শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ২২:০৩ পিএম


কেন বছরের পর বছর কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় এক শিক্ষকবিশিষ্ট থাকবে?

আবদুল মকিম চৌধুরী

প্রকাশিত: ১০:১২, ১৯ জুলাই ২০১৯  

দেশের সার্বিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) অংশীদারিত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন।

সোমবার (১৫ জুলাই) জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে সভাপতির দায়িত্ব, বিদ্যালয় পরিদর্শন, বিদ্যালয় জাতীয়করণে গঠিত জেলা টাস্কফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর গৃহীত গণশিক্ষা কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করে জীবনব্যাপী শিক্ষায় নিবিষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে সচিব বলেন, গোটা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের চলমান অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হলে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং বাড়াতে হবে। এছাড়া পরিদর্শনকালে প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাদি চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত কাজের মান উন্নয়নে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।
বর্তমান সরকারের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে বলে উল্লেখ করে সচিব জানান, ২০০৯ সালে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের নির্ধারিত লক্ষ্য ১:৪৬-এর স্থলে বর্তমানে ১:৩৬-এ উন্নীত হয়েছে।

সচিবের বক্তব্যে অনেকগুলো দিক আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জেলা প্রশাসকদের নজরদারির কথা বলেছেন তিনি। আমরা লক্ষ করেছি, প্রাথমিক শিক্ষায় জেলা প্রশাসকদের আগ্রহ কম। উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অধীনে আনার প্রস্তাব করেছেন তারা। ইউএনওকে পিআইওর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) লেখার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন গোপালগঞ্জের ডিসি।
উপজেলা পরিষদ আইনে উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত দফতরসংখ্যা ১৭টি। এর মধ্যে ইউএনওর দফতরও একটি। এখানে ইউএনওকে উপজেলা পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। নিজের এসিআর (এটি প্রকৃতপক্ষে এপিআর বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন) তো কেউ লিখতে পারেন না। তিনি অন্য ১৬টি দফতরপ্রধানদের এপিআর লিখতে পারেন। কেন জেলা প্রশাসকরা কেবল পিআইওদের এপিআর লিখতে আগ্রহী, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এমনিতেই উপজেলার প্রতিটি দফতর মনিটরিং করতে পারেন ইউএনও। কতটা করছেন তারা। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক শিক্ষকদের এক সভায় বলেছেন, তিনি নির্ধারিত সময়ের পরে স্কুলে আসেন, কিংবা আগে স্কুল ত্যাগ করেন প্রমাণ করতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেবেন। জানা গেছে, ওই উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে আসেন না এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় থেকে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুস সাত্তার সরকার ও শিক্ষা কর্মকর্তা নবেজউদ্দিন বিদ্যালয়গুলো আকস্মিক পরিদর্শন করছেন। এমন সময়ই প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক ওই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। (প্রথম আলো, ১১ জুন ২০০৬)। বর্তমানে কয়জন ইউএনও উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় আকস্মিক পরিদর্শন করেন? সচিব বলেছেন, ২০০৯ সালে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ১:৪৬। বর্তমানে এটি ১:৩৬। আমরা মনে করি এটি কেবল কাগজে-কলমে। হয়তো এ অনুপাত কেবল শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ১২টি ক্লাস্টারের মধ্যে কেবল সদর ক্লাস্টারের বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদসংখ্যা অনুযায়ী শিক্ষক আছেন।

সচিব যেদিন রাজধানীতে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, সেদিনই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু, ইউএনও শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল, সদর মডেল থানার ওসি একেএম আজিজুর রহমান মিয়া প্রমুখ। সমন্বয় সভায় একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘সমন্বয় সভা বলা হয়Ñকীসের সমন্বয়, কেমন সমন্বয়? শিক্ষকদের তো কথা বলতেই দেওয়া হয় না। সব কথা কর্মকর্তারা বলেন। শিক্ষকরা শুধু মাথা নাড়েন। আমার বিদ্যালয়ে বেঞ্চ নেই। বেঞ্চ চেয়েছি, দিতে পারেনি। যে বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেঞ্চ আছে, সেখান থেকেও আনতে দেওয়া হয় না। তাহলে সমন্বয় হলো কীভাবে।’
একজন এ লেখককে বলেছেন, উপজেলা অফিসে শিক্ষকদের জন্য বসার কোনো জায়গাই নেই। কোনো ফরম দিয়ে বলা হয়, ১০ মিনিটের মধ্যে পূরণ করে দিতে হবে। কোথায় বসে এটি পূরণ করবেন শিক্ষক? বারান্দায় একটি বেঞ্চ রাখলে তাতে বসে কাজ করতে পারতেন শিক্ষকেরা। দাঁড়িয়ে, মসজিদের বারান্দায় গিয়ে, চা দোকানে গিয়ে ফরম পূরণ করতে হয় শিক্ষকদের। নারী শিক্ষকদের ভোগান্তির শেষ নেই। এই শিক্ষক আরও বললেন, বিদ্যালয় পরিদর্শনে ক্লাস্টার অফিসার ছাদও দেখতে যান। ছাদে কোনো বর্জ্য থাকলে ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু যে বিদ্যালয়ে অফিস-সহায়ক নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, সে বিদ্যালয়ে ছাদ পরিষ্কার করবে কে?
১৩ জুলাই শেয়ার বিজে একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার একটি লেখা ছাপা হয়। ‘বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অংশীজনের ভূমিকা’ শীর্ষক ওই লেখায় তিনি বলেছেন, ‘দেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯টি। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে আছে এই বিদ্যালয়গুলো। মানুষের দান করা ভূমিতেই গড়ে উঠেছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। তারা সন্তানদের কথা চিন্তা করে এবং দেশের উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতের অগ্রগতির কথা ভেবেই এই জমিগুলো সরকারকে দিয়েছেন। স্বাধীনতার আগে ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের এই মূল্যবান সম্পত্তি দান না করলে হয়তো এত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত না।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘প্রতিটি বিদ্যালয়েরই একটি নির্দিষ্ট ক্যাচমেন্ট এরিয়া রয়েছে। শিশু জরিপের মাধ্যমে ৫+ থেকে ১০+ শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়। ক্যাচমেন্ট এরিয়ার কোনো শিশু যেন ভর্তির আওতার বাইরে না থাকে, কেউ যেন ঝরে না পড়ে বছরের শুরুতেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ জরিপ চালানো হয়। ফলে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়মুখী হচ্ছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি শিশু ভর্তি হওয়ার পর তার পড়াশোনার সব দায়িত্ব সরকারের। বছরের শুরুতেই বিনা মূল্যে বই দেওয়া থেকে শুরু করে শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান সবকিছুই সরকার করছে।

তাহলে সরকারকে সহযোগিতা করতে তথা বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন পেশার যারা বসবাস করছেন, তাদের দায়িত্ব কী? আমরা মনে করি তাদের অনেক বেশি দায়িত্ব রয়েছে।…’

অংশীজন হিসেবে অভিজ্ঞতা থেকে বলি, ক্যাচমেন্ট এরিয়ার বিভিন্ন পেশাজীবীদের অনেককেই বিদ্যালয়ের কাজে সম্পৃক্ত করেন না প্রধান শিক্ষক। যে শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না, তিনি স্থানীয় লোকদের বিদ্যালয়ের কাজে আগ্রহী করতে পারবেন কি? আবার শিক্ষা কর্মকর্তারা এমন শিক্ষকদেরই প্রশ্রয় দেন।
শিক্ষকদের উচিত স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করা, তাদের বিদ্যালয়ে উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা এবং মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, উঠানবৈঠক, স্লিপ স্টেকহোল্ডার মিটিং, সুধী সমাবেশ, বৃক্ষরোপণ, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ যাবতীয় অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বসাধারণকে আমন্ত্রণ জানানো। এতে বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের পজিটিভ ধারণা তৈরি হবে এবং তারা সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহী হবে।
অংশীজনের সহায়তায় ঝরেপড়া রোধ, শতভাগ মিড ডে মিল বাস্তবায়ন, বাল্যবিয়ে বন্ধ, শিশুশ্রম রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যবস্থা, গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাসহ যাবতীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে ‘আমাদের বিদ্যালয় আমরাই গড়ব’ এ স্লোগান বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করছেন লেখক। কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তারাই তো অংশীজনদের পাত্তা দিচ্ছেন না। কেন একটি উপজেলার ৯০ শতাংশ বিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদসংখ্যার কম শিক্ষক থাকবেন? কেনই বা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:১২৫ বা তার বেশি হবে? কেন বছরের পর বছর কোনো বিদ্যালয় এক শিক্ষকবিশিষ্ট থাকবে?

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

 

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর