বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৫:৩১ পিএম


কাজের দীর্ঘসূত্রিতাই শিক্ষাক্ষেত্রে স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্তরায়!

মো. শরীফ উদ্দিন

প্রকাশিত: ১০:৩৯, ৭ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৪১, ৭ আগস্ট ২০২০

শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনকারী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একটি স্বপ্ন ছিল বাাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি করে সরকারি হাইস্কুল ও একটি করে সরকারি কলেজ থাকবে। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রীরা সেখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধায় লেখাপড়া শিখবে এবং রাজধানী ঢাকাসহ প্রতিটি বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে গ্রাম বাংলার শিক্ষার্থীরা একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এ সরকার দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৪৫ টি কলেজ সরকারিকরণের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করে। এরপর শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তারের লক্ষ্যে ২০১৬ সাল থেকে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ ও একটি করে হাইস্কুল সরকারিকরণের কাজ শুরু হয়।

প্রথমদিকে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের তালিকাভুক্ত করে নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ৩০ জুন ১৯৯ টি কলেজের উপর নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকারিকরণের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এ তালিকায় যোগ হয়। বর্তমানে এ তালিকায় রয়েছে ৩০২ টি কলেজ। কিন্তু কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর ধরে ঝুলে আছে সরকারিকরণের কাজ। একই কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের নামে একাধিকবার বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শনের কারণে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হারে।

নিষেধাজ্ঞা জারির পর কলেজগুলোকে আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিদর্শনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিদের যাবতীয় মূল কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। এর সাথে কলেজের যাবতীয় হিসাব নিকাশ শেষ করেন তারা। এক পর্যায়ে কলেজগুলোর দানপত্র দলিল (Deed Of Gift) হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন হয়।

সবশেষে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট ২৭১ টি কলেজকে একসাথে সরকারিকরণের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপনে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট থেকে সরকারিকরণ কার্যকর হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর আরো কিছু কলেজ সরকারিকরণের আওতায় এনে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শুরু হয় পদ সৃজনের কাজ। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে পদ সৃজনের কাজ সম্পন্ন করার জন্য তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এ বছরেই অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর সমন্বিত পদ সৃজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এরপর চলে যায় আরো প্রায় অর্ধ বছর। অবশেষে ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ ২০টি কলেজেকে পদ সৃজনের জন্য নির্ধারিত ক,খ এবং গ ছক অনুসারে প্রস্তাব পাঠানোর জন্য মাউশি থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল বাকি কলেজগুলোকে তিনটি তালিকায় বিভক্ত করে পর্যায়ক্রমে পদ সৃজনের প্রস্তাব পাঠানোর জন্য বলা হয়।

এ কার্যক্রম শেষ করার পর শুরু হয় মূল কাগজপত্র আবার দ্বিতীয়বারের মতো মাউশিতে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ! মোটামুটি বেশিরভাগ কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিদের মূল কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে সেখানেও আবার তৃতীয়বারের মতো শুরু হয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করলেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে আটকে আছে বেশিরভাগ কলেজের কাজ।

মূলত একই কাগজপত্র বিভিন্ন জায়গায় তিনবার যাচাই-বাছাই করার কারণে সময় যেমন বেশি লেগেছে তেমনি পরিদর্শনের নামে কিছু অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে যেয়ে মূল কাজের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারিদের কাগজপত্র মাউশিতে যাচাই-বাছাই করেই এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে মাউশিতেই আবার ছয়েক দফা যাচাই-বাছাই করার কী দরকার? প্রথমবার ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে থাকলে নতুন করে যাচাই-বাছাই করা অবান্তর নয় কি? তথ্য প্রযুক্তির অবাদ সাগরে অবগাহন করছে বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবী। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে বদ্ধপরিকর। আমি মনে করি, ডিজিটাল এই যুগে একটি কাজ এমনভাবে করা উচিত যাতে পরবর্তীতে সে কাজে আর কখনো হাত দিতে না হয়। তাহলে সময় যেমন কমে আসবে তেমনি কর্মকর্তাদের কাজের পরিধিও কমে আসবে। তখন যে কাগজপত্রগুলো মাউশিতে কখনো দেখানো হয়নি শুধু সেগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করলেই হতো। যাচাই-বাছাইয়ে সময়ের পরিধি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতো।

একই কাজ বারবার করে কাজকে দীর্ঘায়িত করাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারিকরণের কাজে হাত দিয়েছিলেন তা এখনো অধরাই থেকে গেছে। ছাত্রছাত্রীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। অনেক ছাত্রছাত্রী সরকারি কলেজ সাইনবোর্ড লেখা দেখে ভর্তি হয়ে বেসরকারি আমলের টাকা পরিশোধ করতে যেয়ে যেমন বিপাকে পড়ছে তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা থাকায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ২০১৬ সালে এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে অনেক শিক্ষকের চাকরি শেষ হয়ে গেছে! অনেকেরই আবার শেষ হওয়ার পথে! অনেকেই আবার চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের অনুকূলে দানপত্র দলিল (Deed Of Gift) সম্পন্ন হওয়ার কারণে কলেজ থেকে শিক্ষক-কর্মচারিগণ আর্থিক যে সুযোগ-সুবিধা পেতেন তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

এসব জটিলতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলে জটিল বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের দ্বারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোনার বাংলা গঠনের যে মহান স্বপ্ন দেখেন তা চিরকাল অসম্পূর্ণই থেকে যাবে! তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণের মনে স্বস্তি আনয়নে সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর