বুধবার ২১ অক্টোবর, ২০২০ ১৫:৫৫ পিএম


কেমন হবেন শিক্ষক

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রকাশিত: ০৭:০৩, ১৪ অক্টোবর ২০২০  

একজন ভাল শিক্ষক সারা জীবনে তৈরি করেন অগণিত ভাল মানুষ। কেননা, শিক্ষক হচ্ছেন, মানুষ গড়ার কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর ভাল না হলে ভাল মানুষ তৈরির সকল সম্ভাবনার করুন মৃত্যু ঘটে। বিফলে যায় শিক্ষাক্ষেত্রের সকল শ্রম ও বিনিয়োগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন, শিক্ষা সামগ্রী, পরিবেশ ও অন্যান্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধা ভাল থাকা আবশ্যক। তবে এসবের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ভাল শিক্ষক হচ্ছে প্রধান উপকরণ। একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও মেধার সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে সুপ্ত প্রতিভাকে সযত্নে জাগিয়ে লালন-পালনের মাধ্যমে তাকে অধিক কর্মক্ষম করে তোলা শিক্ষকের প্রধান কাজ। এ কাজ অত্যন্ত জটিল। ভাল শিক্ষক ব্যতীত ভাল শিক্ষা অসম্ভব। একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষা দেন তা নয়, শুধু সিলেবাসভুক্ত বিষয় শিক্ষা দেন তা নয়, শুধু ক্লাসের শিক্ষার্থীদেরই শিক্ষা দেন তা নয়; তিনি তাঁর কথায় কাজে চলনে-বলনে, আচরনে সদা-সর্বদা সবাইকেই শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তিনি ভাল হলেই ভাল হয় শিক্ষা। তিনি উত্তম হলেই উত্তম হয় শিক্ষার্থী। তিনি উৎকৃষ্ট হলেই উৎকৃষ্ট হয় পুরো জাতি।

শিক্ষকতা কোন সাধারণ পেশা নয়, একটি ব্রত। শিক্ষকতা একটি মহৎ ও পুণ্যকর্ম। সঠিক শিক্ষতার মাধ্যমে শিক্ষক নিজেও হয়ে উঠবেন উত্তম মানুষ। শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর পুজনীয়, তেমনি শিক্ষার্থীও শিক্ষকের পূজনীয়। কেননা শিক্ষার্থীদের নিয়েই শিক্ষকের জীবন আবর্তীত। যার শিক্ষার্থী নেই তিনি শিক্ষক নন। সঠিক শিক্ষা দান পুণ্যকর্ম বলেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের পূজনীয়। কেননা, শিক্ষার্থী ব্যতীত শিক্ষকের এই পুণ্যকর্ম করার সুযোগ নেই। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের সন্তানকে আসল মানুষ বানানোর মহান দায়িত্ব শিক্ষকের। অকৃপনভাবে এই মহান দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সহজেই সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা লাভ করবেন একজন ভাল শিক্ষক। যিনি শিক্ষকতায় নিয়োজিত তিনি শিক্ষার্থীর সেবা করার মাধ্যমে আজীবন করতে পারেন মহান সৃষ্টিকর্তার সেবা। যখন একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের পূজনীয় মনে করবেন তখন তিনিও হইয়ে উঠবেন শিক্ষার্থী তথা সমাজের সকল মানুষের পূজনীয়।

 
শিক্ষার্থীরাই হবে একজন ভাল শিক্ষকের সবচেয়ে প্রিয় পাত্র। কেবল ভাল শিক্ষার্থী নয়, সকল শিক্ষার্থীর প্রতিই শিক্ষকের থাকতে হবে অগাধ ভালবাসা। ভালবাসা দিয়েই শিক্ষক কাছে টেনে নিবেন শিক্ষার্থীদের। লালন করবেন অতি সযত্নে। শিক্ষার্থীর জান্তে ও অজান্তে তার মধ্যে শিক্ষক প্রত্থিত করবেন নিজের সকল ভাল দিক। শিক্ষার্থীর কল্যাণ কামনায় মনে-প্রাণে, কাজে-কর্ম্‌ ঘুমে-জাগরণে শিক্ষক হবেন সবচেয়ে বেশি নিবিষ্ট। সকল শুভ কাজে শিক্ষার্থীর সফলতাকে নিজের সফলতা মনে করে সচেয়ে বেশি আনন্দিত হবেন শিক্ষক। আবার কোন একটি শুভ কাজে শিক্ষার্থীর ব্যার্থতাকে নিজের ব্যার্থতা ভেবে সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হবেন শিক্ষক। নিজের শিক্ষার্থী ব্যার্থ হলে, সঠিক শিক্ষা দিতে পারেননি মনে করে নিজেকে অপরাধী ভাববেন শিক্ষক। এমনিভাবে শিক্ষার্থীর সবচেয়ে আপন ও কাছের মানুষ হয়ে উঠবেন একজন ভাল শিক্ষক। তিনি শিক্ষার্থীর ভয়ের পাত্র না হয়ে হবেন পরম শ্রদ্ধার পাত্র। এমন শিক্ষকের সকল আদেশ-নিষেধ সানন্দে শিরোধার্য্য করে সঠিক মানুষ হয়ে উঠবে শিক্ষার্থী। সফল হবে শিক্ষকের শিক্ষকতা।

           
একজন ভাল শিক্ষক আজীবন লালন করবেন জানার এবং জানানোর ঐকান্তিক ইচ্ছা। শিক্ষককে জ্ঞানার্জনে হতে হবে নিরলস। অত্যন্ত সমৃদ্ধ হতে হবে নির্ধারিত বিষয়বিত্তিক জ্ঞানে। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অত্যন্ত ভালভাবে জানা থাকতে হবে শিক্ষার সংজ্ঞা, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও শিক্ষা দানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। এছাড়াও জানতে হবে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র ও মনোবিজ্ঞান এবং ক্রম পরিবর্তনশীল বিশ্বের পরিবর্তীত জ্ঞান, তত্ত্ব ও তথ্য। আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষককে থাকতে হবে সমৃদ্ধ। জানতে হবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার, সুফল-কুফল এবং সে আলোকে শিক্ষার্থীকে দিতে হবে সঠিক দিক নির্দেশনা। শিক্ষা লাভে শিক্ষককে সদা-সর্বদা থাকতে হবে সক্রিয়। হতে হবে বই ও প্রকৃতির একনিষ্ঠ পাঠক এবং সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক নিজে হবেন সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী। যিনি নিজে শিক্ষার্থী নন, তিনি অন্যের শিক্ষক হবেন কীকরে? শিক্ষা দান শিক্ষকের একান্ত কর্তব্য। আর শিক্ষা গ্রহণ শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব। শিক্ষা দানের পূর্বশর্তই শিক্ষা গ্রহণ। প্রতিনিয়ত শিক্ষা দান কার্যের পূর্ব প্রস্তুতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ। অবশ্যই থাকতে হবে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ। যে শিক্ষক ভাববেন, আমি কেবল পড়াব, পড়ব না; সে শিক্ষক কখনো ভাল শিক্ষক হবেন না। শিক্ষক নিজের মধ্যে শিক্ষার সঠিক চর্চা করেই সঠিক পরিচর্যা করবেন শিক্ষার্থীর। ভাল শিক্ষক নিজের মধ্যে জ্ঞানের চর্চা করবেন প্রতিদিন প্রতিক্ষণ আজীবন। নিরলসভাবে অর্জন ও বিতরণ করবেন নতুন নতুন জ্ঞান। শিক্ষার্থী ও সমাজের সকল মানুষকে করবেন জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ। আলোকিত করবেন দেশ ও জাতি।


একজন ভাল শিক্ষক হবেন নিবেদিত-প্রাণ মানুষ। তাঁর থাকবে নিজেকে উজার করে দেবার মত মন-মানসিকতা। ভোগের চেয়ে ত্যাগের ইচ্ছাই থাকবে বেশি। তিনি কী পেলেন, তারচেয়ে বেশি ভাববেন কী দিলেন এবং কী দিতে পারলেন না। ভোগের চেয়ে ত্যাগেই বেশি আনন্দিত হবেন তিনি। বস্তু প্রাপ্তির নয়, জ্ঞান প্রাপ্তি ও প্রদানের সংগ্রামে অবতীর্ণ থাকবেন শিক্ষক। কেবল বস্তুগত প্রপ্তির আশায় যিনি শিক্ষক হবেন ও শিক্ষকতা করবেন তিনি কখনো প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠবেন না। কেননা, প্রকৃত শিক্ষা দানের অন্তর্নিহিত অনাবিল আনন্দ ও শিক্ষা দানের অফুরান পুণ্য থেকে তিনি বঞ্চিতই থেকে যাবেন। শিক্ষকতার প্রকৃত পরিতৃপ্তি লাভের অতল সাগরে কোনদিন যাওয়া হবে না তার। শিক্ষার্থীর জন্য যিনি নিবেদিতপ্রাণ তিনিই পরম শ্রদ্ধেয়। তিনাকেই শ্রদ্ধাভরে আজীবন মনে রাখে শিক্ষার্থী।


শিক্ষক নিজে হবেন অত্যন্ত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ এবং তেমনি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ করে গড়ে তুলবেন তাঁর শিক্ষার্থীদের। কখনো কোন মিথ্যার আশ্রয় নিবেন না শিক্ষক। প্রতিবাদ করবেন অন্যায়ের। ঘৃণা করবেন অন্যায়কে। সচেষ্ট থাকবেন ন্যায় প্রতিষ্ঠায়। সততার বলেই বলীয়ান থাকবেন শিক্ষক। কখনোই শঠতার আশ্রয় নিবেন না কর্মে ও কথায়। ফাঁকি দিবেন না কাজে। নিজের মধ্যে লালন করবেন ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ। লোভ-লালসার উর্ধে থেকে চিন্তা করবেন শিক্ষার্থী ও সমাজের সকল মানুষের কল্যাণ। নিজের শিক্ষার্থীদের বানাবেন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ।


দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে পরিপূর্ণ হবেন শিক্ষক। ভালভাবে জানবেন দেশ ও জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নিজের মধ্যে গভীরভাবে লালন ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সচেতনভাবে সঞ্চালণ করবেন দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা। দেশপ্রেমে ও জাতীয়তাবোধে উজ্জ্বীবিত করবেন শিক্ষার্থীদের। গড়ে তুলবেন দেশের কল্যাণে জীবন বাজি রাখার মত নাগরিক। অত্যন্ত সযত্নে লালন করবেন জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। পোশাকে-আশাকে, চলনে-বলনে, আচার-অনুষ্ঠানে ফুটিয়ে তুলবেন জাতীয় ঐতিহ্যের আলোকিত দিকগুলো। তিনি হবেন শালিন ও উত্তম ব্যবহারের অধিকারি অনুসরণীয়-অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে প্রতিরোধ করবেন ভিনদেশী সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলে ধরবেন নিজস্ব সংস্কৃতির সকল ভাল দিক। তখন শিক্ষকের মতই শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠবে আদর্শ সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব।


অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হবেন শিক্ষক। তিনি হবেন সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ও বাস্তববাদী। তাঁর আয়ত্বে থাকবে শিক্ষা দানের মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান ও আধুনিক কলা-কৌশল। একজন ভাল শিক্ষক হবেন- শিক্ষার্থীর মন-মানসিকতা, যোগ্যতা-অযোগ্যতা, আগ্রহ-অনাগ্রহ বোঝার অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারি। নিজের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সবদিক থেকে প্রতিনিয়ত মূল্যায়ণ করবেন শিক্ষক। সেই মূল্যায়ণের আলোকেই দেখাবেন শিক্ষার্থীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ। দেখিয়ে দিবেন কোন পথে গেলে অধিক সফল হবে কোন শিক্ষার্থীর জীবন। শিক্ষার্থীর সামর্থ্য অনুসারে বাতলে দিবেন পথ ও সে পথে চলার নিয়মকানুন। ধন্যবাদ দিয়ে, পুরস্কার দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে, উদ্দীপনা দিয়ে প্রতিদিন বাড়িয়ে দিবেন শিক্ষার্থীদের সৎ সাহস ও কর্মোদ্যম। ঘটিয়ে দিবেন কর্মদক্ষতা, বিবেকের জাগরণ, নৈতিক শক্তির উন্মেষ, আত্মার বিকাশ ও অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন। দেখাবেন সঠিক স্বপ্ন, শিখাবেন উত্তম স্বপ্ন দেখা। সেই স্বপ্ন ঘুমিয়ে দেখার অলিক স্বপ্ন নয়, জেগে দেখার বাস্তব স্বপ্ন। শিক্ষার্থীর উন্নত জীবন রচনা করার শুভ স্বপ্ন। যা বাস্তবায়নের জন্য ঐকান্তিক হয়ে উঠবে শিক্ষার্থী। তার কাঙ্খিত শুভ স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে হয়ে উঠবে সফল ও সুখী-সমৃদ্ধ মানুষ। তখনই তার শিক্ষক হয়ে উঠবেন সফল শিক্ষক।   


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষকের থাকতে হবে প্রাকৃতিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির একনিষ্ঠ ছাত্র হবেন শিক্ষক। থাকতে হবে প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ঐকান্তিক ইচ্ছা। নিজে শিখবেন এবং নিজের শিক্ষার্থীদের শিখাবেন প্রকৃতির পাঠ। সেইসাথে শিখিয়ে দিবেন প্রকৃতির পাঠ রপ্ত করার কৌশল। শিক্ষার্থী যেন প্রকৃতিকে বানাতে পারে তার জীবনের নিত্য শিক্ষক। নিজে নিজেই শিখে নিতে পারে প্রকৃতির সঠিক শিক্ষা। প্রতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার নির্ধারিত সিলেবাস থাকলেও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সিলেবাস অনেক ব্যাপক। সেই ব্যাপকতার ভিতর থেকে প্রতিনিয়ত ভাল মন্দ চিনে ভালকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করার শিক্ষা নিবেন ও দিবেন শিক্ষিক।

লেখক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক এবং অধ্যক্ষ- কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর