সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ১৬:১৪ পিএম


কারিগরি শিক্ষা

কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে নিয়ম ভাঙেন

শরীফুল আলম সুমন

প্রকাশিত: ১১:০৮, ৫ অক্টোবর ২০১৯  

গত বছরের ২৫ নভেম্বর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৫টি পদে ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ২ আগস্ট এসব পদের জন্য লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই চলতি বছরের ৩১ জুলাই অনিবার্য কারণ দেখিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষার আগেই বেশির ভাগ পদের জন্য বড় অঙ্কের লেনদেন করে বসে আছেন বোর্ডের কর্মকর্তারা। একটি পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ, সর্বনিম্ন পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লিখিত পরীক্ষার আগেই প্রার্থীদের অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। কিন্তু লেনদেনের এ তথ্য ফাঁস হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায়। ফলে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয় কারিগরি বোর্ড।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বড় উৎস বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন, মনিটরিং, পরিদর্শন, নতুন বিভাগ-ট্রেড খোলা ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে নিয়ম ভাঙেন। ফলে মনিটরিং তেমন হয় না। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের প্রধান শর্ত হচ্ছে, কোনোভাবেই ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখা, টেকনোলজি সংযোগ, আসনসংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ করা যাবে না। কিন্তু নিজেদের নিয়ম নিজেরাই লঙ্ঘন করছেন কারিগরি বোর্ড কর্মকর্তারা।

২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে গোপালগঞ্জের ‘মকছেদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’ ভুয়া জমির দলিল রেজিস্ট্রি করে অনুমোদন পায়। পরে প্রতিষ্ঠানটি নাম পরিবর্তন করে ‘ঘিওর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’ নামে মানিকগঞ্জে চলে যায়। এ ব্যাপারে কারিগরি বোর্ডের পরিদর্শককে প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপনের নির্দেশ দেন বোর্ড চেয়ারম্যান। কিন্তু তিনি পাঁচ মাস দেরি করে এ ব্যাপারে নথি উপস্থাপন করেন। এ জন্য তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন বোর্ড চেয়ারম্যান।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কারিগরি বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করে এ প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদন পায়। ফলে ভুয়া নথি উপস্থাপনে তাঁরাই গড়িমসি করেছেন।

এ ছাড়া গত বছর রাজশাহী সিটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, পাবনার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুরের আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি, কক্সবাজারের চকরিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নিজস্ব জমি না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন টেকনোলজি খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোরাদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘আবেদনকারী কম থাকায় নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে আমরা শিগগিরই নতুন বিজ্ঞপ্তি দেব। আমরা চাই, সব প্রতিষ্ঠানই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাক। এর পরও শিক্ষার্থীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সময় নতুন কোর্সের অনুমোদন দেওয়া হয়।’

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে অসংখ্য কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করে এখন বোর্ডের বড় কর্মকর্তা। বোর্ডের পদোন্নতি বিধিমালা যথাযথ অনুসরণ না করেই তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন। আবার কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও বোর্ডে অনেক কর্মকর্তা ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। অনেক বোর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজের আত্মীয়-স্বজনের নামে বেসরকারি পলিটেকনিক খুলে দিব্যি ব্যবসা করছেন।

বর্তমানে কারিগরি বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (শর্ট কোর্স) মো. সুলতান হোসেন। তিনি চাকরি শুরু করেছিলেন নিম্নমান সহকারী-কাম-ক্যাশিয়ার পদে। বর্তমানে তিনি তাঁর পদের সঙ্গে ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। এস এম শাহজাহান বর্তমানে উপপরিচালক (কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন)। তিনি চাকরি শুরু করেছিলেন এলডিএ-কাম-টাইপিস্ট পদে। তাঁরা দুজনই বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী, দশম গ্রেড অথবা এর নিচের গ্রেডে চাকরি শুরু করে পঞ্চম গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. এয়াকুব আলীকে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, স্টোর অফিসার মো. আব্দুছ ছালামকে সহকারী সচিব, পার্সোনাল অফিসার মো. আব্দুল কাইউমকে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ (কৃষি) বিভিন্ন ব্যক্তিকে উচ্চপদে নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

আবার অনেকটা ইচ্ছা করেই মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে স্থবির করে রেখেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক গীতা রানী ঘোষ বোর্ডে মূল্যায়ন কর্মকর্তা হিসেবে চতুর্থ গ্রেডের পদে পদায়ন পান। অথচ তাঁকে নবম গ্রেডের পদ সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (গোপনীয়) পদে কাজ করানো হচ্ছে। ফলে মূল্যায়ন করার কেউ নেই। অন্যদিকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ফেরদৌস রহমান নবম গ্রেডের পদ সহকারী বিশেষজ্ঞ হিসেবে পদায়ন পান। কিন্তু চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হওয়ায় তাঁকে পঞ্চম গ্রেডের পদ উপপরিদর্শক (ভোকেশনাল) পদে বসানো হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরি বোর্ডের পরিদর্শকের মূল কাজ পরিদর্শন ও মনিটরিংয়ে গতি বাড়ানো। কিন্তু তিনি এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত। যেসব নিয়োগে সংশ্লিষ্ট জেলার পলিটেকনিক বা টিএসসির অধ্যক্ষদের প্রতিনিধি করলেই চলে, সেখানে তিনি নিজেই চলে যাচ্ছেন।

শুধু কারিগরি বোর্ডই নয়, অধিদপ্তরেও চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের এক তদন্তে ৬১ জন শিক্ষককে ভুয়া এমপিও দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। যাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কাম্য অভিজ্ঞতা না থাকার পরও তাঁদের এমপিও দেওয়া হয়েছে। ওই তদন্তে এক হাজার ৬৩০টি এমপিওভুক্ত কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ১৮ হাজার ৬৫২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে বিপুলসংখ্যক অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

জানা যায়, মেধাবী শিক্ষার্থীরা কারিগরি বোর্ড ও অধিদপ্তরে চাকরিতে না আসতে পারায়ও দুর্নীতি বাড়ছে। মূলত ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে নিয়োগ পাওয়া ক্যাডার কর্মকর্তারাই প্রেষণে বোর্ড ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে আসেন। কিন্তু ক্যাডার পদ খুবই কম থাকায় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বড় বড় পদ দখল করে আছেন।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর