সোমবার ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪২ পিএম


গুচ্ছ কিংবা সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ৮ আগস্ট ২০১৯  

২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বৈঠককালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা চালু করার তাগিদ দিয়েছিলেন, কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে ওই বছর তা করা হয়নি। কিন্তু এবার? এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসিকে কতটা অগ্রগতি হয়েছে তা জানাতে কয়েকবার চিঠি দিয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো কাজ হয়নি। ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ অবধি সে রকম কোনো অগ্রগতি আমরা দেখছি না। তবে একটি আনন্দের সংবাদ হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবার গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি বিভাগে মেধা ও পছন্দক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। ভর্তীচ্ছু একজন শিক্ষার্থী কোন কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দেবে, তাও তাদের পছন্দের ভিত্তিতে ঠিক করা হবে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় ভর্তির আবেদন নেওয়া হবে, ফি কত টাকা হবে ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রথমবারের মতো এ গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেবে ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পরের বছরগুলোতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ মহতী উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।

যদিও এবারও পুরোপুরি সফল হচ্ছে না গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। আগামী বছর থেকে নাকি পুরো দেশেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় গুচ্ছ, না হয় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। স্বায়ত্তশাসন খর্বের দোহাই দিয়ে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা নিয়েছে এবারও। এবার শুধু কৃষি ও কৃষির প্রাধান্য থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে একটি মাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ইউজিসির এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে প্রতিবছর ভর্তির মৌসুমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া, ভর্তি কোচিংসহ আনুষঙ্গিক খাতে একজন শিক্ষার্থীর গড়ে ৯৬ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর পক্ষে এই অর্থের জোগান সম্ভব হয় না। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা না হলেও গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া ভীষণ কষ্টকর। তারা কোথায় থাকবে, কী খাবে, কী হবে তাদের নিরাপত্তা। নারী শিক্ষার্থীরা তো এখনো দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে না নিরাপত্তার কারণে। তাদের সঙ্গে থাকে মা-বাবা, না হয় বড় ভাই বা বড় বোন কিংবা কোনো নিকটাত্মীয়। তাদের সবার জন্যই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া মারাত্মক কষ্টকর। অর্থনৈতিক ও শারীরিকভাবেও ক্ষতিকর। শিক্ষামন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, ‘ছেলেরা অনেক সময় মসজিদে ঘুমিয়ে থেকে পরীক্ষা দেয়, কিন্তু মেয়েরা কোথায় গিয়ে থাকবে? মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত করতে পারলে অন্যরা কেন পারবে না?’

জানা যায়, গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে গেলে স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হওয়ার যে কথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলে আসছে, সেটিকে মানতে নারাজ বেশ কিছু শিক্ষক। এখানে আসলে আর্থিক বিষয়টিই নাকি মুখ্য। বিষয়টি যদি তাই হয়ে থাকে তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। মাত্র কয়েকটি টাকার জন্য জাতির বিবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককুল ভর্তীচ্ছু ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর ব্যবস্থা করবেন—এটি মেনে নেওয়া যায় না। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, দুর্ঘটনা, নারীদের নিরাপত্তা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে অস্বাস্থ্যকর খাওয়া-দাওয়া, আর্থিক সংগতি ইত্যাদি বাস্তবিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো ধোপে টেকে না। ভর্তি পরীক্ষার ফি বাবদ নাকি প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ কিছু টাকা আয় করে এবং টাকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ কোটিও ছাড়িয়ে যায়। ভর্তি পরীক্ষা থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা দিতে হয়। পত্রিকায় দেখলাম সেটি নাকি আসলে করা হয় না। আয়ের বেশির ভাগই নানা কাজের সম্মানীর নামে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। ভিসি থেকে শুরু করে এই অর্থ পিওন, দারোয়ান পর্যন্ত বণ্টন করা হয়।

কিছু ভিসির অভিমত হচ্ছে, সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে জটিলতা হবে, গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন হবে। মাইগ্রেশন পদ্ধতি কিভাবে থাকবে সেগুলো বিবেচনায় আনার জন্য প্রথমত একটি স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একটি আনন্দের সংবাদ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যেমন ইউজিসি বা কেন্দ্রীয় সেলের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, এমসিকিউর পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষা, ফলাফলের ভিত্তিতে আসন সংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো এবং ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। তবে এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা সহজ, কিন্তু সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। ফলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে উঠতে পারে নানা প্রশ্ন। অনেক শিক্ষার্থী উপযুক্ত হলেও ভর্তির বিবেচিত নাও হতে পারে। কয়েক লাখ ভর্তি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রয়োজন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মচারীর সমন্বিত একটি কার্যকর পরিকল্পনা। ইউজিসি বা সেন্ট্রাল সেলের এ রকম একটি পরিকল্পনা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ইউজিসির সে রকম উদ্যোগও লক্ষ করা যায় না যাতে ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীরা নিজ জেলা বা বিভাগে বসে পরীক্ষা দিতে পারে। ইউজিসি সে রকম কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিলে এত দিনে বিষয়টি বাস্তবায়িত হতো।

কেউ কেউ বলছে যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক ও কর্মচারীরা এসে যখন কেন্দ্রে কাজ করবেন তাঁদের সমন্ব্বয়ের ব্যাপারটি হবে কঠিন। তবে একেক বিশ্ববিদ্যালয়কে একেক বছর সমন্বয়ের দায়িত্ব দিলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে, যদিও প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, প্রুফ রিডিং, তিন সেট প্রশ্ন বাছাই দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে এক ধরনের সমস্যায় ফেলে দেবে। দ্বিতীয়ত, কয়েক লাখ প্রশ্ন তৈরি, প্রিন্টিং, প্যাকেট করা, সংরক্ষণ করা এবং সারা দেশে প্রেরণ কিংবা ইলেকট্রনিকভাবে প্রেরণ— সবই কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার একটি বিষয় থেকে যাচ্ছে। সেই রকম দক্ষ ব্যবস্থাপনা কিন্তু গড়ে ওঠেনি। সুষ্ঠুভাবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মতো দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি একক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা ইউজিসির। আবার একটি বিশ্ববিদ্যালয় কো-অর্ডিনেশনের দায়িত্ব নিলেও লজিস্টিক সাপোর্ট এবং একযোগে পুরো দেশে কাজটি করার মতো সক্ষমতা কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই হয়তো নেই। আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন ভিন্ন ভিন্নভাবে খাতা মূল্যায়ন করবেন তখন দেখা যাবে আরেক ধরনের সমস্যা অর্থাৎ উত্তরপত্র সঠিকভাবে ও ইউনিফর্মলি মূল্যায়িত নাও হতে পারে। মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় একই ধরনের প্রশ্ন হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বিভাগ ও ফ্যাকাল্টি। ভর্তীচ্ছুদের ভর্তির ও পছন্দের বিষয়টি কিভাবে যাচাই করা হবে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

কেউ কেউ অবশ্য মত প্রকাশ করেছে যে গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধও হয়ে যেতে পারে। কারণ একমাত্র ভর্তি পরীক্ষা কোনো কারণে খারাপ হলে তার জন্য দ্বিতীয় সুযোগ আর থাকছে না যা বর্তমান পদ্ধতিতে খোলা রয়েছে, অর্থাৎ রাজশাহীতে চান্স না পেলে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম না পেলে ময়মনসিংহ ইত্যাদি। আবার দুর্নীতির সুযোগও প্রসারিত হবে। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা একই প্রশ্নপত্রে হলেও কেন্দ্র থাকবে আলাদা। বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তখন কড়া নজরদারির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হয়, যে বিষয়টি আর থাকবে না যখন পরীক্ষা দেশের আনাচে-কানাচে অনুষ্ঠিত হবে। এত কিছুর পরেও শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথা ভেবে, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা হয় সমন্বিত পদ্ধতিতে, আর তা না হলে অন্তত গুচ্ছ পদ্ধতিতে অর্থাৎ একই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। গুচ্ছ বা সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে উপরোক্ত সমস্যাগুলো হতে পারে। তাই আগেভাগে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিষয়টি অসম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে তথা দেশের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত কিংবা গুচ্ছ পদ্ধতিতে নেওয়াটাই শ্রেয়।

লেখক : বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা), সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

[email protected]

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর