বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১:৩০ এএম


কোভিড – ১৯ প্যানডেমিক , বেকারত্ব এবং জনতার রোষ

ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ১০:৫৯, ৭ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৫৯, ৭ আগস্ট ২০২০

আজ থেকে পঁয়ষট্টি বছর পূর্বে মিসিসিপিতে একটি খুনের ঘটনা ঘটে । তারিখটি ছিল ১৯৫৫ সালের ২৮শে আগস্ট । ইমেট টিল নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে নৃশংস ভাবে খুন করা হয় । শে সময় যুক্তরাষ্ট্রে কালো বর্ণের লোকজনদের সামান্য কারণে বেত্রাঘাতে জর্জরিত করা , ফাঁসিতে ঝুলানো , গুলি করে কিংবা পিটিয়ে হত্যা নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার ছিল । এ জন্য শ্বেতাঙ্গদের শাস্তি হতোনা , এমনকি প্রতিবাদ ও না । জিম ক্রো’র আমেরিকার এহেন প্রতিচ্ছায়ায় ও ইমেট টিলের মা’কে প্রতিবাদের রাস্তা আবলম্বন থেকে ফেরাতে পারেনি । ম্যামি টিল মোবলি ছিলেন অসম সাহসী অসাধারণ এক মহিলা । অকুতোভয় ম্যামি মোবলি

ছেলের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ কফিনে তোলার পর ও এ নির্দয় , অকারণে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডটি মেনে নিতে পারছিলেন না । সারা বিশ্ব দেখুক তাঁর নিরাপরাধ ছেলেকে নির্মমতার সাথে হত্যা করা হয়েছে । এ মর্মজ্বালা সামান্য মাত্রায় হলে ও নিরসনের জন্য তিনি ছেলের প্রাণহীন দেহের উন্মুক্ত ক্যাসকেটে রাখা অবস্হায় ছবি তুলেন । ‘জেট’ ম্যাগাজিন থেকে ছবিটি বিশ্বের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে । সারা দুনিয়া দেখে তাঁর প্রাণপ্রিয় ছেলেকে কি নৃশংসহ ভাবে হত্যা করা হয়েছে । এ ছবি ও ঘটনার বর্ণনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকায় সিভিল রাইট মুভমেন্ট এর শুভসূচনা শুরু হয় । ছাত্র , জনতা , শ্রমিক , খেলোয়াড় , যুব সম্প্রদায় এরা সবাই আন্দোলনে যোগ দেয় । ইমেটের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে মারটিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর
“আই হেভ এ ড্রিম” শীর্ষক কালজয়ী বক্তৃতা প্রদান করে অসহযোগ আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে আসেন এবং নিজে ও আমেরিকার সিভিল রাইট মুভমেন্টের অভিবাংসিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন ।

বিগত মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্যকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটে । পুলিশর গুলিতে নিরস্র কৃষ্ণাঙ্গ আহমাউদ আরবেরী , ব্রেউনা টেইলর , এবং জর্জ ফ্লয়েড ম্যারা গেলে সারা দেশে , বিশেষত বড়ো বড়ো শহরে জনতা ফুঁসে উঠে । জনতার এ রোষ শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত চলতে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ , মূলত পুলিশ বাহিনীর শ্বেতাঙ্গ সদ্যসদ্যের উপর । পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের দাবীতে আহুত ধর্মঘট ও হরতালে ব্যাপক লুটতরাজ ও সহিংস ঘটনা যে ঘটেনি তা নয় । আনেক সময় শান্তিপ্রিয় জনসাধারণ ও
অহিংস মিছিল করতে গিয়ে বেদরক মার খায় পুলিশের হাতে । সাধারণ জনগণের , বিশেষত আফ্রিকান-আমেরিকানদের এমনতরো রোষের যথেষ্ট কারণ আছে । পুঞ্জিভূত রোষ এ করোনা সময়ে , চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে আছড়ে পড়ে পুলিশের বাড়াবাড়ির কারণে । হোয়াইট হাউজ , বিচার বিভাগ , ফেডারেল সরকার সহ স্থানীয় সরকার প্রশাসনের উপর তাদের রাগ চরমে কারণ যুগ যুগ ধরে তারা শিক্ষাদীক্ষা , চাকরী-বাকরী ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়েছে । সব মিলিয়ে , যুক্তরাষ্ট্রের ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সম্পদের অসম বণ্ঠন ব্যবস্থা ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যকে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও পীড়াদায়ক অবস্থানে নিপতিত করেছে । দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনে ১% ধনিক গোস্টীর হাতে সম্পদের ৯৯% । এজন্য অনেকে ব্যঙ্গ করে আমেরিকাকে শ্রেণিহীন সমাজ বলে । সত্যি কথা হলো , বিগত চল্লিশ বছর যাবত দেশের এক-পঞ্চমাংশ জনসংখ্যার বা ২০% লোকের বেলায় সম্পদ বেড়েই চলেছে অবাধ গতিতে । ৮০% ভাগ্যের জন্য এ বৃদ্ধি অতি মন্থর । এ বিভাজনে শ্বেতাঙ্গরা সুবিধজনক অবস্থানে বলাইবাহুল্য । শতাব্দীর পর শতাব্দী কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল । বর্ণবাদের অপআদর্শকে কেন্দ্র করে এ পৃথকীকরন কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সীমাহীন বাঁধার কারণ ছিল । সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণে এ শিক্ষা নিয়ে গর্ব করার মতো তেমন কিছু তারা আহরণ করতে পারেনি । পিছিয়ে থাকায় জন্ম নেয়া মানসিক দৈন্যতা অদ্যাবদি আফ্রিকান-আমেরিকান ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিদ্যমান যদি ও মেধার দিক থেকে তারা অন্যদের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় ।
কোভিড-১৯ সময়ের বিগত পাঁচ মাস অন্যান্য জন গোস্টির সাথে সাথে তাদেরকে দারুণভাবে পর্যুদস্ত করেছে । এমনিতেই বেকারত্বের হার তাদের মধ্যে
অনেক বেশী । নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হয় । বাড়ী কেনা, ভাড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে তো বটেই , প্রতিদিনের চলাফেরা , গাড়ী চালানো এসব কর্মকাণ্ডে ও পুলিশ ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হয় অনেক বেশী । এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে মোট জন সংখ্যার মাত্র ১২% হলেও ফেডারেল প্রিজনের ৩৩% কয়েদী আফ্রিকান-আমেরিকান ; শ্বেতাঙ্গরা মোট জনসংখ্যার ৬৪% হলেও এদের কয়েদীর হার ৩০% । কৃষ্ণ বর্ণের যারা তারা শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে গড়ে ৩.৫ বছর কম বেঁচে থাকে ।
কোভিড-১৯ সংক্রমণের এবং মৃত্যুর হার অর্থনৈতিক ভাবে দীনহীন যারা তাদের হোয়াইটদের তুলনায় অনেক বেশই । এরা আক্রান্ত হলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত । দীর্ঘদিনের বর্ণ বৈষম্য , বেকারত্ব , দুর্বল স্বাস্থ্য সেবা , আয়ের ক্ষেত্রে নিন্মমুখিতা , শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এসব কারণের সাথে কো-১৯ প্যানডেমিক , বেকারত্ব এবং জনতার রোষ -এ ত্রিবিদ কার্যকারণ মিলে আজকের আমেরিকা নিশ্চয়ই এক সমস্যাসঙ্কুল সমাজ , অর্থনৈতিক সত্তা এবং বিপন্ন রাষ্ট্র।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর