বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর, ২০২০ ০:৪২ এএম


চাকরির শর্তে আড়াই হাজার নারী 'বন্ধ্যা'

অমিতোষ পাল

প্রকাশিত: ০৭:৪৭, ১১ আগস্ট ২০২০  

প্রায় আড়াই হাজার নারীকে বছরের পর বছর `বন্ধ্যা` করে রেখেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর! এসব নারী অধিদপ্তরের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য সব পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাদের যে কোনো সময় নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। নিয়োগ পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, চাকরিতে যোগদানের সময় কেউ গর্ভবতী থাকতে পারবেন না এবং কারও সন্তানের বয়স তিন বছরের কম হতে পারবে না। তিন বছর ধরে দ্রুতই নিয়োগপত্র ইস্যু করা হবে বলে বারবারই সময়ক্ষেপণ করছে অধিদপ্তর। অন্যদিকে যে কোনো সময় চাকরিতে যোগদান করতে হতে পারে- এমন প্রত্যাশায় সন্তান ধারণ থেকে বিরত রয়েছেন চাকরির জন্য নির্বাচিত নারীদের মধ্যে বিবাহিত প্রার্থীরা। কার্যত নিয়োগপত্রের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে তাদের মাতৃত্বের স্বপ্ন। অনেকেই বিষয়টি অমানবিক বলেও মনে করছেন।

নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে সমকালকে বলেন, নিয়োগের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখার কারণে ওই নারীদের সংসারে নানা ধরনের অশান্তি তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের নারী উন্নয়নের যে নীতিমালা, এটি তার পরিপন্থি। এ থেকে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা দায়িত্বশীলরা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছেন না। তিনি বলেন, এভাবে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে অনতিবিলম্বে নিয়োগ সম্পন্ন করা উচিত।

এফডব্লিউভি পদে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (পার্সোনেল) ইফতেখার রহমান বলেন, নিয়োগটা আগেই শেষ করার কথা ছিল; কিন্তু নানা কারণে হয়নি। সর্বশেষ দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে কভিড-১৯ চলে এলো। এ জন্য নিয়োগপত্র ইস্যুর বিষয়টি আবার থেমে গেছে। তবে শিগগিরই এটা সম্পন্ন হতে পারে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ২২৪ জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদে প্রশিক্ষণার্থী মনোনয়নের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। পরে পদের সংখ্যা বাড়িয়ে ৭৯৭টি করা হয়। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২২ অক্টোবর, ২০১৭। নূ্যনতম মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী দুই লাখ ৫৪ হাজার ৫০৩ নারী আবেদন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তাদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। একটি পদের বিপরীতে তিনজনকে মনোনীত রাখার হিসাবে সর্বোচ্চ নম্বরধারীদের মধ্য থেকে দুই হাজার ৫১০ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। গত বছরের ৫ মে থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত তাদের মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ ৭৯৭ জনের তালিকা প্রকাশ করেনি অধিদপ্তর। ইফতেখার রহমান বলেন, পরীক্ষা শেষ করার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক তদবির আসতে থাকে। সেসব অনুরোধ রক্ষা করা যেত না। এ জন্য তখন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর সঙ্গে নিয়োগ-বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক নেই।

বাণিজ্য হবে না বলে কর্তাদের আগ্রহও নেই : এদিকে তিন বছরে পুরোনো প্রার্থীদের নিয়োগ না দিয়ে সম্প্রতি নতুন করে আরও এক হাজার ৮০ জন এফডব্লিউভি নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে অধিদপ্তর। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আগের নিয়োগ কার্যক্রমের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তাদের নিয়োগ না দিয়ে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পেছনে অন্য `রহস্য` আছে। সেটা হলো, সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কারণে পুরোনোদের কাছ থেকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের `কিছু পাওয়ার` আর সুযোগ নেই। এ জন্য তাদের নিয়োগ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও নেই। নতুনদের নিয়োগ দিলে বড় বাণিজ্য করতে পারবেন তারা। ফলে সেটা নিয়েই ব্যস্ততা বেশি। পুরোনোদের বলা হচ্ছে, এই ঝুলন্ত অবস্থার অবসান চাইলে `কিছু খরচ` করতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হেমায়েত হোসেন বিষয়টি এভাবে ঝুলিয়ে রেখেছেন বলে তারা মনে করছেন। অবশ্য হেমায়েত হোসেন বলেছেন, বারবার আমার বিরুদ্ধে কেন টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তা বুঝতে পারি না। অন্যরা কী করে, তা তো দেখেন না। ১৬ দিন ধরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ। এই সময় মিথ্যা কথা বলব না।

যে কারণে তারা `বন্ধ্যা` হয়ে আছেন :ভুক্তভোগীরা জানান, সব পরীক্ষা সম্পন্নকারীদের মধ্যে বর্তমানে কারও বয়স ২২ বছরের কম নয়। দু-একজন ছাড়া প্র্রায় সবাই বিবাহিত। দু-একজন হয়তো আগেই সন্তান নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগই চাকরির শর্তের কারণে আর সন্তান নিতে পারছেন না। কারণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ১২ নম্বর শর্তে উল্লেখ রয়েছে, এই চাকরিতে যোগদানের সময় কেউ গর্ভবতী থাকতে পারবেন না। তাহলে তার মনোনয়ন বাতিল বলে গণ্য হবে। আর তিন বছরের কম বয়সী কোনো সন্তানও থাকতে পারবে না। যোগদানের পূর্বে সিভিল সার্জন কর্তৃক এ-সংক্রান্ত সনদপত্র দাখিল করতে হবে। মৌখিক পরীক্ষা দেওয়া একাধিক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রত্যেকেই ধারণা করছেন তিনি চূড়ান্তভাবে মনোনীত হবেন। আর মনোনীত হলে যে কোনো মুহূর্তে তাকে চাকরিতে যোগদান করতে হবে। যোগদানের পরপরই তাকে ১৮ মাসের প্রশিক্ষণে যেতে হবে। এ জন্য তারা সন্তান ধারণ করতে পারছেন না। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় সবাই এ রকম সংকটে আছেন।

পিরোজপুর সদর উপজেলার একজন আবেদনকারী জানান, যাদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, তাদের ৯৯ শতাংশই এখন বিবাহিত। অথচ সন্তান ধারণ করতে না পারার কারণে অনেককে পারিবারিক অশান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। এসব বিষয় উল্লেখ করে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে আবেদনও করেছেন। তাতে কোনো কাজ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সচিব আলী নূর বলেন, শর্ত মেনেই সবাই আবেদন করেছিলেন। এই চাকরির ক্ষেত্রে এরকম শর্ত থাকা খুবই প্রয়োজন। সময়মতো নিয়োগ হয়ে গেলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কেন বারবার সময়টা পেছাচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। দ্রুতই যাতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

বারবারই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষিত : নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নকারীদের মধ্য থেকে ৭৯৭ জনকে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগ চূড়ান্ত করার জন্য কিছু দিন পরপরই সময় বেঁধে দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কোনোবারই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারেনি অধিদপ্তর। সর্বশেষ মন্ত্রণালয় গত ৩০ জুনের মধ্যে নিয়োগদানের সময় বেঁধে দেয়। ওই সময়ের মধ্যেও ৭৯৭ জনকে নিয়োগ দিতে পারেনি অধিদপ্তর। আবারও সময় চেয়ে তারা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহান আরা বানু বলেন, তিনি নিজেও নারী। কাজেই তাদের কষ্টটা তিনি বুঝতে পারছেন। এই সমস্যার দ্রুতই অবসান হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিদেশি অনুদান ফেরত যাচ্ছে : পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রাপ্তরা চাকরিতে যোগদানের পরপরই তাদের টানা ১৮ মাসের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। এ সময় তাদের গর্ভবতী মায়েদের কীভাবে প্রসূতি সেবা দিতে হবে, সন্তান প্রসব করানোর কৌশল, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য সেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যাতে গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা-জেলাসহ সব পর্যায়ে তারা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন। এই প্রশিক্ষণের জন্য সারাদেশে ১২টি এফডব্লিউভি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ প্রতিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিভিন্ন পদের ৪০৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। গত তিন বছর তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। এ খাতে সরকারের প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে অন্তত ৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া এ বাবদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি বছর যে অনুদান দিচ্ছে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না চলায় সেই অর্থও প্রতি বছরই ফেরত যাচ্ছে।

কেন নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি : গত ১০ মার্চ নতুন করে আরও এক হাজার ৮০ জন এফডব্লিউভি নিয়োগ দেওয়ার জন্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বিজ্ঞপ্তি দেয়। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিদপ্তরে বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন তারা পুরোনোদের নিয়ে চিন্তিত নন, বরং নতুনদের নিয়োগ দিতে পারলে একটা বাণিজ্যের সুযোগ পাওয়া যাবে। সারাদেশে এ মুহূর্তে আড়াই হাজার এফডব্লিউভি পদ খালি রয়েছে। এ জন্য নতুন নিয়োগ দিতে তারা উঠেপড়ে লেগেছেন। এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হেমায়েত হোসাইন বলেন, আসলে অন্য কোনো বিষয় নেই। যেহেতু পদ খালি আছে, এ জন্য একসঙ্গে দুটি নিয়োগ শেষ করা যায় কিনা সেটা ভেবেই নতুন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

অনিরাপদ গর্ভপাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভবতীর সংখ্যা বাড়ছে : এদিকে সারাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার স্বল্পতার কারণে তৃণমূল পর্যায়ের গর্ভবতী নারী এবং শিশু, কিশোরীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। এ কারণে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি, জন্মনিয়ন্ত্রণে ভাটা, অনিরাপদ প্রসবসহ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভবতীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। কারণ মাঠ পর্যায়ে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকারাই এ বিষয়গুলো তদারক করেন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিদর্শিকা না থাকায় এসব বিষয়ে নাজুক অবস্থা দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য এমনিতেই প্রয়োজনীয় জনবলের ব্যাপক অভাব। যেসব শূন্যপদ রয়েছে, সেগুলোতেও নিয়োগ বন্ধ। অথচ এফডব্লিউভিরাই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত নারী-শিশু-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন। তারা এই স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। এ জন্য করোনাকালে অনিরাপদ গর্ভপাত ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভবতীর সংখ্যা বাড়ছে। তাই অবিলম্বে এফডব্লিউভি পদে ঝুলে থাকা নিয়োগ শেষ করতে হবে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর