মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল, ২০২০ ১৬:০০ পিএম


মুজিববর্ষে জাতীয়করণ উপহার চায় বেসরকারি শিক্ষকগণ

প্রদীপ কুমার দেবনাথ

প্রকাশিত: ১২:১৫, ৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১২:২৪, ৪ মার্চ ২০২০

একটি দেশের দর্পণ হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা।  অনুন্নত, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশসমূহের দিকে তাকালে দেখা যাবে দেশগঠনের পাশাপাশি প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হিসেবে শিক্ষা বিভাগকে বেছে নেয়। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশ নেই যেখানে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়না। কোন দেশ কতটা আধুনিক ও বাস্তবমুখী তা তার শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষায় সরকারি প্রদক্ষেপ থেকেই বুঝা যায়। পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ সভ্য, আধুনিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে দক্ষ জনসমষ্টি গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর। তাই তারা শিক্ষাখাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ এবং আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের বিশুদ্ধ গবেষণার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করে থাকে। আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে বিবেচনা করা হয় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কথা বাদই দিলাম উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায় তা। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে এ চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এ দেশগুলোও উন্নয়নের উল্লেখিত পর্যায়ে পরে।
আমাদের দেশেও শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে সরকার ও সংশ্লিষ্টজন। বেশকিছু পরিবর্তন, পরিমার্জন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু, বৃত্তি, উপবৃত্তি সম্প্রসারণ সহ অনেকগুলো কাজ সরকার ইতিমধ্যে করেছে এবং করছে। তাছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো।
কিন্তু এত কিছুর পরেও গতি ফেরেনি শিক্ষায়, আধুনিক হয়নি শিক্ষাব্যবস্থা, দুরাবস্থা, অচলঅবস্থার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি শিক্ষা কার্যক্রম।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলেই এর মূল কারণ সম্পর্কে অবগত। সবাই জানেন, শিক্ষার বাস্তবিক প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে যার ভূমিকা অগ্রে তারা হচ্ছেন শিক্ষক। এখানে উল্লেখ্য, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তরে বহু আগে থেকেই সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাই নিয়োজিত।
কথা হচ্ছে - উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী এই শিক্ষকদের জীবন যাত্রা, পারিবারিক স্টেটস, সামাজিক অবস্থান অনেক উপরে থাকার কথা। কারণ, শিক্ষকতা পেশাটির মধ্যেই সম্মানের বিষয়টি নিহিত থাকার কথা। কিন্তু, অনেক রক্ত ও ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এই দেশের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ও অতি আদরের বাংলাদেশের শিক্ষকগণের সম্মান ও মর্যাদা আজ পরিষ্কার প্রহসনে পরিণত। জাতিগঠনে আজ যারা ভুমিকা রাখার কথা তারা অর্থাভাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এসব মৌলিক অধিকার থেকে পরিষ্কার বঞ্চিত।
বর্তমান শিক্ষকদের জীবনধারা ও প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত থাকলে আমি নিশ্চিত যেকোনো মানুষ বিস্মিত হবে। একজন শ্রমিক, রিকসা চালক, পিয়ন বা এসব ক্যাটাগরির একজন মানুষ যদি ৩০ দিন কাজ করে ও ৬০০ টাকা দৈনিক উপার্জন করে তাহলে তার বেতন দাঁড়ায় ১৮০০০ টাকা। আর এই টাকাতেও তারমতো সাধারণ ব্যক্তিদের ক্লায়কেসে জীবন কাটে। সেখানে একজন মাধ্যমিক শিক্ষক ১২৫০০ টাকা নিয়ে কিভাবে তার পরিবার ও সমাজে টিকে থেকে সম্মানের সাথে চলবে?
কোনমতেই সম্ভব নয়। তাই সারাদিন বিদ্যালয়ে বসেও তার চোখের সামনে, মনে ও মাথায় কাজ করবে কিভাবে পরিবার চালাবো? সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবো, বন্ধুত্ব রক্ষা করবো - এসব। প্রায়ই দেখা যায় একজন শিক্ষকের উপর ৪-১০ সদস্য বিশিষ্ট পরিবার নির্ভর করে। এখানে আরও স্পষ্ট করে বলা দরকার অনেক শিক্ষক আছেন যাদের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা ইত্যাদি কিছুই নেই। তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। পরিবারকে ভরণপোষণের জন্য তারা প্রতিমাসেই মহাজনদের নিকট থেকে চড়া সুদে ঋণ আনে এবং এবং তা বাড়তে বাড়তে তার নাগালের বাইরে থাকে। সেই শিক্ষকগণের অবস্থা কি - একবার ভাবুন। আর অন্যরা বেতনের টাকায় চলতে না পেরে জমি - জমা, ঘর - বাড়ি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, ঔষধ পত্র সহ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে।
বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষকদের এ করুণ অবস্থা আজ তাদের পেশাগত সম্মানকে অনেক নিচুতে নিয়ে যাচ্ছে। একজন অভাব পিড়িত, রোগাক্রান্ত ও মনভাঙা শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে কখনোই তার শতভাগ শিক্ষা দিতে সক্ষম নন। বর্তমান সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাণবন্ত ক্লাসে প্রাণবন্ত শিক্ষক অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তার হাত ধরেই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষিত, মার্জিত, উন্নত ও আদর্শ চরিত্রের ভবিষ্যৎ কান্ডারী হবে। কিন্তু যাদের হাতে দেশের পরবর্তী ভবিষ্যৎ আদর্শ নাগরিক গড়ে উঠার কথা তাদের পেটে তিন বেলা সঠিকভাবে খাবার জোটে কিনা, তারা অসুখ ভালো হবার ঔষধ পায় কিনা, তাদের সন্তানেরা লেখাপড়া করতে পারে কিনা এসব দেখার ও এ বিষয়ের সুষ্ঠ সমাধান এবং শিক্ষকের সঠিক আর্থিক সচ্ছলতা আছে কিনা সেটা জানা এবং এ বিষয়ে শতভাগ সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।

জাতি গঠনের কারিগর, ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ে তুলার এই মহান পথ প্রদর্শকদের অনেকের জমিজমা, ঘরবাড়ি কিছুই নেই। তারা ভুগে আরও অধিক মানসিক যন্ত্রণায়। সব সময় সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিদ্যালয় বা কলেজে সঠিক পাঠদান তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবার নিঃস্ব এই শিক্ষক/কর্মচারীগণ চাকরি শেষ করে অবসরে গেলে হাগার বিড়ম্বনার শিকার হউন। অবসর ভাতা আর কল্যানট্রাস্টের গ্যাড়াকলে পিষ্ট হতে হতে অনেকে শূন্য হাতে সন্তানদের হাহাকারের মহাসমুদ্রে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। আবার কেউ কেউ আংশিক জীবদ্দশায় পেলেও বাকীটার আশায় জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়।

এভাবেই বঞ্চিত হচ্ছেন যুগ যুগ ধরে জাতির সম্মানিত এ বিবেকগণ। কারও ভ্রূক্ষেপ নেই এ দিকে। সবাই জানলেও বুঝলেও সুকৌশলে এড়িয়ে যান, উপেক্ষা করেন শিক্ষকদের। আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অবশ্যই এর বহুগুণ সম্মান ও মর্যাদার আসনে থাকতো আমাদের এ শিক্ষক সমাজ।            

বুঝা উচিত উপেক্ষা, অবহেলা আর শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়নের অভাবে শিক্ষার এ বেহাল অবস্থা, অন্তঃসর শূন্য, মেধাহীন সার্টিফিকেট ধারীরা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে পিছিয়ে দিতে পারে বহুগুণ।

সময় এসেছে সবকিছু সঠিকভাবে সচল করার, গতি বাড়ানোর। শিক্ষাক্ষেত্রে এ কাজটি করা অনেক সহজ। এখানে জটিল, কঠিন ও ব্যয়বহুল কিছু করতে হবে না।

সকল সমস্যার সহজ সমীকরণ ও সমাধান জাতীয়করণ। জাতীয়করণ করলেই শিক্ষকগণ দুশ্চিন্তা মুক্ত হবে। দুশ্চিন্তামুক্ত শিক্ষকগণ তাদের অর্জিত জ্ঞানের শতভাগ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারি।

জাতীয়করণ করলে সরকারের কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে এমন কিন্তু নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমবেশি ফান্ড আছে, শিক্ষার্থী বেতন, আদার চার্জ ইত্যাদি থেকে প্রচুর অর্থ আয় হয়। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে জাতীয়করণ করলে সরকারের নামেমাত্র বরাদ্দ লাগবে। শুধু সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে জাতীয়করণ ও এদেশের শিক্ষাকে শতগুণ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিশ্বের সাথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, সুশিক্ষায় সুনাগরিক তৈরি করতে ও আদর্শ ভবিষ্যৎ গঠনে জাতীয়করণ উজ্জীবিত করবে শিক্ষকদের। জাতীয়করণের সোনালি পরশে মনপ্রাণ দিয়ে শিক্ষকগণ তৈরি করবে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গুনে, আদর্শ-নৈতিকতায় পরিপূর্ণ বহির্বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বেসরকারি শিক্ষা বিশাল সমূদ্রে ভাসমান একটি গতিহীন জাহাজ, দিকহীন, উদ্দেশ্যহীন, জ্যোতিহীন বিবর্ণ পুরনো বটগাছ। যা অভিভাবকহীন এতিম শিশুর হাহাকারের ক্ষেত্র।                   

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বেসরকারি শিক্ষক/কর্মচারীগণ আশায় বুক বেঁধে আছে - মুজিববর্ষেই তাদেরকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধুর কণ্যা গণতন্ত্র ও শান্তির বিশ্ব আইকন, গনতন্ত্রের মানসকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের স্পন্দন, বাঙ্গালি জাতির সত্তা, বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন শিক্ষা খাতকে গতিশীল, বিশ্বমানের করতে মুজিব শতবর্ষেই সকল শিক্ষক/কর্মচারীদের চাকরি সরকারীকরণের ঘোষণা দিয়ে প্রাণ ফিরাবেন সোয়া পাঁচ লক্ষ শিক্ষক / কর্মচারীদের। জাতীয়করণের মাধ্যমেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তরে জাতির জনকের জন্মশত বার্ষিকী অমর হয়ে থাকবে সোয়া পাঁচ লক্ষ শিক্ষক পরিবারে।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে মুজিববর্ষে জাতীয়করণ উপহার চায় বেসরকারি শিক্ষকসমাজ।                                                                        
                        
লেখক:  শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এডুকেশন বাংলা/এজেড

           

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর