মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল, ২০২০ ১৫:৪৪ পিএম


কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সমস্যা ও করণীয়

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

প্রকাশিত: ০৮:৩২, ১১ মার্চ ২০২০  

সম্প্রতি সরকারি বিএম কলেজ নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে উঠে এসেছে কলেজের নানাবিধ সমস্যার কথা। রিপোর্টে বলা হয়, ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষকের মোট ১৯৮টি পদের বিপরীতে ১৮০ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। কলেজে মোট বিভাগের সংখ্যা ৪৪টি এবং অনার্স ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ হাজার। ৪৪টি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছাড়াও রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক কোর্স। একটি বিভাগে গড়ে চার থেকে পাঁচজনের বেশি শিক্ষক হবে না। প্রতিটি বিভাগে ১০ জন করে হলেও চার শর বেশি শিক্ষকের প্রয়োজন পড়ে; কিন্তু দীর্ঘদিন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে কলেজটিতে। কিভাবে সম্ভব এত কমসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে পাঠদান! এ ছাড়া রয়েছে আবাসিক সমস্যাসহ আরো অনেক সমস্যা। এমন সমস্যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ কলেজে বিদ্যমান। কলেজভেদে রয়েছে পদসংখ্যা। ব্যতিক্রম ঢাকার মধ্যে কিছু কলেজের ক্ষেত্রে। ঢাকার কিছু কলেজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন। কেননা এখানে অ্যাটাসমেন্ট নামে একটি বিষয় রয়েছে। যিনি শিক্ষক তিনি মাউশিতে সংযুক্ত কিন্তু কাজ করছেন ঢাকার কোনো কলেজে। অথচ ঢাকার বাইরের কলেজে শিক্ষক সংকট প্রকট। ঢাকায় শিক্ষকসংকট নেই, কিস্তু শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক সমস্যা সব কলেজে একই রকম। কলেজের ভারসাম্যতা কম বিষয় নয়। দেখা যায় আধা কিলোমিটারের মধ্যে দুটি কলেজ। শিক্ষার্থী কম কিন্তু শিক্ষকের সংখ্যা তো কম হতে পারে না। আমরা যদি শিক্ষা ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে কলেজগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম তাহলে সমস্যা হতো না।

আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটছে সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রসার ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত সুযোগের অভাব, প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সমস্যা এবং বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষা অনেকের ভাষায় সহজ হওয়া এবং সর্বোপরি বিএ এবং এমএ পাস হওয়ার মানসিকতার কারণে কলেজগুলোতে ব্যাপকহারে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। কিন্তু আমরা যদি বেশি করে টেকনিক্যাল শিক্ষা দিতে পারতাম তাহলে সৃষ্ট জনশক্তি দেশে ও দেশের বাইরে কাজে লাগানো যেত। আশার কথা হলো, সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং এসংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর সুফল পেতে আমাদের আরো সময় লাগবে; কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও সমস্যা নিরসনে আমাদের কাজ করে যাওয়া উচিত। আমাদের প্রয়োজনমাফিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আমরা কলেজ থেকে তৈরি করতে পারি। শিক্ষার মানকে বজায় রেখে আমাদের শিক্ষার্থী তৈরি করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কলেজগুলোকে ঢেলে সাজানো এবং এর সংকট মোকাবেলা ও সমস্যাগুলোকে দূর করা।

আমাদের হাজারেরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি কলেজ রয়েছে, যেখানে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদান করা হয়। কলেজে প্রতিটি বিভাগে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এতটাই বেশি, যেখানে কয়েকটি মধ্যম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট যে পরিমাণ শিক্ষার্থী রয়েছে তার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী একটি কলেজে রয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বলি, আমি যেখানকার শিক্ষক সেখানে ২৭টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউট মিলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমানে মাত্র আট হাজার। বিশ্ববিদ্যালয়ে কমসংখ্যক শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য যে সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে কলেজে তার ন্যূনতম সুবিধা, যেমন প্রয়োজনসংখ্যক শিক্ষকও নেই। একটি কথা প্রচলিত আছে, যত বেশি শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি করা যায় তত বেশি লাভ কলেজ কর্তৃপক্ষের। সেমিনার ফিসহ বিভিন্ন নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা যায়। এমন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। একটি কলেজে যতগুলো পদ রয়েছে তা হয়তো পূরণকৃত কিন্তু ততসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে লেখাপড়া করানো যায় না। প্রয়োজন পদ সৃষ্টি করা এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।

সরকারের একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণহারে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। রাজনৈতিক চাপ কিংবা সবাইকে উচ্চশিক্ষার আওতায় আনার জন্য এমনটি করা হতে পারে। কিন্তু এতে করে শিক্ষার মান কোনোভাবেই বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এক কথায় মানসম্মত শিক্ষকের অভাবে কলেজগুলো মানসম্মত শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারছে না। প্র্যাকটিক্যাল কারণও রয়েছে। শিক্ষকদের ইচ্ছা থাকলেও নিজেদের স্বল্পতার কারণে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, অনার্স ও মাস্টার্স বিষয়। আর শিক্ষক যদি থাকেন চার থেকে পাঁচজন তা দিয়ে কিভাবে সম্ভব? তাহলে শিক্ষা কী শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর হয়ে পড়ছে? অতীতের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ করি, যখন কিছুসংখ্যক কলেজে উচ্চশিক্ষা সীমিত ছিল তখন তাদের মান এতটা খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন আমরা মানের তুলনায় সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কত বেশি কলেজে এবং কত বেশিসংখ্যক বিএ এবং এমএ পাস করানো যায় তার প্রতিযোগিতা আমাদের পেয়ে বসেছে।

শিক্ষার মূল কাণ্ডারি প্রথমত মানসম্মত শিক্ষক। মানসম্মত শিক্ষার্থীরও প্রয়োজন রয়েছে। না হলে যত ভালো শিক্ষকই দেওয়া হোক না কেন লাভ নেই। পর্যাপ্ত ভৌত অবকাঠামো ও কারিগরি সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ শিক্ষাকে লক্ষ্যে এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি কোনোভাবেই ভালো ফল দেবে না। বিজ্ঞান যা ভিত্তিরূপে এবং প্রযুক্তি যা প্রয়োগিক, কল্যাণ ও কর্মসংস্থানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ লক্ষ্যে শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কলেজগুলোর শিক্ষার মান উন্নত করতে চাইলে প্রয়োজনমাফিক শিক্ষক নিয়োগ একান্ত প্রয়োজন। ধাপে ধাপে কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা কমানো যেতে পারে। পৃথিবীর কোনো দেশে এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয় না। কলেজগুলোর অবকাঠামো খুবই দুর্বল। পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি করা বড় প্রয়োজন। ভালো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করছে না, সেখানে কলেজগুলো কেন আসন বৃদ্ধি করবে। কলেজগুলোর সীমাবদ্ধতা সব কিছুর জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। নিজেরা নিজেদের মতো করে কোনো কিছু করতে পারে না। কাজেই সরকারের উচিত কলেজগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া। সব কিছু সহজ করা। প্রয়োজনে অনার্স ও মাস্টার্সভুক্ত কলেজগুলোর জন্য আলাদা অধিদপ্তর করা যেতে পারে। কোনোভাবেই বিচার-বিবেচনা ছাড়া গণহারে কলেজগুলোকে অনার্স ও মাস্টার্স খোলা উচিত নয়।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর