মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ১৭:২৮ পিএম


জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি নিয়ে ছিঃ ছিঃ

বিভুরঞ্জন সরকার

প্রকাশিত: ০০:২৪, ৮ নভেম্বর ২০১৯  

দেশের অন্যতম উচ্চ শিক্ষালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাস ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের যারা আন্দোলন করছেন, তারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কয়েক দফা অমান্য করে শেষে জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে থাকতে না পারলেও বিকল্প আশ্রয় গ্রহণ করে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি না মেনে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার যে কৌশল নেওয়া হয়েছে তা কতটুকু সুফল দেবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এটা একটি পুরাতন এবং তামাদি কৌশল। এই কৌশলে আগুন না নিভিয়ে ছাই চাপা দেওয়া হয়। ছাই চাপা আগুন আবার যেকোনো মুহূর্তে প্রোজ্জ্বলনের আশঙ্কা থাকে।

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর` ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন প্রায় তিন মাস হতে চললো। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ছাত্রলীগের মোটা অঙ্কের চাঁদা নেওয়ার অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগরে আন্দোলন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং তার পদত্যাগের বিষয়টি সামনে চলে আসে। কিন্তু উপাচার্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে পদত্যাগের দাবিও উপেক্ষা করতে থাকায় আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা এক পর্যায়ে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। গত ৫ নভেম্বর উপাচার্যকে ‘মুক্ত` করতে তার সমর্থকরা এগিয়ে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি পক্ষ দাঁড়ায়। উপাচার্যের পক্ষ গ্রুপ এবং বিপক্ষ গ্রুপ। উভয় পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে উত্তেজনা যখন চরমে তখন তাতে ঘি ঢালার দায়িত্ব পালন করে ছাত্রলীগ। উপাচার্যের পক্ষ নিয়ে ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়। ছাত্রলীগের হামলায় কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-সাংবাদিক আহত হন। উপাচার্যপন্থীদের আক্রমণে বিক্ষুব্ধরা পিছু হটতে বাধ্য হলে উপাচার্য ‘অবরুদ্ধ` অবস্থা থেকে ‘মুক্ত’ হন। তারপর তিনি সঙ্গীসাথীদের নিয়ে নিজের অফিসে যান এবং সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠক ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। তার পক্ষে ‘গণঅভ্যুত্থান` হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করে উপাচার্য ফারজানা ইসলাম সমালোচিত হন। আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে হটিয়ে দেওয়ায় উপাচার্য ছাত্রলীগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

রোগ যদি চিহ্নিতই হয়ে থাকে তাহলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা কেন করা হয় না – সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। দেশের উচ্চ শিক্ষার এমনিতেই বেহাল দশা। এই অবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্ট কাল বন্ধ থাকা একেবারেই কাম্য নয়।

এটা মনে করা স্বাভাবিক যে, উপাচার্যের ইঙ্গিতেই ছাত্রলীগ মাঠে নামে। উপাচার্য এবং ছাত্রলীগের মধ্যে ‘লেনদেন’-এর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। পদ বহাল রাখার জন্য একটি ছাত্র সংগঠনকে ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে ব্যবহার করায় উপাচার্য ফারজানাকে অনেকেই ছিঃ ছিঃ করেছেন। যে শিক্ষার্থীদের তার কাছে মাতৃস্নেহ পাওয়ার কথা তাদের ওপর বল প্রয়োগ ও গায়ের জোরের নীতি নিয়ে তিনি তার ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।

উপাচার্য ফারজানা ইসলামকে স্বপদে বহাল রেখে জাহাঙ্গীরনগরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলে অনেকেই মনে করছেন না। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, না সরকার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করবে? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্দোলন প্রলম্বিত হলে ‘তৃতীয় পক্ষ` ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়তে পারে। হানাহানি, সহিংসতার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রশ্ন হলো, তেমন অনাকাঙ্খিত ও অনভিপ্রেত অবস্থা তৈরির সুযোগ সরকার কাউকে দেবে কিনা!

পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছেন। তবে তাতে জট খোলার কোনো আভাস নেই। আবার শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ পেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষা উপমন্ত্রীর বক্তব্য যথেষ্ট জটিল। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ আন্দোলনকারীদের কেন সরবরাহ করতে হবে? উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। হতে পারে অভিযোগ ভিত্তিহীন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করে প্রমাণ করুক যে উপাচার্য কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। আন্দোলনকারীদের কেন সেটা প্রমাণ করতে হবে? আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেছেন, হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারা হামলা চালিয়েছে তার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। গণমাধ্যমে তাদের কারো কারো নামও এসেছে। আর কীভাবে প্রমাণ হবে যে ছাত্রলীগ জড়িত ছিল? ছাত্রলীগ যে তথাকথিত ‘গণঅভ্যুত্থানে’ নেতৃত্ব দিয়েছে সেটা তো উপাচার্যের বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়। সমস্যা সমাধান করতে চাইলে এক কথা, আর সমস্যা জিইয়ে রাখতে চাইলে আরেক কথা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঠিক কোনটা চাইছে তা অনেকের কাছেই অস্পষ্ট নয়।

কেউ কেউ অবশ্য এমনও বলছেন যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ ‘রোগ` রয়েছে। সেই রোগের নাম উপাচার্যবিরোধিতা। জাহাঙ্গীরনগরের কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী নাকি উপাচার্য হিসেবে যাকেই নিয়োগ দেওয়া হোক না কেন তারই বিরোধিতা করাকে কর্তব্য মনে করেন। এর আগে অন্তত দুইজন উপাচার্যকে আন্দোলন-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

রোগ যদি চিহ্নিতই হয়ে থাকে তাহলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা কেন করা হয় না – সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। দেশের উচ্চ শিক্ষার এমনিতেই বেহাল দশা। এই অবস্থায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্ট কাল বন্ধ থাকা একেবারেই কাম্য নয়। সূত্র জাগো নিউজ

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর