শনিবার ৩০ মে, ২০২০ ১৪:৩৬ পিএম


করোনায় ঘরে থাকা, টেস্ট ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে যেভাবে

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর

প্রকাশিত: ১৭:৫৫, ২০ এপ্রিল ২০২০  

মহামারী কোভিড-১৯ এর তীব্রতা বাংলাদেশের জন্য এখন বাস্তবতা। বিগত কয়েকদিনের পরিসংখ্যান বলছে, এটি সামনের দিনগুলোতে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। বাংলাদেশের সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আপ্রাণ চেষ্টা করছে এবং সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, ভয়াবহ এই সংকট জয় করার জন্য।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্ব করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় দুটো বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। (১) সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা অর্থাৎ ‘ঘরে থাকা’ ও (২) টেস্ট, টেস্ট আর টেস্ট অর্থাৎ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করা। তবে টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসলেও নিজের, পরিবারের এবং সবার শারীরিক নিরাপত্তার জন্য বাইরে যাওয়া যাবে না এবং যেকোনো মূল্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতেই হবে। তাই সব মহল থেকে বলা হচ্ছে ঘরে থাক, ঘরে থাক এবং ঘরে থাক। কারণ, সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে ঘরে থাকা। করোনা ভাইরাসের মহামারীতে আক্রান্ত কয়েকটি দেশ বা অঞ্চলের সফলতার অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে এটাই প্রমাণ করেছে যে, ঘরে থাকাটাই এই সময়ে সংকট উত্তরণের সঠিক পথ।

করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এই মহামারী রুখতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই ঘরে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে এই কয়েকটা দিন যেভাবেই হোক ঘরে থাকতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ঘরে আটকিয়ে রাখার বিষয়টি মোটেই সহজ নয়। হয়তো সরকার শেষ পর্যন্ত কঠোরভাবে তা করতে বাধ্য হবে। সরকার ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলাকে লকডাউনের আওতায় নিয়ে এসেছে। হয়তোবা কিছুদিনের মধ্যে পুরো বাংলাদেশ লকডাউনে চলে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সবাইকে ঘরে থাকতে হবে। ধরে নিলাম এ বিপর্যয় সামাল দিতে আমাদের সর্বমোট ৯০ দিন লাগবে। এই সময় কেউই বাইরে বের হতে পারবে না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে জনগণের দৈনিক প্রয়োজন কিভাবে এসময়ে মেটানো হবে? এই প্রশ্নের জবাব মোটেই সহজ নয়। এর দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হল ব্যক্তির কোন না কোন ভাবে কেনার সামর্থ রয়েছে, আর অন্যটি হচ্ছে একেবারেই কেনার সামর্থ নেই। কিছুটা সময় হয়তো জনগণ যেভাবেই হোক কাটিয়ে দিবে । কিন্তু, এরপর দেখা দিতে পারে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়।

জনগণকে ঘরে আটকিয়ে রাখার কাজটি মোটেই সহজ হবেনা। যা আমরা এখন প্রতিদিনই অবলোকন করছি। যার সামর্থ আছে, সে খাবার কিনতে বের হবে আর যার সামর্থ নেই সে টাকা এবং খাবারের খোঁজে বের হবে। বিপর্যয়ের একপর্যায়ে সৃষ্টি হবে তীব্র সংকট। এই সময় সরকারের সকল সামর্থকে কাজে লাগাতে হবে। অর্থেও যোগানের চাইতে সুষ্ঠু ও পেশাগত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সরকারের একার পক্ষে এ তীব্র সংকট ও মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে না। এসময় সরকারের পাশাপাশি দেশের অন্য সকল প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হবে যেকোনো মূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সুষ্ঠু ও পেশাগত ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ বিষয়টি আপাতত কঠিন মনে হলেও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এটি করা সম্ভব। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোমল-কঠোর হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি অন্য সেক্টরের সবাইকে সমান দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব পালনরত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত, অবস্থান ও সুরক্ষা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

বিগত বছরগুলোতে আর্থিকভাবে সচ্ছল জনগোষ্ঠীর হার বাড়ার কারণে, সমাজের উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তসহ একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের আর্থিক প্রয়োজন যেভাবেই হোক মেটাতে পারবে। এর মধ্যে সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকুরীজীবীরাও রয়েছে। তবে আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে দৈনিক প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটে পড়বে সমাজের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী। তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ। এ সমস্যা সমাধানে বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন- গার্মেন্টস শ্রমিক, মুচি, গৃহকর্মী, গাড়ি চালক, গণপরিবহন ও নির্মাণ শিল্পের শ্রমিক, বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও দোকানের কর্মচারী, হকার, ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প, কলকারখানা, বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি এবং সংবাদকর্মী। সমাজের এই বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠী অবশ্যই সমাজের সচ্ছল জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত। এদের সকলের যোগাযোগের ঠিকানা তার নিয়োগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে। এই নেটওয়ার্কটি যদি সচল থাকে, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবার প্রয়োজনে সংকটকালীন এই সময়ে সাড়া ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে এ জনগোষ্ঠী এই দুর্যোগে খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় চলে আসবে। এই মানুষগুলো এতদিন ধরে যে গৃহ, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিরামহীনভাবে শ্রম দিয়েছে, এই সংকটকালীন তাদেরকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, এই ক্ষেত্রে সরকাররে চাইতে তাদের দায়িত্বই বেশি এবং তারাই সবার আগে এদের কাছে যেতে পারবে।

উপরের গ্রুপের বাইরে থাকবে আরও একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যারা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে সচ্ছল কৃষক পরিবারগুলো প্রান্তিক কৃষকদের/কৃষি শ্রমিকদের খোঁজ খবর নিতে পারে। তারা প্রয়োজনমতো বিভিন্ন সহায়তা করতে পারে। মনে রাখতে হবে, এই কৃষক ভাইয়েরাই দুর্যোগ মৌসুমে আমাদেরকে প্রায় দুই কোটি টন চাল এর যোগান দিবে। এই সময়ে হয়তো আমাদের প্রধান খাদ্য ভাতের সংকট থাকবে না। মূলত এই কৃষি শ্রমিকরা সবসময়ই মানবেতর জীবন যাপন করে, তাই এই সময়ে তাদের সহায়তার বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে আছে থ্রি হুইলার, রিক্সা, ভ্যান চালক ও খেয়া ঘাটের নৌকার মাঝিসহ অন্যান্যরা। তাদেরও তালিকা ভিত্তিক সংগঠন রয়েছে। তারা নিজেরাই এই সংকট সময়ে একত্রিত ভাবে সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে। উল্লেখিত গোষ্ঠীর বাইরে রয়েছে দিনমজুর, জেলে, বেকার, শারীরিকভাবে অক্ষম, অসহায় দরিদ্র, বিশেষ জনগোষ্ঠী- ভবঘুরে, হিজড়া, যৌনকর্মী, বেদে ও প্রান্তিক জনগণ। এদের সংখ্যা অনেক এবং এরাই সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে থাকবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে এলাকা ভিত্তিক ভাবে ভাগ করতে হবে। এদেরকে সম্পূর্ণভাবে সরকারি সাহায্যের নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এই কাজটি করবে স্থানীয় প্রশাসন জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় । স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় যেভাবে ভোট চাইতে যায় এবং সবার বাড়িতে ভোটার আইডি নম্বর পোঁছে দেয়, ঠিক সেভাবে যাবে। কেউ যেন বাদ না যায় তালিকা থেকে। তাদের বাড়িতে রুটিন করে খাবারের উপকরণ ও কিছু নগদ সাহায্য নির্দিষ্ট দিন পর পর পৌঁছে যাবে। তাদেরকে যেন খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়াতে না হয়, এটি খেয়াল রাখতে হবে।

এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা কম। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট। তাই, করোনা ভাইরাসের এ সংকটকালীন মানুষকে ঘরে রাখতে হলে সবার আগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমার বিবেচনায় ১৭ কোটি বাংলার মানুষকে বিভিন্ন ক্লাস্টার/শ্রেণি/ গ্রুপে ভাগ করতে হবে। এই সংকট সময়ে টেকসই ও কার্যকর সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করতে হবে। এই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিই সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ঘরে থাকা বিষয়টি সফল করার জন্য। আর এ সফলতাই হবে মহামারী কোভিড ১৯ থেকে আমাদের উত্তরণের অন্যতম পথ। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের মতো বাংলাদেশও এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা। কিছু ব্যক্তির অসচেতনতা এবং অতি আত্মবিশ্বাস দেশে করোনা ভাইরাসের প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। মনে রাখতে হবে, করোনা ভাইরাস নিজ থেকে কাউকে আক্রান্ত করে না। এটি মানুষ, জীবের বা অন্য কোন বাহকের মাধ্যমে ছড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে এই মরণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ আটকাতে ঘরে থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত সনাক্ত করা। তাই এটি এখন পরিষ্কার যতো বেশি টেস্ট, ততো তাড়াতাড়ি পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যাবে।

জনসংখ্যার বিচার এবং অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার অভাবে করোনা টেস্ট হয়তো জনগণের দোরগোড়ায় আমরা নিয়ে যেতে পারবো না। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের বর্তমানে ১৭টি ল্যাবে করোনা পরীক্ষা চলছে। হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের গবেষণাগারে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করতে পারবে। হাসপাতালগুলোর এসব ল্যাবে প্রায় ৩০টি মেশিনে পরীক্ষা হয়। এর সংখ্যা হয়তো ক্রমান্বয়ে কিছুটা বাড়বে। বর্তমানে এসব মেশিনের দৈনিক টেস্ট করার সক্ষমতা আছে ৬ হাজারেরও অধিক। কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে টেস্ট হচ্ছে দেড় হাজারের মতো। অর্থাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা অনেক সময় সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে নমুনা সংগ্রহকারীদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়নি। জার্মানি, চীন, কোরিয়া ও সিংগাপুর এর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পরীক্ষা ছাড়া করোনার ভয়াবহতা নিরূপণ করাও যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এর ভয়াবহতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই করোনা আছে কিনা নির্ধারণ করতে কোন উপসর্গ দেখা দিলেই টেস্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে করোনা উপসর্গ দেখা দেয়া ব্যক্তির প্রাথমিক তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা কর্মীরা এক্ষেত্রে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। এতে করে সময় ও সম্পদ দুটোই বাঁচবে এবং টেস্ট করার উদ্দেশ্য অনেক বেশি সফল হবে। কম সংখ্যক টেস্ট করে করোনায় আক্রান্ত বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে সনাক্ত করা যাবে।

অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। দেশ ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের দিকে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। এসব খবরে বলা হয়েছে, রোগ সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে। এই সময়ে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে বহু মানুষ এবং অনেক মানুষকে হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষ চিকিৎসা সেবার দরকার হবে। এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। তাই ক্রান্তিকালীন চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নেয়া পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। চিকিৎসা সেবার সাথে যুক্ত সকলের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে এই বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজন পেশাগত তদারকির। স্বাস্থ্যসেবাই নিয়োজিতদেরকে সুরক্ষার বিষয়ে দেয়া প্রটোকলগুলো বিশেষভাবে মেনে চলতে হবে। এই সমরক্ষেত্রে তাঁরাই সম্মুখ ভাগের যোদ্ধা। তাদের সুরক্ষা এসময় সবচেয়ে বেশি দরকার।

আর একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে, এই ক্রান্তিকালীন করোনার প্রকৃত অবস্থা জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও বাস্তব অবস্থা জানার মধ্যে ফাঁক থাকলে সকল প্রচেষ্টাই বৃথা হয়ে যাবে। তাই চিকিৎসকদের পাশাপাশি দেশের সাংবাদিক সম্প্রদায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। দেশের সাংবাদিক ভাইয়েরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত করোনা চিত্র তুলে ধরছেন যা নীতি নির্ধারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই মহামারী সময়ে গণমাধ্যম বন্ধ, চাকুরিচ্যুতি, বেতন বন্ধ বা দেরিতে বেতন যেন না হয় সেদিকেও মালিকপক্ষকে সচেষ্ট হতে হবে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে সংবাদকর্মীদের চাকুরী, সুরক্ষা, নির্বিঘ্নে যাতায়াত ও তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতার প্রতি। অবস্থা যতই ভয়াবহ হোক কেন মিডিয়া যেন কোনভাবে সঙ্কটে না পড়ে। প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মিডিয়া এই সংকটকালিন সবচেয়ে বড় বন্ধু।

কোভিড-১৯ মহামারী আবির্ভাবের পূর্বে বিদ্যমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছিল সমগ্র বিশ্বের জন্য অনুকরণীয়। সমগ্র বিশ্বের সার্বিক অবস্থা দেখে এই কথা বলা যায় য়ে, দুর্বার গতিতে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অগ্রসরমান বাংলাদেশের উন্নয়ন হঠাৎ করেই থমকে যাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের তথ্য মতে, দেশের দারিদ্র্যর হার ২০.৫ এবং হত দারিদ্র্যর হার ১০.৫। দেশের গড় মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ইউএস মার্কিন ডলার। আর প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৫। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা একেবারেই কম নয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে হয়তো এ হার বেড়ে যাবে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাবে, খাদ্য সংকট প্রকট হবে, হয়তো মহামন্দাও দেখা দিতে পারে। বিশ্ব ব্যাংক ইতোমধ্যে বলেছে যে, চলতি অর্থ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার আশংকাজনক ভাবে অনেক কমে যাবে।

করোনার আগ্রাসী ভয়াবহতায় আজ মানুষ শঙ্কিত। এ বিপর্যয় থেকে কেটে উঠতে দেশের সরকার প্রধান ইতোমধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করেছেন। এ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে মোটেই দেরি করা যাবে না। এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সমগ্র দেশবাসীকে এজন্য প্রস্তুত করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় মোট ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সম্ভাব্য পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার মূলত চারটি কৌশল অবলম্বন করবে বলে জানিয়েছে। ক) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি; খ) আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়ন; গ) সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি; ও ঘ) মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি। এছাড়া, সরকার শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাতের জন্য তহবিল ঘোষণা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সেক্টরকে সচল রাখার জন্য নানা ধরনের প্যাকেজ ঘোষণা করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতা, বিচক্ষণতা ও দেশ পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এই সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে সঠিকভাবে পরিচালিত করবে এবং দেশ এই সঙ্কট অচিরেই কাটিয়ে উঠবে, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ এর এই সংকটময় কঠিন পথটি পাড়ি দেয়া সরকারের একার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। এগিয়ে আসতে হবে সকলকে আন্তরিকতা ও মানবিকতা নিয়ে। কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। মনে এই বিশ্বাস রাখতে হবে, ‘মানুষ কখনো পরাজিত হয়না’।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর