রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ২:২০ এএম


কারিকুলাম পরিবর্তন ও মানসম্মত অধ্যায়ন প্রসঙ্গে

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ০৮:৪৬, ৯ জুলাই ২০১৯  

একটি দেশ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করে থাকে, কারণ শিক্ষা হচ্ছে একটি সর্বজনীন বিষয়; যা ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এবং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নতুন সময়, তথ্যপ্রযুক্তির নব উদ্ভাবন, বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় যাত্রা—এ সবকিছুকে প্রাধান্য দিতে হবে কারিকুলামে। আধুনিক বিশ্বের পাঠ্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশে নতুন শিক্ষা কার্যক্রম। সমাজ ও যুগের চাহিদা এবং সমকালীন জ্ঞানের যে বিস্তার ঘটেছে, তার দিকে লক্ষ রেখে আমাদের দেশের কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে অনেকেই গবেষণা করছেন, উদ্দেশ্য একটিই—সার্বিক পরিবর্তন নিয়ে আসা। শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন, বিয়োজন ও নিত্যনতুন প্রদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষাকে অর্থবহ করা প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হতে হবে যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটিয়ে দক্ষ, প্রয়োজনীয়, দেশ ও মানবকল্যাণমুখী মানবসম্পদে পরিণত করা। বর্তমান কারিকুলাম কতটা কার্যকরী, জাতীয় পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধারা বিবেচনা করে কারিকুলামে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। দেশীয় পর্যায়ে আর্থসামাজিক পরিবর্তন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, এসডিজি-৪ অর্জন, উন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হওয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান, শিক্ষানীতি ইত্যাদি বিষয়কে বিবেচনায় এনে আমাদের কারিকুলামে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আর বৈশ্বিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি সুসংবাদ।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের কাজে যোগদানের তিন বছরের মধ্যে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ও বিএড কোর্স সম্পন্ন করার কথা। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য সরাসরি প্রশিক্ষণকাল রয়েছে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচটি এইচএসটিটিআই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য একটি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও দূরশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতি বছর বিএড ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া শতাধিক বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও শিক্ষকতা পেশা হিসেবে কেমন এবং এ যুগে শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণের ধরনে কী হবে, তার কোনো যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা প্রচলিত বিএড প্রশিক্ষণে সেভাবে নেই। প্রতি বছর নতুন নতুন ধারণা নিয়ে শিশুরা ক্লাসে আসে। ভুলে গেলে চলবে না তাদের সব ভাবনা, ধারণা ইউনিক হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ফর্মুলায় তাদের ফেলা সম্ভব নয় এবং তাদের সমস্যাগুলো ছকে বেঁধে সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। একজন শিক্ষককে প্রত্যেক পরিস্থিতি ধারণ করার তাত্ক্ষণিক সহজাত ক্ষমতা থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে শ্রেণীর ৪০ জন শিক্ষার্থী একইভাবে হ্যাঁ বা না বলবে না।

প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কারিকুলাম বা পাঠক্রমে আসছে বড় পরিবর্তন। ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এ পরিবর্তন আনা হবে। পাঠক্রম পরিবর্তিত হলেও বিষয় বা বইয়ের সংখ্যা কমানো হবে না। মূলত কারিকুলামের চাহিদা অনুযায়ীই নিরূপণ করা হবে বইয়ের সংখ্যা। তবে প্রতিটি বিষয়ের সিলেবাসের (পাঠসূচি) ব্যাপ্তি কমিয়ে আনা হবে। নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী বিষয় সংখ্যা কমানোর সম্ভাবনা খুবই কম। পাঠক্রম পরিবর্তনের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম বিভাগ এবং মাদ্রাসা বোর্ড আলাদাভাবে কাজ করছে। জানা যায়, ২০২১ সালে প্রথম, দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী বই পাবে। ২০২২ সালে পাবে তৃতীয়, চতুর্থ, সপ্তম ও একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। ২০২৩ সালে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর পরীক্ষার্থীরা নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী বই পাবে। ওই বছর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা হবে নতুন পাঠক্রম অনুযায়ী। ২০২৪ সালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাও হবে নতুন পাঠক্রমে। ২০২১ সাল থেকে মাদ্রাসার পাঠক্রমে পরিবর্তন আসছে।

২০১২ সালে সব পাঠক্রমেই সর্বশেষ পরিবর্তন এনেছিল এনসিটিবি। পাঁচ বছর পরপর পাঠক্রমে পরিবর্তন আনার নিয়ম থাকলেও এবার পরিবর্তন আসছে নয় বছর পর। একই সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দুই বছর মেয়াদি করার বিষয়েও কাজ চলছে। বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর আগে সরকারি স্কুলে একটি শ্রেণী আছে। কিন্তু আগামী দিনগুলোয় প্রথম শ্রেণীর আগে সরকারি স্কুলেও দুটি শ্রেণী পড়তে হবে শিশুদের। আর প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষা না রেখে ধারাবাহিক মূল্যায়নের লক্ষ্যেও কাজ চলছে। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কাজ হবে কয়েকটি ধাপে। প্রথম ধাপে শিক্ষাক্রমের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা বের করা, দ্বিতীয় ধাপে বিশেষজ্ঞরা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা খুঁজে বের করবেন। এটি নাকি চলছে বর্তমানে। এরপর একাধিক কর্মশালা ও গবেষণা শেষে নতুন পাঠক্রম তৈরি করা হবে। বর্তমানে এনসিটিবির পাঠক্রম অনুযায়ী প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তিনটি করে পাঠ্যবই এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ছয়টি করে পাঠ্যবই পড়তে হয়। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ১৩টি পাঠ্যবই পড়তে হয়। নবম-দশম শ্রেণীতে ২৭টি এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে ৩৯টি পাঠ্যবই আছে। তবে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ আলাদা থাকায় নবম, দশম ও একাদশ শ্রেণীতে সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ের বই পড়তে হয় না। মাদ্রাসার ধর্মীয় চারটি বিষয় কোরআন, আকাইদ ও ফিকাহ, হাদিস এবং আরবির পাঠক্রমেই মূলত পরিবর্তন আসছে। কোরআনের বিভিন্ন সূরা একবারে নাজিল হয়নি, ধাপে ধাপে নাজিল হয়েছে। কোনো সূরা দীর্ঘ সময় নিয়ে নাজিল হয়েছে। এসব সূরা নির্দিষ্ট বয়সের জন্য নির্ধারিত নয়। পুরো সূরা একটি শ্রেণীর জন্য পাঠ্য করায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ পড়ে। তাই পাঠক্রম পরিবর্তনে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হবে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এখন আর কোনো কিছুতেই পিছিয়ে নেই। তারা সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের চেয়ে চারটি বিষয় বেশি পড়ছে। মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। নতুন পাঠক্রমে তাদের আরো যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মাদ্রাসার মূল শিক্ষা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

প্রতি পাঁচ বছর পর কারিকুলাম পরিবর্তন করার কথা কিন্তু আমরা করছি নয় বছর পরে। এতে খুব একটি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারিকুলাম একটি ব্যাপক ও বিস্তৃত বিষয়। এর ব্যাপ্তি এমন হতে হবে, যাতে ১০ বছর, এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে, সেগুলোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানোর জন্য, জানানোর জন্য পাঠক্রমে শিক্ষাদানের স্বাধীনতা থাকতে হবে, স্থিতিস্থাপকতা থাকতে হবে। আমাদের কারিকুলাম তৈরি করার পর তার সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, প্রশিক্ষক, শিক্ষার্থী কারোরই কোনো পরিচিতি বা যোগাযোগ থাকে না। তাদের যোগাযোগ থাকে শুধু পাঠক্রমে অর্থাৎ সিলেবাস নিয়ে। বিষয়টিতে এনসিটিবির লক্ষ রাখতে হবে। এনসিটিবি ও প্রাইভেট পাবলিশার্সরাও এ সুযোগ নিয়ে থাকে। তারা প্রতি বছর প্রশ্নের ধরনে একটু একুট করে ভিন্নতা নিয়ে আসে। এটি খুব সৎ উদ্দেশ্যে যে করা হয় তা নয়। এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণ জড়িত। কারিকুলামে বিষয়টি এমনভাবে বলতে হবে এবং প্রচার করতে হবে, যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা বিভ্রান্ত না হন যে একটি প্রশ্নের ধরন পরিবর্তন করলেই বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। কারিকুলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পৌঁছতে হবে সিলেবাসের মাধ্যমে। সেখানে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা, প্রান্তিক যোগ্যতা, দক্ষতা অর্জন করার জন্য শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হতে পারে অর্থাৎ বিভিন্নভাবে প্রশ্ন তৈরি করে শিক্ষার্থীদের যাচাই করা যেতে পারে যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বা টপিকে কী কী যোগ্যতা শিক্ষার্থীদের অর্জন করার কথা, সেগুলো তারা করতে পেরেছে কিনা। কিন্তু আমরা দেখছি প্রশ্নে একটু পরিবর্তন হলেই সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে যায়।

নতুন কারিকুলামে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হবে, সেগুলো হচ্ছে ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০৩০ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-৪) লক্ষ্য অর্জন, উন্নত দেশে পরিণত হতে রূপকল্প-২০৪১ অর্জন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কারিকুলামের সংগতি রাখা। আজ যে শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণীতে পড়ছে, সে হয়তো ১৫-১৬ বছর পরে চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে। তাই তখন চাকরির বাজারে কী ধরনের চাহিদা থাকবে, তা বিবেচনায় নিয়ে পাঠক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। বেসিক ফাউন্ডেশন ঠিক রেখে বইয়ের বোঝা যাতে কমানো যায়, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। কারিকুলামের চাহিদা অনুযায়ীই বইয়ের সংখ্যা নিরূপণ হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কিছু যেন না থাকে পাঠ্যবইয়ে, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ বা এমন কোনো আলোচনার সূত্র জিহাদের অপব্যাখ্যা না রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে তরুণ সমাজের অবদান, নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি বন্ধ করা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টির বিষয়গুলোয় জোর দেয়া উচিত।

সমাজ ব্যবস্থাকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে জীবনমুখী, কল্যাণমুখী ও কর্মমুখী। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থা। শুধু পরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থাই দেশ ও বিদেশের চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারে। একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে দক্ষ জনশক্তি। কাজেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

 

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা গবেষক
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর