সোমবার ২৭ মে, ২০১৯ ১৭:১১ পিএম


জরিমানা করা প্রতিষ্ঠানগুলোই পাচ্ছে প্রাথমিকের পাঠ্য বইয়ের কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:০৫, ২১ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৮:১৮, ২১ জুন ২০১৮

বিলম্বে ও নিম্নমানের বই দেওয়ার কারণে যেসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছিল তারাই আবার পেতে যাচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিকের বই ছাপানোর বেশির ভাগ কাজ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিকের বইয়ের নিম্নমানের কাজ করায় তাদের জামানতের ২০ শতাংশ অর্থও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আটকে রেখেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই আবারও সিন্ডিকেট করে দরপত্র জমা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সেই দরপত্র উন্মুক্ত করবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই বিনা মূল্যের বই ছাপার কাজ শেষ করতে চেয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে লক্ষ্যে অক্টোবর মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ভেস্তে গেছে আগাম বই পৌঁছানোর টার্গেট। এই সিন্ডিকেট একজোট হয়ে প্রাথমিকের ১১ কোটি বইয়ের প্রাক্কলিত দর ৩৫৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা হলেও ৩৫ শতাংশ বেশি দামে দরপত্র জমা দেয়। ফলে ১১১ কোটি টাকা দর বেড়ে যাওয়ায় পুনঃ দরপত্রে যেতে বাধ্য হয়েছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান বিলম্বে বই দিয়েছে তাদেরকে আমরা জরিমানা করেছি। এখন কিছু প্রতিষ্ঠান জরিমানাও দিচ্ছে, আবার পরের বছর কাজও পেয়ে যাচ্ছে। জরিমানা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ না দেওয়ার কোনো নিয়ম আমাদের নেই। তবে আগামীতে তারা যাতে নিম্নমানের কোনো কাজ করতে না পারে সে ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকব।’

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বইয়ের নিম্নমানের কাজ ও বিলম্বে বই দেওয়ার জন্য ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনসকে দুই লাখ ৪৮ হাজার টাকা, গ্লোবাল প্রিন্টিং অ্যান্ড ইকুইপমেন্টকে ৯ লাখ ৯ হাজার টাকা, ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসকে চার লাখ ৫৬ হাজার টাকা, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনসকে ২১ লাখ ৬২ হাজার টাকা, আরআর প্রিন্টিং প্রেসকে ৩৯ হাজার টাকা, এসআর প্রিন্টিং প্রেসকে ৩১ লাখ ২১ হাজার টাকা, অ্যাপ্রেক্স প্রিন্টিংকে ২৩ লাখ চার হাজার টাকা, প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসকে ছয় লাখ ৭৩ হাজার টাকা, সীমান্ত প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসকে ছয় লাখ ৬৭ হাজার টাকা, আনন্দ প্রিন্টার্সকে পাঁচ লাখ ২১ হাজার টাকা, মৌসুমী অফসেট প্রেসকে এক লাখ ৭২ হাজার টাকা, অ্যাপেক্স প্রিন্টিং অ্যান্ড কালারকে ২১ লাখ ২১ হাজার টাকা এবং বলাকা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসকে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, প্রতিবছরই ঘুরেফিরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির মোট কাজের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বাগিয়ে নেয়। এই সিন্ডিকেটের একেকজন পাঁচ-সাতটি প্রেসের নাম ব্যবহার করে। তারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে তাদের পরিবার-পরিজনের নামও ব্যবহার করে। দেখা যায়, সকালে এনসিটিবি থেকে পরিদর্শনে গেলে একই প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে একটি, আবার বিকেলে পরিদর্শনে গেলে আরেক নাম হয়ে যায়। তারা এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কাজ নিলেও যথাসময়ে বই সরবরাহ করতে পারে না। আবার তারাই বেশির ভাগ নিম্নমানের কাজ করে।

জানা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এক দফা জরিমানা দিয়েছে, তাদের জমানতের টাকাই মূলত আটকে রেখেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। বিশেষ করে যে অ্যালাইনমেন্টের বই দেওয়ার কথা ছিল তারা এর চেয়ে ছোট বই দিয়েছে। এ ছাড়া কাগজ ও কালির মানও খুব একটা ভালো নয়। ফলে অধিদপ্তর তাদের টাকা আটকে দিয়েছে। এমনকি এনসটিবি থেকে এই টাকা ছাড়ের জন্য ডিপিইকে চিঠি দিলেও তারা টাকা ছাড় করেনি। টাকা আটকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা এনসিটিবির একজন সদস্যকে ম্যানেজ করেছেন। তিনি এই টাকা ছাড়ে ডিপিইতে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বইয়ের মান দেখার জন্য আমাদের ইন্সপেকশন এজেন্ট কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। এর পরই টাকা ছাড় করা হবে। এটা আমাদের নিয়মিত প্রক্রিয়া।’

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘কিছু অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, আবার কিছু বড় প্রতিষ্ঠানকে বেশি কাজ দেওয়া হয়েছিল। তারাই সময়মতো বই দিতে পারেনি। এ ছাড়া দেরিতে সিডি পাওয়া, ঘন কুয়াশার কারণেও বই পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। আমরা এনসিটিবিকে এটা কনসিডার করতে বলেছিলাম। তারা জরিমানা করেছে। এ ছাড়া আগামী বছরের প্রাথমিকের বইয়ের জন্য এনসিটিবি দেশের বাইরের কিছু কম্পানিকে খবর দিয়ে এনেছে, যা আমাদের জন্য মঙ্গলকর হবে না।’

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর