শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ২৩:১৮ পিএম


কেউ-ই অনশনরত শিক্ষকদের খোঁজ নেননি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:০১, ৩ জুলাই ২০১৯  

জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এই দাবিতে গত বছর টানা অনশন কর্মসূচি পালন করেন তারা। সে সময় আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলেনি। দাবি আদায়ের জন্য বছরজুড়ে ছোট ছোট বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও সংশ্লিষ্টদের আমলে আসেনি বিষয়টি।

তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ফের আন্দোলনে নামে শিক্ষকরা। গত মাসের ১৬ তারিখ থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন শুরু হয়। পরে গত রোববার থেকে অনশন শুরু করেছেন শিক্ষকরা। তারা আজ থেকে আমরণ অনশনে যাবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কেউ-ই অনশনরত শিক্ষকদের খোঁজ নেননি। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত থাকলেও সমাজে আমরা অবহেলিত। নিজেদের মনে হয় দেশের বোঝা। খেয়ে না খেয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এখানে পড়ে থাকলেও কেউ আমাদের কথা শোনার প্রয়োজন মনে করছে না।

এদিকে, জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে গতকাল অনশনরত অবস্থায় ১১ জনসহ ১৪৯ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়েছেন। অসুস্থ শিক্ষকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. মামুনুর রশিদ খোকন বলেন, আমরা জাতীয়করণের বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন মহলে জানালেও আশানুরূপ সাড়া পাইনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর সাথেও দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করলে বিষয়টি ইতিবাচক হবে।

মামুনুর রশিদ খোকন আরো বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য কয়েকদিন ধরে চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি দেশে ফিরলেই আমরা দেখা করার চেষ্টা করবো।

জানা যায়, ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের দাবি, জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়গুলোর যথাযথ পরিসংখ্যান না হওয়ায় জাতীয়করণযোগ্য আরও ৪ হাজার ১৫৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হতে বঞ্চিত হয়।

জাতীয়করণকালীন পাঠদানের অনুমতি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ছাত্র-ছাত্রীরাও উপবৃত্তি টিফিন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ জন্য জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে বারবার মাঠে নেমেছেন তারা।

সংগঠনের এক বিবৃতি বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে জাতির পিতার মতো আরও একটি ইতিহাস রচনা করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, জাতীয়করণের সমস্ত যোগ্যতা থাকার পরও কিছুসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কর্মরত শিক্ষকগণ জাতীয়করণ হতে বঞ্চিত হয়।

তৃতীয়ত ধাপের বিদ্যালয়সমূহের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের ২ মের পূর্বে স্থাপিত ও পাঠদানের অনুমতির জন্য আবেদনকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় উল্লিখিত তৃতীয় ধাপের বিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা কর্মস্থলে না থাকায়, সকল শর্ত পূরণ করার পরও বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

শিক্ষকরা বলছেন, জাতীয়করণকালীন পাঠদানের অনুমতি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করায় আমরা বেতন-ভাতা সুবিধা ও ছাত্র-ছাত্রী উপবৃত্তি, টিফিন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের দাবিকৃত বিদ্যালয়সমূহ ধারাবাহিকভাবে ২০০৯-২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে।

এছাড়া ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের তালিকার বাইরে পার্বত্য অঞ্চলের ইউএনডিপি পরিচালিত ২১০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বিবেচনায় জাতীয়করণ করেন।

তারা বলেন, আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। কোনো প্রকার সহিংসতা বা কারো প্ররোচনায় নয়। আমরা বছরের পর বছর বিনা বেতনে বিদ্যালয়সমূহে কর্মরত থেকে এদেশের শিশুদের পাঠদান করিয়ে আসছি। আমাদের অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে চাকরির বয়সমীমা হারিয়েছে। বিদ্যালয়সমূহে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকের অন্যত্র চাকরির আবেদনের বয়স সীমা নেই। এতে আমরা সংসারজীবনে চরম সংকটের মুখে পড়ছি।

তারা আরও বলেন, এ অবস্থা থেকে কেবল আমরা মানবতার জননী, উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি ২৬,১৯৩টি বিদ্যালয়ের ১,০৪,৭৭২ জন শিক্ষকের মুখে অন্য তুলে দেয়, যিনি ৭ লাখ রহিঙ্গাকে বুকে টেনে নিয়ে মায়ের মমতায় আশ্রয় দেয়, যিনি নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন, তার মাধ্যমেই উত্তরণ পেতে পারি।

রহিমা বেগম নামের একজন শিক্ষক বলেন, ১৬-১৭ দিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে আন্দোলন করছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি। নিজেদের খুব সস্তা আর অসহায় মনে হয়।

আলতাফ হোসেন নামের একজন শিক্ষক বলেন, আমাদের ভাগ্যই খারাপ। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকেও সরকার আর্থিক সুবিধার আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছে, শুধু আমাদের কপালই খুলছে না।

রঞ্জিত সরকার নামের একজন শিক্ষক বলেন, তিনদিন ধরে অনশনে আছি, তার আগে ১৫ দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু কেউ একটু খোঁজও নিলো না। সুরভী আক্তার নামের একজন শিক্ষক বলেন, দীর্ঘদিন বেতন ছাড়া শিক্ষকতা করে আসছি।

জাতীয়করণের দাবিতে বারবার আন্দোলনে নেমেছি। কিন্তু অপেক্ষা শুধু দীর্ঘই হয়েছে। এখন সন্তান-সংসার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, সন্তান-সংসার নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিন।

শিক্ষক মমিনুল ইসলাম বলেন, কতোবার যে প্রেসক্লাবের সামনে এসে আন্দোলন করেছি তার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু সরকারের নীতি নির্ধারকরা নির্বিকার। এখন অনশন করছি, তবুও কাউকে পাশে পাচ্ছি না।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. মামুনুর রশিদ খোকন বলেন, দাবি আদায়ের জন্য গত ১৬ জুন থেকে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছি। এরপর প্রতীকী অনশন এবং গত রোববার থেকে অনশন শুরু করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আগামীকাল (আজ বুধবার) থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচিতে যাচ্ছি।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর