মঙ্গলবার ২৩ জুলাই, ২০১৯ ২:৫৭ এএম


ঘুরে ফিরে শিক্ষা ভবনেই থাকছেন যারা

নিজামুল হক

প্রকাশিত: ০২:০০, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৪:২৪, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

সরকারি কলেজে পাঠদানের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারে। শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু কলেজের শিক্ষক হওয়ার চাইতে শিক্ষাভবনে কর্মকর্তা হিসাবে থাকাই পছন্দ অনেকের। কারণ এতে আছে বাড়তি নৈতিক-অনৈতিক সুবিধা। এসব কর্মকর্তাদের অনেকেরই কলেজে পাঠদানে যেমন আগ্রহ নেই, তেমনি দীর্ঘদিন পাঠদানের বাইরে থাকায় ভুলতে বসেছেন পাঠ্যবিষয়গুলো।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রধান কার্যালয় শিক্ষাভবনের চিত্র এটি। অভিযোগ রয়েছে, এই শিক্ষাভবনে বিভিন্ন পদে থাকার জন্য নানা কৌশল ও ছলচাতুরির আশ্রয় নেন কোন কোন শিক্ষক। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের ম্যানেজ করে তারা এখানে থাকেন, কোন কারণে বদলি করা হলেও আবার কর্তাদের ম্যানেজ করে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরির ক্ষেত্রে একই স্থানে তিন বছরের বেশি থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু শিক্ষাভবনে সবক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না।

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা ক্যাডারের শীর্ষ পদ মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন চাইছি। কারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে আছেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেব।’

 

সম্প্রতি মাউশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সমাজ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক দিল আফরোজ বিনতে আছির শিক্ষাভবনে প্রথমে আসেন উচ্চ মাধ্যমিকের একটি প্রকল্পের ‘প্রজেক্ট অফিসার’ হিসাবে ২০০৬ সালে। এই পদে থাকেন ২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত। পরে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার গবেষণা কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন ২০০৮ সালের নভেম্বরে। এখানে ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত থাকার পরে পদোন্নতি পেয়ে যোগদান করেন একই বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসাবে। এই কর্মকর্তা এক যুগ ধরে আছেন শিক্ষাভবনে।

 

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক হিসাবে কর্মরত অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন এ পদে যোগদান করেন ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। তবে এর আগে তিনি শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ছিলেন ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত। তিন বছর অন্য কোথাও বদলি হলেও আবার ফিরে আসেন পরিচালক হিসাবে। মাউশির এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা।

 

কৃষি বিজ্ঞানের শিক্ষক মু. আবুল কাসেম শিক্ষাভবনে আসেন ২০০৫ সালের জুলাইয়ে। তখন তার পদ ছিল শিক্ষা অফিসার (আইন)। তিনি দুটি পদোন্নতি পেয়ে এখনও রয়ে গেছেন একই শাখায়।

 

তাসলিমা সুলতানা ইতিহাসের শিক্ষক। গবেষণা কর্মকর্তা (পিএসপিইউ) হিসাবে শিক্ষাভবনে যোগদান করেন ২০০৫ সালের ৩১ আগস্ট। পরে গবেষণা কর্মকর্তার (পিএমকিউইউ) দায়িত্বে থাকেন ২০০৭ সালের জুলাই থেকে ২০০৮ সালের মে পর্যন্ত। পরে পদোন্নতি পেলেও ভবন ছেড়ে যেতে হয়নি তাকে। দায়িত্ব পান পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালকের। এই পদে থাকেন ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। পরে সহকারী পরিচালক হন (একিউইউ)। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দিলরুবা আক্তার এই অধিদপ্তরে আছেন প্রায় এক যুগ ধরে। ২০০৭ সালের মে মাসে যোগ দিয়ে দুটি শাখা পরিবর্তন করে তিনি এখন গবেষণা কর্মকর্তা (একিউএইউ)। শারীরিক শিক্ষা শাখার শিক্ষা অফিসার আব্দুস সালাম আছেন ১০ বছর ধরে। রসায়নের শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ নাসির উদ্দিন আছেন ৫ বছরের বেশি সময়। সমাজ কল্যাণের শিক্ষক তানভীর মোশাররফ খান, শিক্ষা কর্মকর্তা আফসার উদ্দিন, গবেষণা কর্মকর্তা ফাতিমাতুজ্জোহরা, সহকারী পরিচালক এ কে এম মাসুদ আছেন ২০১৩ সাল থেকে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক সাবিনা বেগমও আছেন প্রায় একই সময় ধরে।

 

দর্শনের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম মাউশিতে আছেন ২০০৮ সাল থেকে। তিনি আইন শাখায় যুক্ত ছিলেন ২০১৭ সাল পর্যন্ত। কমার্শিয়াল সেলে ‘অফিস ইন চার্জ’ হিসাবে আছেন এখনও, তবে দায়িত্ব পালন করছেন আইন শাখার। জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি শিক্ষা ক্যাডারের হলেও আইনের ওপর আমার প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি রয়েছে। সরকার এ কারণেই হয়তো আমাকে আইন শাখায় যুক্ত রেখেছে। নতুন একজন দিলে সে হয়তো সবকিছু বুঝে উঠতে পারবে না।’

 

২০০৯ সালের নভেম্বর থেকে শিক্ষাভবনে আছেন আশেকুল হক। প্রায় ১০ বছর ধরে সহকারী পরিচালক হিসাবে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, আমাকে ডেস্কের কাজ করতে হয়। অন্য ডেস্কের চেয়ে আমার ডেস্ক ‘নিট অ্যান্ড ক্লিন’। নিজের যোগ্যতা দিয়ে এখানে এতদিন রয়েছেন -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘এটা বলা কী ঠিক হবে? ’

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা অধিদপ্তর ছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিসহ (নায়েম) ঢাকায় শতাধিক কর্মকর্তা ঘুরে ফিরে থাকছেন। এদের খুঁজে বের করে বদলি করা অতি জরুরি। এরা দীর্ঘদিন একই স্থানে থেকে সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষক, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা শিক্ষা সেক্টর।

 

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি ও রাজধানীর সরকারি নজরুল কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিমউল্লাহ খন্দকার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার বাইরে থাকার পক্ষে আমি নই। যারা দীর্ঘদিন গ্রামে বা মফস্বল এলাকায় থাকছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে ঢাকায় বদলি না করায় তারা চাকরির প্রতি বিরক্ত হচ্ছেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে আছেন, শিক্ষার স্বার্থে তাদের দ্রুত বদলি করা উচিত।’

সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর