রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ২১:০২ পিএম


কথিত প্রশিক্ষণের নামে সরকারি অর্থের অপচয়

এডুকেশন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭:৫৯, ২ নভেম্বর ২০১৯  

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার নিশ্চয়ই বিশেষ প্রয়োজন রহিয়াছে। মূলত পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এই সুযোগের বিধান রাখা হইয়াছে। কিন্তু পরিতাপের সহিত দেখা যাইতেছে, সরকারি এই সুযোগের অপব্যবহার হইতেছে হরহামেশাই।

প্রশিক্ষণার্থে যাহারা বিদেশে যাইতেছেন, তাহাদের সিংহভাগই যাইতেছেন মূলত বিদেশ-ভ্রমণ অথবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে। কিছুদিন পূর্বে আমরা পুকুর খনন প্রকল্পের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের অজুহাতে বিদেশে গিয়া প্রশিক্ষণ গ্রহণের উপর প্রশ্ন তুলিয়াছিলাম।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে জানা গিয়াছে, ২৬ জন সরকারি কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ ছিল কোরিয়ায়, কিন্তু গিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রেও। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহিত চুক্তির শর্তে ছিল, দক্ষিণ কোরিয়ায় এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিবেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ১৮ প্রকৌশলী। কিন্তু ‘শিক্ষা সফরে’ কোরিয়া ঘুরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে গিয়াছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মকর্তা, সংসদীয় কমিটির সভাপতির ব্যক্তিগত সচিবসহ ২৬ জন।

তাহা ছাড়া, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহিত চুক্তি অনুযায়ী, শুধু প্রকৌশলীদেরই দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ গ্রহণের কথা ছিল। অথচ ‘প্রশিক্ষণার্থী’র সংখ্যা বাড়াইতে প্রশিক্ষণের মেয়াদ এক মাস হইতে কমাইয়া ১২ দিন করা হইয়াছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করা হইয়াছে এই সময়ের মধ্যে। বয়সসীমা শেষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাইয়াছেন কিংবা চাকরির মেয়াদ আর দুই মাস বাকি রহিয়াছে—এমন কর্মকর্তাও দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা সফরে গিয়াছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই তথাকথিত ‘শিক্ষা সফরে’ তাহাদের অর্জিত জ্ঞান কোথায় কাজে লাগিবে?


বলিবার অপেক্ষা রাখে না, প্রশিক্ষণকে গৌণ করিয়া প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণকেই গুরুত্ব দেওয়া হইয়া থাকে অনেক ক্ষেত্রে। কেবল সওজ বিভাগের নহে, আমাদের দেশে প্রায় সকল প্রকল্পে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রবণতা লক্ষণীয়।

আমরা আগেই বলিয়াছি, বহু ক্ষেত্রেই বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিবার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ সফর করিতেছেন যিনি, তিনি প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরিয়া বিষয়টির উপর নবলব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইবেন—ইহাই স্বাভাবিক চাওয়া। কিন্তু যিনি বিদেশ সফর করিয়াছেন শুধুই প্রমোদভ্রমণ হিসাবে অথবা দায়িত্ববহির্ভূত ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ লইয়াছেন, তিনি কীভাবে পূরণ করিবেন এই চাওয়া?

আরেকটি বিষয় হইল, যিনি সত্যিকারের প্রশিক্ষণ লইয়া আসেন, অনেক সময় দেখা যায় যে মাত্র কয়েক মাস পরই তিনি অবসরে যাইবেন। আবার যেই প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হইল, সেই প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই বদলি করা হয় অন্যত্র। এই ধরনের প্রশিক্ষণও বাস্তবিক অর্থে কোনো কাজে লাগে না।

বস্তুত, সরকারি দপ্তরগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ সফরের যেই প্রয়োজনীয় বিধান রাখা হইয়াছে, বিনা প্রয়োজনে সেই সুযোগ কাজে লাগাইলে তাহা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয় যে, এই বত্সর অমুক যাইবেন তো পরের বত্সর তমুক! সুতরাং আমরা মনে করি, প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ সফরের একটি কার্যকরী সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার, যাহাতে সরকারি অর্থের অপচয় না হয়। ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয়।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর