবাহিকভাবে প্রশ্নফাঁস হয়। রাজপথে ও সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ওঠে। ইমেজ সংকটে পড়ে সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীরের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি ১২টি বিষয়ের ৩৬০ নম্বর এমসিকিউ প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে। কমিটি প্রশ্নফাঁসের চারটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এরমধ্যে এমসিকিউ অন্যতম। এছাড় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও একই মত দিয়েছেন।

গত ৩ মে কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশকালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন,‘প্রশ্নফাঁস হওয়ার ঘটনা যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে- শুধু এমসিকিউ পরীক্ষার আগে কিছু মানুষের হাতে তা চলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আমরা এটি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। আগামী জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তন আনা হবে।’ তিনি আরও বলেছেন,‘ আগামী জেডিসি-জেএসসি পরীক্ষায় এমসিকিউতে নম্বর কমানো হতে পারে বা এককথায় উত্তর যুক্ত করা হতে পারে, অথবা সৃজনশীল আকারে প্রশ্ন দেওয়া হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। অতি শিগগিরই এ বিষয়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’

মন্ত্রীর এ ঘোষণার পরই সারা দেশের প্রায় ৩০ লাখ পরীক্ষার্থী উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ভুগতে থাকেন। তাদের অভিভাবকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ড, মাউশিতে খোজ খবর নিতে থাকেন। এমনকি শিক্ষকরা কি পড়াবেন তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষক পরীক্ষার হলে পছন্দের শিক্ষার্থীদের এমসিকিউর উত্তর বলে দেন। বিষয়টি নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেছেন মন্ত্রণালয়ে। শিক্ষাবিদরা প্রশ্ন তোলায় ২০১৫ সালে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে এমসিকিউ বন্ধ করা হবে।’ পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার ঘোষণা অনুযায়ী গতছর ৩০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘ইংল্যান্ডে দেখেছি নতুন কোনো পদ্দতি চালুর আগে গবেষণা করা হয়। সবার মতামত নেওয়া হয়। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়। ফলাফল ইতিবাচক হলে তারপরই নতুন পদ্দতি চালু করা হয়। আর আমাদের দেশে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। মন্ত্রীর ঘোষণার পর অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী আমার কাছে জানতে চেয়েছেন- এমসিকিউ থাকবে কি থাকবে না। একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও উদ্বিগ্ন।’ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে নতুন পদ্ধতি চালু করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আন্তঃশিক্ষাবোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উপ কমিটির প্রস্তাব সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেএসসি ও জেডিসিতে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা। বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে পরীক্ষা নেওয়ার সুপরিশ করেছেন তারা। আগে এ দুটি বিষয়ে ১৫০ নম্বর করে পরীক্ষা হতো। গার্হস্থ অর্থনীতি বা কৃষি এ দুটি বিষয়ের একটি শিক্ষার্থী নিজেদের পছন্দে মতো নিতে পারতেন। এবার থেকে এ বিষয়ে শ্রেণি কক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ ২০০ নম্বরের পরীক্ষা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক উপ-কমিটি। শিক্ষার্থীদের জিপিএ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব থাকবে না। সভার সিদ্ধান্তটি ওইদিনই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেএসসি ও জেডিসিতে ১৩টি বিষয়ের মধ্যে তিনটি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা তুলে দেওয়া হয়। বিষয়গুলো হচ্ছে চারু ও কারুকলা, শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা। এই তিনটি বিষয়ে ৫০ গত বছর থেকে শ্রেণি কক্ষে নম্বর করে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হচ্ছে। গত বছর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় ১০টি বিষয়ে মোট ৮৫০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। এরমধ্যে বাংলা প্রথম পত্র ১০০, দ্বিতীয়পত্র ৫০, ইংরেজি প্রথমপত্র ১০০, দ্বিতীয়পত্র ৫০, গণিত এবং বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ধর্ম, গার্হস্থ অর্থনীতি/কৃষি বিষয়ে ১০০ করে ৮০০ নম্বর এবং তথ্য প্রযুক্তি ৫০ নম্বরসহ মোট ৮৫০ নম্বরের পরীক্ষা হয়েছে।

এমএজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর