বুধবার ২১ আগস্ট, ২০১৯ ৩:১৮ এএম


জুনের পর কিভাবে চলবে পলিটেকনিক?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:২১, ৫ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ১৩:৩৬, ৫ এপ্রিল ২০১৯

পলিটেকনিকের স্টেপ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। সারাদেশের এ প্রকল্পের শিক্ষক সংখ্যা ৮৭৬ । বর্তমানে দেশের ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৫২৬ জন। তার মধ্যে রাজস্ব খাতে ৬৫০ জন। দুই মাস পরে যদি একযোগে স্টেপ প্রকল্পের ৮৭৬ জন শিক্ষককে বিদায় নিতে হয়, তা হলে পলিটেকনিকগুলোর শিক্ষাকার্যক্রম কিভাবে চলবে? কারণ শিক্ষক অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক বিষয়ভিত্তিক কোনো শিক্ষকই আর থাকবে না।

চুক্তি অনুযায়ি আর মাত্র দুই মাস তাদের চাকরি আছে। চাকরি হারালে শিক্ষকদেরইবা কি হবে। আমিনুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষক জানান, তিনি শিক্ষাজীবনে ভালো ছাত্র ছিলেন, ভালো ফল করেছেন। শিক্ষকতায়ও তার সাত বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাদের মতো দক্ষ শিক্ষক বাদ দিয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগ করলে তারা এসে তো তাদের চেয়ে ভালো পড়াতে পারবেন না। তাই তাদের দাবি, তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অপর শিক্ষক জুনিয়র ইনস্ট্রাকটর (নন-টেক) মো. কোরায়েশ হোসেন বলেন, তাদের বিষয়টি মানবিকভাবে দেখতে তারা প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। চাকরি হারালে তারা এ বয়সে পরিবার-পরিজনসহ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন?

প্রকল্পভুক্ত শিক্ষকরা জানান, ২০১২ সালে স্টেপ প্রকল্প চালু হয়। তখন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে যোগ্য শিক্ষক দেওয়ার জন্য এ প্রকল্পের অধীনে এক হাজার ১৫ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। সাকল্যে বেতন জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডে (তখন স্কেল ছিল আট হাজার টাকার, ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে তা ১৬ হাজার টাকা হয়) তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১২ ও ২০১৪ সালে দুই দফায় নিয়োগ দেওয়া মোট ১০১৫ জনের মধ্য থেকে ৮৭৬ জন শিক্ষক এখনও কর্মরত আছেন। বাকিরা চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। তারা জানান, চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তাদের জানানো হয়, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তাদের চাকরি শেষ হয়ে যাবে এবং মেয়াদ শেষে এ নিয়োগপত্রই অব্যাহতি/ছাড়পত্র হিসেবে গণ্য হবে।

একাধিক শিক্ষক বলেন, অস্থায়ী জেনেও চাকরির দুর্মূল্যের বাজারে তারা জীবন ধারণের জন্য প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলেন। তবে এতদিনে তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করেছেন। যেহেতু তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানে এতবছর শ্রম দিয়েছেন, তাই তাদের দাবি, তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চাকরি রাজস্ব খাতে নেওয়ার আবেদন করে ২০১৬ সালে এই শিক্ষকরা উচ্চ আদালতে তিনটি পৃথক রিট মামলা করেছিলেন। ২০১৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগ শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেন। সরকার পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করে। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আগামী ৭ জুলাই এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।

শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ২০২০ সালে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা সরকারের টার্গেট। এর জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক। তারা বলছেন, ২০১০ সালে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল এক দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে দুই শতাংশের ভেতরে। সে সময়ে সরকারি পলিটেকনিকগুলোকে ৪৮ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য ছিল। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। তারা যোগ দেওয়ার পর সরকারি পলিটেকনিকগুলোতে প্রাণ ফিরে আসে। এখন প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ক্লাস হচ্ছে। উদ্যমী ও উদ্ভাবনী মননসম্পন্ন শিক্ষকদের সহায়তায় ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন উদ্ভাবনীমূলক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বয়ে আনছে।

শিক্ষকরা জানান, লোড প্রকল্পে নিয়োজিত শিক্ষকরা বর্তমানে প্রতিটি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সিংহভাগ ক্লাস পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন দাপ্তরিক দায়িত্বও পালন করছেন। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার প্রায় ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের পর কারিগরি শিক্ষার মান গুণগতভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে পাসের হার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। তাই এ মুহূর্তে চাকরি রাজস্ব খাতে নেওয়ার যৌক্তিকতা সীমাহীন।

ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স-বাংলাদেশের (আইডিইবি) কেন্দ্রীয় সভাপতি একেএমএ হামিদ বলেন, যেখানে দেশে লাখ লাখ দক্ষ কর্মীর অভাব, সেখানে এসব দক্ষ কর্মীকে কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রয়োজন রয়েছে। আইডিইবির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুর রহমান বলেন, ২০১২ সালে আইডিইবি শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে আন্দোলন করেছিল। সে সময় সরকার স্টেপ প্রকল্পের আওতায় ১০১৫ জনকে নিয়োগ করে। তখন এ শিক্ষক নিয়োগ না দিলে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব ছিল না। রাজস্ব খাতে বর্তমানে মাত্র ৬৫০ জনের মতো কারিগরি শিক্ষক রয়েছেন। এরই মধ্যে এই ৮৭৬ শিক্ষক না থাকলে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা আবারও সংকটে পড়বে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) রওনক মাহমুদ বৃহস্পতিবার জানান, সরকারি নিয়ম হলো, প্রকল্প শেষ হলে জনবল বিদায় নেবে। প্রকল্পের জনবল রাজস্ব খাতে যাবে না। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এটিই তার অভিমত। তিনি বলেন, সরকার এখন আর কোনো প্রকল্পের জনবলই রাজস্ব খাতে নেয় না। তাই এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ই এই শিক্ষকরা জানতেন, তাদের চাকরি স্থায়ী হবে না, রাজস্ব খাতে যাবে না, প্রকল্প শেষ হলে বিদায় নিতে হবে। তারা সে শর্তেই যোগ দিয়েছিলেন।

এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর