বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:৩৩ এএম


কান্নায় বিদায় নিলেন এসপি হারুন

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০০:৩৩, ৮ নভেম্বর ২০১৯  

বিদায় বেলায় কাঁদলেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, যিনি ১১ মাসের দায়িত্বে সংবাদের শিরোনামে এসেছেন বার বার, শহরের রাস্তায় ‘বাংলার সিংহাম’ অভিধায় তার নামে টাঙানো হয়েছে ব্যানার।

জেলা পুলিশের দেওয়া বিদায় সংবর্ধনায় তিনি বললেন, “আমি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করেছি, আইনের স্বার্থে কাজ করেছি। এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, এটা একটা ষড়যন্ত্র। তদন্ত হলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।” মাসদাইর পুলিশ লাইন্সে বৃহস্পতিবার এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সময় আবেগ আক্রান্ত হয়ে পড়েন এই পুলিশ কর্মকর্তা। এক পর্যায়ে তাকে কাঁদতেও দেখা যায়।

হারুন বলেন, পুলিশের ভেতরে তিনি ‘চেইঞ্জ’ আনতে চেয়েছিলেন। আর তাতে সফল হয়েছেন বলেই তার বিশ্বাস। “পুলিশ এখন আগের থেকে অনেক বেশি সাহসী। তারা এখন বুঝতে শিখেছে কীভাবে মোকাবেলা করতে হয়। অপরাধ ও অপরাধী দমনে কীভাবে কাজ করতে হয়।” তিনি বলেন, “আমি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড় দেব না আগেই বলেছিলাম। আমি যেখানেই যাই, যেখানেই থাকি, এদের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে।”

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন গত জাতীয় নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পান। তার মাস তিনেক আগে তাকে গাজীপুর থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়েছিল।

হারুন এক সময় ঢাকা মহানগর পুলিশে ছিলেন। তখন বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুকের উপর হামলার ঘটনায় আলোচিত হন গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছিল বিএনপি।

নারায়ণগঞ্জে ১১ মাসের দায়িত্বে সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেন হারুন। হকার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ বেশ কিছু পদক্ষেপে তিনি যেমন প্রশংসিত হন, তেমনি নারায়ণগঞ্জের অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে টক্করে গিয়ে তিনি নতুন নতুন আলোচনার জন্ম দেন।

এই প্রেক্ষাপটে কিছুদিন আগে শহরের বিভিন্ন সড়কে এসপি হারুনের ছবিসহ ব্যানার দেখা যায়, যেখানে তাকে বলিউডি সিনেমার নায়কের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয় ‘বাংলার সিংহাম’। এ সপ্তাহের শুরুতে এক ঘটনায় হঠাৎ করেই এসপি হারুনের বদলির আদেশ আসে। নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে তাকে পাঠানো হয় পুলিশ সদর দপ্তরে।

পারটেক্স গ্রুপের কর্ণধার এম এ হাশেমের ছেলে আমবার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজের স্ত্রী ও সন্তানকে গত শুক্রবার ভোররাতে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আটকের বিষয়ে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন হারুন। তিনি দাবি করেছিলেন, ওই গাড়ি থেকে ইয়াবা, মদ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ আসে, চাঁদা না পেয়ে শওকত আজিজের স্ত্রী-সন্তানকে ঢাকার গুলশানের বাসা থেকে ধরে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে গিয়েছিলেন এসপি হারুন। ইন্টারনেটে এর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে রোববার হারুনের বদলির আদেশ আসে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হবে বলেও ইতোমধ্যে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বদলির আদেশ পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন হারুন। পরে পুলিশ লাইন্সে বিদায় সংবর্ধনায় তিনি বলেন, “অপরাধী যখন ফেঁসে যায়, মামলা হয়, গ্রেপ্তার হয়, অথবা তদবির করে ব্যর্থ হয়, তখন তারা একটিই কথা বলে, ‘পুলিশ আমার কাছ থেকে টাকা চেয়েছে।’ সম্ভবত পুলিশের ওপর দোষ চাপানোর এটাই সহজ কাজ।”

হাশেমের ছেলের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমার কোনো সহকর্মীর দিকে কেউ পিস্তল তাক করবে সেটা তো হতে পারে না। তাই ওই ব্যক্তি কত বড় সম্পদশালী বা শক্তিশালী সেটা দেখিনি। “বিধি মোতাবেক চ্যালেঞ্জ করে তার গাড়ি আটকে মাদক ও গুলি পেয়েছি। সে অস্ত্রসহ পালিয়েছে। আইন মোতাবেক মামলা হয়েছে, পুলিশ রেইড দিয়েছে। কিন্তু বলা হয়েছে, টাকা দাবি করেছি।”

ঢাকার গুলশানে শওকত আজিজের বাসায় অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, “গুলশানের উপ-কমিশনারকে এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়েছিল। শওকত আজিজের ছেলে বলেছিল, অস্ত্র সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করবে। তাই তাকে আনা হচ্ছিল।

“তখন তার মা বলল, তার ছেলে বিদেশে লেখাপড়া করে এসেছে, তাকে একা ছাড়বে না। তিনি নিজেও আসতে চান। আমরা তাকেও সম্মানের সাথে নিয়ে এসেছি। “পরদিন পারটেক্স গ্রুপের কর্ণধার হাশেম সাহেব আসলেন। তিনি নিজেও স্বীকার করলেন রাসেলের কাছে অস্ত্র থাকা নিরাপদ নয়। তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন বলে মুচলেকা দিয়ে তার ছেলের বউ ও নাতিকে নিয়ে যান। এগুলো আপনারা সবই জানেন, তবুও আমি বললাম।”

এর আগে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহাকে আটক করে ৬৭ মামলায় আদালতে হাজিরা দেওয়ার মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেওয়ার কথাও অনুষ্ঠানে বলেন হারুন। তিনি বলেন, “আনিসুর রহমান সিনহা কিংবা পারটেক্স গ্রুপের কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ তুলেছেন ওই পক্ষটি, যারা আমার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। আমার কারণে যারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমি দস্যুতা করতে পারেনি।

“সেই তারাই অভিযোগ দিয়েছে। এসব কিছু তদন্ত হলেই বের হয়ে আসবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। ”নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে জেলার সকল সংসদ সদস্য ও মেয়রের সহযোগিতা পাওয়ার কথা জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “তারা কেউ কখনো বাধা দেয়নি। তদবির করেনি। তাই আমি অপরাধীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পেরেছি।”

এর আগে বিএনপি আমলে বরখাস্ত হওয়ার কথা স্মরণ করে হারুন বলেন, “জামায়াত-শিবির আমার চাকরি খেয়ে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী আমাকে আবার চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

“সারাজীবন আমি স্বাধীনতার পক্ষে ছিলাম। ভবিষ্যতেও থাকব। আজীবন স্বাধীনতাবিরোধী ওই রাজাকার, আল বদরদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে যাব।” অন্যদের মধ্যে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, র‌্যাব-১১ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী শামসের উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মামুন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর