বুধবার ১৫ জুলাই, ২০২০ ১২:১৩ পিএম


করোনাকালে কিন্ডারগার্টেন ও নন-এমপিও শিক্ষকরা কেমন আছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫:৫০, ২২ মে ২০২০  

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগ গোটা বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাকে চরমভাবে ধাক্কা দিয়েছে।  বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেছেন, ‘করোনার ক্রান্তিলগ্নে আমরা প্রায় ৬০ হাজার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০ লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছি। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমরা কোনো টিউশন ফি আদায় করতে পারিনি। তাই শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।’ আমরা জানি কিন্ডারগার্টেন জাতীয় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হয় এবং শিক্ষক নেতারাও বলেছেন, ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ভাড়া বাড়িতে অবস্থিত। একটু সচ্ছল অথচ বেকার কোনো ছেলে বা মেয়ে নিজের বাসার একটি বা দুটি রুমে হয়তো এজাতীয় প্রতিষ্ঠান চালু করেন।  করোনাকালে দীর্ঘ  এই বন্ধেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়ি ভাড়া ঠিকই দিতে হচ্ছে, যদিও শিক্ষার্থী বেতন নেই দুই মাসের অধিককাল যাবৎ। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী বেতনের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল। অন্যান্য বিলও  প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক হারে  পরিশোধ করতে হয় যা এখনো অব্যাহত আছে। কিন্ডারগার্টেন ও প্রাইভেট বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে নামমাত্র বেতন পান, তাঁরা নির্ভর করেন মূলত প্রাইভেট টিউশনির ওপর। করোনাকালে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত এই বন্ধে তাঁদের টিউশনি যেমন বন্ধ রয়েছে, তেমনি অনিশ্চিত হয়েছে তাঁদের উপার্জন। তাঁরা না পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন, না পাচ্ছেন প্রাইভেট পড়ানো বাসা থেকে কোনো বেতন। কাজেই জীবন চালানো, সংসার চালানো তাঁদের জন্য হয়েছে দুরূহ। গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ শুরু হয়েছে এবং কয়েক দফায় বাড়িয়ে তা রোজা, ঈদসহ ৬ জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। ঈদের পরও প্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা নেই। করোনাকালে বন্ধে বেসরকারি অথচ  এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন। কিন্তু  নিজস্ব আয়ে চলা বেসরকারি এসব  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের দিন কিভাবে কাটছে তা কি আমরা ভেবে দেখেছি কখনো? দেশে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা শিক্ষক নেতাদের কথায় জানা যায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার, আর সরকারের স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথচ নন-এমপিওভুক্ত, এ রকম প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক, কর্মচারী ৭৫ থেকে ৮০ হাজার। এ ছাড়া সরকারি স্বীকৃতির বাইরে আরো দুই হাজারের বেশি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মানে আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রের বিরাট একটি অংশজুড়ে আছে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। এগুলোর অস্তিত্ব আমরা কোনোভাবেই অবজ্ঞা করতে পারি না।

ঈদের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো না খোলার ইঙ্গিত আমরা ভালোভাবেই পেয়েছি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বলেছেন, ‘৩০ মের পর যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে যাওয়ার কথা কেউ প্রচার করে, তাহলে পুরোটাই গুজব। কারণ এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হয়নি। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর কাছাকাছি সময়ে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিব।’ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, ‘সাধারণ ছুটির সঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে রোজা ও ঈদের ছুটিও চলছে। এর পর গ্রীষ্মকালীন ছুটিসহ আগামী ৬ জুন পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকবে। এর আগেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই স্কুল খোলার সম্ভাবনা নেই।’ আর প্রধানমন্ত্রী তো আগেই  বলেছেন, ‘যখন করোনার প্রকোপ থাকবে না, তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে। আমরা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলব না। অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজ সবই বন্ধ থাকবে, যদি করোনাভাইরাস অব্যাহত থাকে।’

পরিস্থিতির বিবেচনায় সিদ্ধান্ত এমনই হতে বাধ্য, কিন্তু লাখ লাখ শিক্ষক ও কর্মচারী যাঁরা শিক্ষা প্রদান করছেন আমাদের সন্তানদের অথচ তাঁরা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোনো বেতন-ভাতা পান না, তাঁদের কি হবে? এ ব্যাপারে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোটাই টিউশন ফি-নির্ভর। আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করব, এখন তাঁদের খরচও একটু কম। তাই তাঁরা যেন টিউশন ফির ব্যাপারটি বিবেচনা করেন। তবে যাঁরা সমস্যায় আছেন তাঁদের কথা ভিন্ন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকেও বলব, প্রয়োজনে কিছুটা ফি কম নেওয়া বা কিস্তিতে ফি নেওয়ার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। যার মধ্য দিয়ে অভিভাবকরাও কিছুটা স্বস্তি পেলেন, স্কুল শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারল, বড় আকারের কোনো সমস্যায় পড়ল না। কিন্তু এখন সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বলার সুযোগ নেই যে তোমরা ফি নেবে না।’ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য এর মাধ্যমে এক ধরনের সমাধান দিয়েই দিয়েছেন। অর্থাত্ অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ—এই দুই পক্ষকেই একটু ছাড় দিতে হবে তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জীবন বেঁচে যাবে।

এগুলোর মধ্যে দুই-একটি প্রতিষ্ঠান হয়তো নিজেদের গচ্ছিত ফান্ড থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে বা করতে পারছে, কিন্তু বিশাল সংখ্যক বিদ্যালয়ের কি হাল হবে? ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে এক আদেশে টিউশন ফি আদায়ে চাপ প্রয়োগ না করার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিলে বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে বকেয়াসহ মাসিক বেতন আদায়ের অনুরোধ জানানো হয় আদেশে। এ নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। অভিভাবকদের কাছে এই দুর্দিনে বেতন চাইলে সেটা অমানবিকতার পর্যায়ে পড়ে। আর বেশির ভাগ অভিভাবকও এই মুহূর্তে বেতন দিতে রাজি নন। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন আদায় না করলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারছে না। আর এই মুহূর্তে শিক্ষকদের বেতন, বোনাস বাকি পড়লে সেটি আর এক ধরনের অমানিবকতা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই মানবিক আবেদনের মাধ্যমে অভিভাবকদের এসএমএস পাঠিয়ে বেতন চাচ্ছে, আবার কেউ কেউ কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে অনেক জায়গায়। তাই, এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে আসা উচিত। হতে পারে, অভিভাবকদের ৭০ শতাংশ বেতন দিতে হবে, বাকিটা মওকুফ করা হবে। এই ৩০ শতাংশ বেতন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক- কর্মচারীদের বহন করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের  অর্থিক অবস্থা ভালো তারা শিক্ষকদের এখনই এই বেতন  দিয়ে দেবে, বাকিরা পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে দেবে। তবে, কোনোভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীদের ঠকানো যাবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি কে নেবে? স্কুল কমিটি, শিক্ষা বিভাগের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, অভিভাবক প্রতিনিধি সমন্বয়ে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে যেখানে মন্ত্রণালয় সায় দেবে। স্কুল কমিটিগুলো এখন কোথায়? স্থানীয় সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তাদের এ ক্ষেত্রে ভূমিকা কী? তাঁদের ভূমিকা এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আমরা দেখতে চাই।

এখানে রয়েছে বিরাট এক সমস্যা। প্রতিটি উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় শহরে, রাজধানীতে কোথায় কতটি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় রয়েছে তার হিসাব কি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসারদের কাছে আছে? নেই। রাষ্ট্রীয় তরফেও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। শিক্ষক নেতাদের কেউ কেউ বলেন, দেশে ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, আর এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা দুই লাখ। আবার অন্য এক সংগঠনের শিক্ষক নেতারা বলছেন, এই সংখ্যা ৬০ হাজার, আর এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, উপকারভোগীর সংখ্যা ২০ লাখ। তার মানে হচ্ছে সরকারি খাতায় এগুলোর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। আর এ থেকে সহজেই বুঝা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয়  অবজ্ঞা কতখানি। এসব প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষক আছেন, তাঁরা কি ধরনের বেতন পান—এ ধরনের তথ্য  উপজেলা কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসারদের কাছে নিশ্চয়ই নেই। মনে প্রশ্ন জাগে, তাঁদের কি কোনো দিন সময় হয়েছে এসব বিদ্যালয় পেশাগতভাবে পরিদর্শন করার? খুব সম্ভব হয়নি, কারণ তাঁদের অন্য কাজ আছে। তাঁরা শিক্ষকদের বদলি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বদলি একটি বাণিজ্য, বিদ্যালয়ের হালচাল দেখা কিংবা একাডেমিক বিষয় দেখায় সে রকম বাণিজ্য নেই। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক নেতারা সরকারের কাছে অর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার সহায়তা করতে চাইলেও কার মাধ্যমে এবং কিভাবে তা করবে? শিক্ষক নেতাদের এক অংশ সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা চেয়েছেন, অন্য একটি অংশ চেয়েছেন ৫০০ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষদের ত্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বহু অনিয়মের কথা শুনেছি। কারণ স্থানীয় তথাকথিত নেতা কিংবা প্রভাবশালী লোকদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে প্রকৃত অভাবীরা ত্রাণ পাননি। কিন্ডারগার্টেনের ক্ষেত্রে কাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ প্রদান করা হবে? আর সংখ্যার ক্ষেত্রে কোন পরিসংখ্যানটি গ্রহণযোগ্য বলে ধরা হবে? ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন এবং তার সঙ্গে দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারী না ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন ও এগুলোর সঙ্গে ২০ লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও উপকারভোগী?

শিক্ষক নেতারা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফির ৪০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, ৪০ শতাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন, বাকি ২০ শতাংশ গ্যাস বিল, বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুত্ ও পানির বিলসহ অন্যান্য খরচ নির্বাহ না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দিতে হয়। এটি অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সত্য। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় না হওযায় মার্চ মাস থেকে এই পর্যন্ত স্কুলগুলো সব ধরনের বিলসহ বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। বাড়ির মালিক ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও গরিব কর্মচারীরা  অর্থকষ্টে মানবেতন জীবনযাপন করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা দিশেহারা। শিক্ষা ক্ষেত্রের বিশাল এই সেক্টরকে টিকিয়ে রাখতে এবং অসহায় শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও গরিব কর্মচারীদের জন্য জীবন বাঁচাতে এবং এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য শিক্ষক নেতারা প্রধানমন্ত্র্রীর কাছে যেকোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রার্থনা করেন। নেতারা বলেছেন, ‘এ স্কুলগুলো যদি না থাকত তাহলে সরকারকে আরো ২৫ থেকে ৩০ হাজার বিদ্যালয় স্থাপন করে প্রতি মাসে শিক্ষক বেতন বাবদ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। সেদিক থেকে বলা চলে  আমরা সরকারের বিরাট রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে দিয়েছি। পরোক্ষভাবে আমরা দেশের বেকার সমস্যা সমাধানেও কাজ করছি।’ শিক্ষক নেতাদের এই কথাগুলো কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয়, যুক্তিসঙ্গত কথা। কাজেই তাঁদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষা  একটি সমাজ ও জাতি গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে তা পরিচালনা করতে  হয়। এটি কোনোভাবেই যার তার হাতে ছেড়ে দিলে হয় না। কিন্ডারগার্টেনগুলো আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় অর্ধেক  প্রতিষ্ঠান (৬৫৫০০টি) রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে পরিচালনা করা হয় যেটি একটি ভালো দিক কিন্তু সেখানে শিক্ষকদের চাকরিটি সরকারি ছাড়া অন্য কোনো ভালো দিকের কথা আমরা শুনি না, দেখতে পাই না। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর পর একজন শিক্ষার্থীকে যেসব দক্ষতা অর্জন করতে হয় সেখান থেকে তারা বহু দূরে অবস্থান করছে। এমনকি তারা দেখে বাংলাও পড়তে পারছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা অনেকটাই ভালো। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে ফিডব্যাক প্রয়োজন ওই কাজ ও ক্ষেত্রের যথাযথ উন্নয়নের জন্য যেটি আমাদের কালচারে নেই। আমরা ফিডব্যাক মনে করি সমালোচনা। তাই উন্নয়নের সুযোগ আর থাকে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কি হচ্ছে তা যদি সঠিকভাবে মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারকে জানতে হয় তাহলে প্রাসঙ্গিক লোকদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া প্রয়োজন। সেটি হয় না বলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান তলানীতে গিয়ে পৌঁছেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুর্বলতার সুযোগেই দেশে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন টাইপের বিদ্যালয়। এগুলো ব্যক্তি পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। একটি দেশের ভবিষ্যত্ নাগরিকদের যার তার হাতে ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। কিন্ডারগার্টেনে যাঁরা পড়ান তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ নেই। অথচ শিশুদের ডিল করার জন্য, তাদের পড়ানোর জন্য শিশু শিক্ষা ও শিশুবিজ্ঞানের ওপর যথেষ্ট ধারণা থাকতে হয়, জানতে হয়, প্র্যাকটিস করতে হয় এবং এগুলোর ওপর শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়, ফিডব্যাক নিতে হয়—এগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মতো কিন্ডারগার্টেনগুলোতেও হয় না। ব্যতিক্রম দু’ চারটি রয়েছে। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও  অন্যভাবে ম্যানেজ করা যায় কিন্তু শিশুদের শিক্ষা কারোর বাড়ির বারান্দায়, কারোর ভাড়া করা একটি রুমে বা দুটি রুমে, ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর চলতে দেওয়া যায় না। সেখানে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে যারা শিশুশিক্ষার সার্বিক নির্দেশনা প্রদান করবে এবং সেভাবেই গোটা দেশে একইভাবে শিশুদের আনন্দদায়ক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে, সেখানকার শিক্ষকদের যথাযথ পেশাগত উন্নয়ন সংঘটিত হবে। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক, পরিচালক কিংবা মালিকদের আমরা দোষারোপ করতে পারি না। প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বলতার কারণেই এগুলো গড়ে উঠেছে। এখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রের। এখানকার শিক্ষকদের চাকরি অনিশ্চিত, কোনো সার্ভিস রুল নেই, সার্ভিস শেষে কোনো বেনিফিট নেই। এ অবস্থায় তাঁরা কতটা নিবেদিত হবেন পেশার প্রতি সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। এসব কিন্ডারগার্টেন এবং নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভালোভাবে চলে, শিক্ষক-কর্মচারীদের সার্ভিস রুল তৈরি হয়, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান অনুষ্ঠিত হয়, শিক্ষকদের জবাবদিহির মধ্যে আনা যায় এবং সর্বোপরি ভবিষ্যত্ নাগরিকদের এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান করা যায় সে জন্য একটি শক্তিশালী, পেশাগত ও রাজনীতিমুক্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।  

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস- প্রেসিডেন্ট : বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা) এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যািলয় শিক্ষক

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর