রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:০৭ পিএম


চীনে উইঘুর সেই অধ্যাপক কোথায়?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: ১৬:৪১, ১৪ অক্টোবর ২০১৯  

চীনের জিনজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান তাশপোলাত তাইয়িপ ২০১৭ সাল পর্যন্ত আদর্শ এক শিক্ষাবিদ ছিলেন। সে বছর বেমালুম নিখোঁজ হন তিনি। চীনা কর্মকর্তারাও এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। বন্ধুদের বিশ্বাস, গোপন এক বিচারের পর অধ্যাপক তাইয়িপকে বিচ্ছিন্নবাদীর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক তাইয়িপ মুসলিম উইঘুর সম্প্রদায়ের সদস্য। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, উইঘুর বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চীন বলছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী হুমকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে তারা এ নিপীড়ন চালাচ্ছে।

‘দ্য পিপলস রিপাবলিক অব দ্য ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ বইয়ের লেখক ও গবেষক মাইকেল কাস্টার বিবিসিকে বলেন, শতাধিক উইঘুর শিক্ষাবিদ এবং পেশাজীবী এই অভ্যন্তরীণ অভিযানে হারিয়ে গেছেন। এ অভিযান সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এটি সাংস্কৃতিক গণহত্যার সমতুল্য।

সহযোগী শিক্ষাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এখনো আটক অবস্থায় জীবিত থাকলে অধ্যাপক তাইয়িপ খুব শিগগিরই মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হবেন।

তাশপোলাত তাইয়িপ কে?

নিখোঁজ হওয়ার আগপর্যন্ত তাশপোলাত তাইয়িপ জিনজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের নামকরা অধ্যাপক ছিলেন। জিনজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় অন্যান্য চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

জিনজিয়াংয়ের স্থানীয় উইঘুর সম্প্রদায়ের সদস্য তাইয়িপ নিজের প্রদেশে ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করেন। জাপানে উচ্চতর পর্যায়ের পড়ালেখা শেষে শিক্ষকতার জন্য স্বদেশে ফিরে আসেন। আন্তর্জাতিক একাডেমিক বলয়গুলোতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। ফ্রান্স থেকে সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত হন। নিজের ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তাইয়িপ চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি জিনজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হন। নিখোঁজ হওয়া অবধি তিনি এই পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তাইয়িপ কীভাবে নিখোঁজ হলেন?

অধ্যাপক তাইয়িপের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, তার আনুষ্ঠানিক কোনো রেকর্ড নেই।

বন্ধুরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে এবং জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চালু করতে ইউরোপ যাচ্ছিলেন তিনি। তবে বেইজিং বিমানবন্দরে তাঁকে থামানো হয়। তাঁকে জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমকিতে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়। এরপর তাঁর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তাইয়িপের সাবেক এক সহকর্মী।

তাইয়িপ আর কখনো বাড়ি ফেরেননি। এর পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বন্ধু এবং আত্মীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সাবেক ওই সহকর্মী জানান, একসময় তাইয়িপের পরিবার খবর পায়, বিচ্ছিন্নবাদীর অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে চীন কখনো এ মামলার বিষয়ে কিছুই নিশ্চিত করেনি।

তাশপোলাত তাইয়িপ এখন কোথায়?

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও অধিকার সংস্থাগুলো বলছে, চীন প্রায় ১০ লাখ উইঘুর এবং অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘুদের আটকশিবিরে বন্দী করে রেখেছে।

চীন এ অভিযানের কথা অস্বীকার করেনি। তবে তারা বলেছে, আটককৃতদের ‘পুনঃশিক্ষা’ কার্যক্রম চালিয়ে চীন সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ রোধ করছে। তাদের মূলধারার চীনা সমাজে আরও ভালোভাবে সংহত করতে সহায়তা করছে।

অধ্যাপক তাইয়িপের বন্ধুরা বলছেন, জিনজিয়াংয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কর্তৃপক্ষের চোখ এড়াতে সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। এমনকি ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ থাকার কারণে অনেককে আটক করা হয়েছে বলে খবর রয়েছে।

সাবেক ওই সহকর্মী বলেন, ‘কারও সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা তার নাম ধরে ডাকি না। যেমন, আমরা জিজ্ঞেস করি রোগী কেমন আছে, চিকিৎসকেরা রোগ ধরতে পেরেছে কি না, তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না ইত্যাদি। একমাত্র এভাবেই আত্মীয়রা আমাদের কিছু বলতে পারে।’

তাইয়িপের পরিবারের বিশ্বাস, তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তারা শুনেছে, আটককেন্দ্রগুলোতে বিচ্ছিন্নবাদের অভিযোগে অভিযুক্তদের তাইয়িপসহ অন্যান্য শিক্ষাবিদের প্রোপাগান্ডা ভিডিওগুলো ভীতিজনক উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়।

কাস্টার বলেছেন, গোপন ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় গুম হওয়ার ব্যাপারটি প্রচলিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাইনিজ সরকার চায় না তাইয়িপ সম্পর্কে কেউ কিছু জানুক।

তাইয়িপ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সমর্থকেরা বারবার এ মামলার ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। এ মাসের শুরুতে, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব জিওগ্রাফারের (এএজি) আয়োজনে সারা বিশ্বের ১ হাজার ৩০০ জন শিক্ষাবিদ তাঁর মুক্তির দাবিতে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।

সেপ্টেম্বরে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিচারকে ‘গোপন এবং চূড়ান্তভাবে অন্যায়’ বলে অভিহিত করেছে। আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়ার জন্য চীনকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ গায়েব হয়ে গেছেন। সিএনএনের খবরে জানানো হয়, চীনের ওই আটককেন্দ্রগুলোতে আগে বন্দী ছিলেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে দীক্ষিত হওয়ার নামে ক্যাম্পগুলোতে তাঁদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। তবে প্রথমে চীন এমন আটক শিবিরের কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরে চীন এগুলোকে বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছে।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর