সোমবার ১৭ জুন, ২০১৯ ৫:১৭ এএম


কওমি জননীকে আলেমদের অভিনন্দন

মুফতি মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন

প্রকাশিত: ১৩:৩৬, ৪ জানুয়ারি ২০১৯  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি জননী, মানে জাতির মা। হ্যাঁ, তিনি বাঙালি জাতির মা, আর কওমি সন্তানদের জন্য মমতাময়ী এক জননী। তার বাবা বাঙালি জাতির পিতা; থাকবেন মহাপ্রলয় পর্যন্ত।

বাবার নামের ঐতিহ্যের সূত্র পরম্পরায় তিনি এ উপাধি বাগিয়ে নেননি। যেমন তার বাবাও ক্ষমতার দাপটে ‘জাতির পিতা’ অভিধা বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেননি।

বাংলাদেশের অস্তিত্বকে পৃথিবীব্যাপী উচ্চকিত করার জন্য, শৃঙ্খলিত অস্তিত্বকে স্বাধীনতার সৌষ্ঠবে রাঙানোর জন্য বাঙালি জাতিই বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা অভিধায় সিক্ত করে দায় শোধ করেছে। এ জাতির পরিচয়ের আদ্যোপান্তজুড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। তাকে ছাড়া এ জাতির পরিচয় নিতান্তই গৌণ, বর্ণ-বৈশিষ্ট্যহীন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকে বাধ্য করেননি তাকে কওমি জননী উপাধি দিতে। কওমি সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রমের স্বীকৃতি এ দেশে ছিল না। বিশেষত সরকারের কোনো স্তরে ছিল না।

অস্বীকৃতির বঞ্চনা আর সীমাহীন কষ্ট তাড়িয়ে বেড়িয়েছে কতকাল। নিজেদের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিচিত্র শাখায় যে কওমিওয়ালারা বিচরণ করতে চেয়েছেন, কত ঘাটের পানি যে তাদের খেতে হয়েছে তার হিসাব ভুক্তভোগী মাত্র জানেন।

এ রকম ঠিকানাবিহীন নিরাশ্রয় অবস্থান থেকে যিনি স্বীকৃতির ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। দেশ মাতৃকার এই কূলহীন সন্তানদের দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ সুগম করে দিয়েছেন যিনি, যাদের অনুকূলে সংসদের আইন পাস করিয়েছেন, তিনি তো আসলে মায়ের পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কওমি পড়–য়াদের মা- কওমি জননী।

আমরা বিশ্বাস করি, হুট করে স্রেফ রাজনৈতিক বিবেচনায় এ স্বীকৃতি দেননি শেখ হাসিনা। তিনি তার বাবার মতোই চিন্তাচেতনায় অসাম্প্রদায়িক। বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক ছিলেন কিন্তু অধার্মিক ছিলেন না।

তিনি সম্ভ্রান্ত মুসলিম ছিলেন। দরাজ দিল মানুষ ছিলেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাকরাইল মসজিদের জায়গা দিয়েছেন।

আছে বিশ্ব ইজতেমার ময়দান বরাদ্দের ক্ষেত্রেও তার বড় অবদান ছিল। তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও একজন খাঁটি মুসলমান হওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি ধর্মের নামে অধর্মপনা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও মানবতাবিরোধীদের ঘোর বিরোধী।

তিনি যখন বহু খোঁজখবর নিয়ে স্টাডি করে নিশ্চিত হয়েছেন কওমি পড়ুয়ারাও অসাম্প্রদায়িক, তারা কোন সন্ত্রাসবাদ বা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কখনও জড়ায়নি।

বরং ইসলামের নাম নিয়ে যারা এসব করে বেড়ায়, যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি নয়, সেই তাদের সবচেয়ে বড় ও ঘোরতর শত্রু এই কওমি পড়ুয়ারা। কওমিওয়ালারা কখনও তাদের সঙ্গে আপস করেননি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় কওমির কেউ তাদের পক্ষ নেননি।

আধুনিক আলেমদের পক্ষ থেকে কওমি জননীকে রহমত ও বরকতময়তার ছোঁয়ায় সিক্ত মোবারকবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি এজন্য যে, অনেক বাধা আর রক্তচক্ষু জয় করে তিনি একাধারে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করছেন। তার এ ভূমিধস বিজয় স্বীকৃতির পক্ষের আধুনিক আলেমদের উচ্ছ্বসিত করেছে।

তারা আশায় বুক বাঁধছেন যে, নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম দিন থেকেই তিনি তাদের কথা মনে রাখবেন। মা হিসেবে সন্তানদের যত্নের ত্রুটি করবেন না। সমাজ ও দেশের মূল স্রোতে যাতে তারা ঠাঁই পায়- হারিয়ে না যায় তিনি সে ব্যবস্থা করবেন। কারণ তিনি জানেন, কওমি শিক্ষা কারিকুলামে বা সিলেবাসে শুধু পরকালের বিষয়েই পাঠ দান করা হয় না।

রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারনীতি, ব্যবসায়নীতি, ব্যাংকিংনীতি, পারিবারিকনীতি, শিল্পনীতি, বিনোদননীতি, শ্রমনীতিসহ আধুনিক ও মৌলিক সব বিষয়েই পাঠদান করা হয়।

শুধু তাই নয়, সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, নৈতিকতার চর্চা এমনভাবে অনুশীলিত হয় যে, ছাত্র জীবনেই সবাই নৈতিক জীবন ধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। আজকাল নকল ঠেকাতে কত যুদ্ধ করতে হচ্ছে সব মহলকেই।

অথচ কওমি মাদ্রাসার পরীক্ষায় নকলের চর্চা একবারেই নেই। কেউ হুবহু উত্তর লিখে নিয়ে পরীক্ষার্থীর সামনে রাখলেও সে সেটা গ্রহণ করবে না। কারণ দেখে লেখার চেয়ে মুখস্থ পাঠ থেকে লেখা অনেক সহজ এবং লেখার গতিও থাকে দ্রুততর।

তাই কওমি মাতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে করজোড়ে বলছি, কওমি মেধাবীদের কাজে লাগান। সব প্রতিযোগিতায় তারা শুধু ভালোই করবে না, সেরাদেরও ছাপিয়ে যাবে। যে কোনো সেক্টরে সুযোগ দিয়ে দেখুন।

দেশ নিয়ে তাদের বুকে অনেক স্বপ্ন দানা বেঁধে আছে। শুধু নিতে নয়, দেশকে অনেক কিছু দিতে চায় তারা। সে স্বপ্ন বাস্তব জগতে যাতে পাখা মেলতে পারে সে ব্যবস্থাটা অন্তত করে দিন আপনি।

আট দশ বছরের বাচ্চা যদি ৬০০ পৃষ্ঠার বেশি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্র গ্রন্থটি মুখস্থ করতে পারে, হাজারো মানুষের সামনে তারাবি নামাজে অনর্গল পড়ে যেতে পারে, তার মেধা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা তো অসম্ভব ব্যাপার।

আজকের আলেমদের বেশিরভাগই আধুনিকমনা হয়ে তৈরি হচ্ছে। তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। শুধু ইমামতি খতিবি বা মাদ্রাসা পড়ানো নিয়ে থাকতে চায় না। তারা সমাজবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট সেক্টরে সেবাদানকারী হতে চায়।

শরীয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকের অফিসার হতে চায়। প্রজেক্ট আকারে তাদের সুযোগ দিয়ে দেখুন, তারা আপনাকে সন্তুষ্টই করবে, হতাশ করবে না ইনশাআল্লাহ্। আপনি দীর্ঘজীবী হোন। আলেমদের দোয়া সব সময় আপনার সঙ্গে থাকবে।

আপনার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আল্লাহ্ আপনাকে সাহায্য করুন, কোনো অশুভ শক্তি যাতে আপনার ধারে কাছে ঘেঁষতে না পারে, আল্লাহর কাছে সেই দোয়া করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শরীয়াহ্ সেক্রেটারি- ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

এডুকেশন বাংলা/ এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর