বৃহস্পতিবার ২৩ মে, ২০১৯ ২৩:০৬ পিএম


এসএসসির ফলাফলে তাক লাগিয়ে দেয়া ১১ মেধাবীর গল্প

প্রকাশিত: ০৮:৩২, ১১ মে ২০১৯   আপডেট: ০৮:৩২, ১১ মে ২০১৯

দরিদ্রতার সঙ্গে সংগ্রাম করে বিজয়ী হয়েছে ওরা; বাকি জীবনটাও জয় করার স্বপ্ন এখন তাদের চোখে। দরিদ্রতা কখনও তাদের মেধা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

অদম্য ইচ্ছা শক্তি তাদের দুর্লভ সাফল্য এনে দিয়েছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও গোল্ডেন পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়েছে এ অদম্য মেধাবীরা। জান্নাতুল ইসলাম, মাহমুদা, সুলতানা, সুরাইয়া, ইতি, রিনা, লিপা, সুমি, ফাহিমা, খাদিজা, রিয়া এরা সবাই উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে চায়। হতে চায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, প্রকৌশলী, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। হবে কি তাদের আশা পূরণ? এই স্বপ্ন যেন তাদের দুঃস্বপ্ন না হয়- এটাই তাদের এখন চাওয়া-পাওয়া এবং সহযোগিতা চান সবার।

জান্নাতুল ইসলাম: অভাবের সংসার। স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায় জান্নাতুল। হবে কি তার আশা পূরণ? হতে পারবে কি সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার? সেই স্বপ্ন যেন বারবার তাকে টেনে ধরে অভাবের সংসারে। কখনো দিন-মজুর, কখনো কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তার পিতা জাহিদুর ইসলাম। সম্পদ বলতে শুধু বাড়িভিটা। আয় যা হয় তা দিয়েই সংসার চালানো মুশকিল এর ওপর মানসিক রোগী এক মেয়ে রয়েছে বাড়িতে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে জান্নাতুল সবার ছোট। বড় ভাই চাকরি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। তাই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নগুলো যেন বারবার অন্ধকার মনে হয় জান্নাতুলের। মা ছালমা দুঃখের সঙ্গে বলেন, অভাবী সংসার তিন বেলা পেট পুরে খাবার জোগাড় করাই কঠিন। তার ওপর পড়াশোনা যেন পাহাড় ঠেলার সমান। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় থানাহাট বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে জান্নাতুল ইসলাম। তার বাড়ি উপজেলার সরকার পাড়া বেলের ভিটা গ্রামে।

মাহমুদা খাতুন: উপজেলার কিশামতবানু এলাকার দিনমজুর মতিয়ার রহমানের ২য় কন্যা মোছা. মাহমুদা। দরিদ্রতা এবং পারিবারিক নানা সংকট বিকশিত হওয়ার পথকে সঙ্কুচিত করেছে। বারবার অভাব নামের থাবাটা টেনে ধরতে চেষ্টা করেছে কিন্তু অভাব থাকলেও মেধাকে আটকাতে পারেনি কেউ। তার স্বপ্ন এখন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিন্তু বাধা এখন অভাব। বাবার নির্দিষ্ট কোনো আয় নেই। কাজ করলে জোটে না করলে নাই, ধারদেনা, অন্যের সহায়তা নিয়ে টানাটানির সংসার। নেই ভালো পোশাক, ভালো খাবারও নেই। শুধু নেই আর নেই। শত প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে (ভোকে.) থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভালো ফল নিয়েও এখন চিন্তার সাগরে তার বাবা মা এবং সে নিজে। হবে কি তার স্বপ্ন পূরণ? আসবে কি কেউ সহযোগিতা নিয়ে?
সুরাইয়া ও সুলতানা: ‘অভাব’ নামের শব্দটি আটকাতে পারেনি দু’বোন সুরাইয়া ও সুলতানার মেধার বিকাশ। সুরাইয়া গোল্ডেন ও সুলতানা জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। শত বাধা শত অভাব থামাতে পারেনি তাদের প্রতিভাকে। বাবার রোজগারের ওপরেই ভরসা। দিনমজুর বাবা যা আয় করেন তা দিয়েই খেয়ে-না-খেয়েই দিন কাটে ৫ জনের সংস্যার। পায়নি ভালো পোশাক, জোটেনি ভালো খাবার। তবুও থেমে থাকেনি দু’বোন, আটকে যায়নি মেধা। তাই তো এবার শত কষ্টের মধ্যেও এগিয়ে নিয়েছে তাদের প্রতিভাকে। তাদের দু’বোনের ইচ্ছা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু বাবা-মা বড় চিন্তায়, কীভাবে তার ইচ্ছা করবে তারা পূরণ? তারা এবারে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি (ভোকে.) থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।

ইতি: ইতি চলতি এসএসসি পরীক্ষায় থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভোকেশনাল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবার নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস নেই। মা মানসিক রোগী। বড় বোন ডিভোর্স প্রাপ্ত, সেও এখন একটি মেয়ে সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে। নেই সহায়-সম্বল। আছে শুধু বাড়িভিটা ৩ শতক জমিটুকু। এরপরও সংসার খরচ, যোগ হয়েছে পড়ালেখার বাড়তি খরচ। মেয়ের ভালো ফলাফলেও হয়ে পড়েছে হতাশ। মেয়ের ইচ্ছা লেখাপড়া করার, কিন্তু বাবার ইচ্ছা আছে, সাহস নেই। শত অনিশ্চয়তার মাঝেও ইতি তার জীবনের ইতি টানতে নারাজ এগিয়ে যেতে চায় স্বপ্ন দেখে পড়াশোনা করে একজন ভালো মানুষ হওয়ার। স্বপ্ন দেখে একজন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। তার বাড়ি মাছাবান্দা। বাবার নাম মিজুনুর রহমান।

রিনা: রিনা স্বপ্ন দেখে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায়। কিন্তু বড় বাধা অভাব। বাবার পুঁজি নেই, নেই সম্বল তাই ব্যবসাও ভালো নেই। সামান্য একজন মুদি ব্যবসায়ী। অভাব কিন্তু পিছু হটে নাই। শত অভাবের মাঝেও রিনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি দারিদ্র্য। পিছু টান থাকলেও সব বাধা পেরিয়ে সে এবারে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (ভোকে.) থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছিল না ভালো খাবার, ভালো পোশাক কিন্তু পরীক্ষার ফল খারাপ হতে দেয়নি সব বাধা। সে হতে চায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তার বাড়ি দক্ষিণ সাদুল্লাহ গ্রামে। বাবা আ. রহমান বলেন, অভাবের সংসার তার ওপর লেখাপড়ার খরচ বড় মুশকিল কীভাবে মেয়ের স্বপ্ন করবে পূরণ বারবার তাকে চিন্তাটা কুরে কুরে খাচ্ছে। এমতাবস্থায় সহযোগিতা চান তিনি।

লিপা: উপজেলা মাছাবান্দা এলাকার দিনমজুর গোলজার হোসেনের ছোট মেয়ে লিপা। মা কহিনুর গৃহিণী। সহায়-সম্বল শুধু বাড়িভিটা। কাজ করলে জোটে, না করলে অসহায়। সংসারে অভাব থাকলেও ভালোবাসা আছে, আর সেই ভালোবাসা দিয়ে অভাবকে জয় করেই মেধার বিকাশ ঘটিয়ে এবারে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি (ভোকে.) থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে দারিদ্র্যতা হার মানিয়েছেন লিপা। লিপা এগিয়ে যেতে চায়, চায় দেশ ও জনগণের সেবা করতে, চায় সে ইঞ্জিনিয়ার হতে। কিন্তু বড় বাধা অভাব আর দারিদ্র্যতা। নেই কোনো জমাজমি, শুধু আছে বাড়িভিটা টুকু। ভালো ফল করলেও নেই কোনো আমেজ। কী হবে তার ভবিষ্যৎ- এটাই এখন তার প্রশ্ন ?

সুমি: সংসারে অভাব-অনটন লেগে থাকে দারুণ কষ্ট, তাই তো সুমিকে সব সময় শুনতে হয়েছে নেই, নেই বই, খাতা কলম; নেই ভালো খাবার বা পোশাক। বাবা সাহেদ আলী অনেক আগেই চলে গেছেন পরপারে। বাবা মারা যাওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়ে পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু শত অভাবের মধ্যে নিজে কাজ করে পয়সা জুটিয়ে সংসারের খরচ যোগানোসহ পিছিয়ে পড়েনি কখনো। শত বাধার পর এবারে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে সবার মন জুগিয়েছে। ফল প্রকাশের দিনও সুমি ছিল কাজের সন্ধানে গাজীপুর কোনাবাড়ির একটি গার্মেন্টসে। নদীভাঙনে সব কিছু হারিয়ে এখন তাদের অবস্থান রমনা গুড়েতিপাড়া এলাকায়।

ফাহিমা: উপজেলার মাছাবান্দা এলাকার নুর মোহাম্মদ আলীর ১ম কন্যা ফাহিমা। বাবা দিনমজুর। সংসার চলে কাজের ওপর নির্ভর করে। বাবার আয়ের ওপর চারজনের টানাটানি সংসার। অভাবের সংসারে ছিল কখনো সুখের ছায়া। বারবার অভাব টেনে ধরলেও আটকাতে পারেনি ফাহিমাকে, বাধা দিয়ে পারেনি তার মেধাকে। সব অভাব-অনটনকে পেছিয়ে ফেলিয়ে এবারে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের (ভোকে.) থেকে গোলেন্ড জিপিএ-৫ পেয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ইচ্ছা শক্তির প্রভাব। সে পড়তে চায়, চায় ইঞ্জিনিয়ার হতে, সেবা করতে চায় দেশের। কিন্তু অভাব নামের শব্দটি বারবার তাকে থামিয়ে দিতে চায়। কিন্তু থামতে চায় না ফাহিমা।

খাদিজা: কখনো দেখেনি সুখের বাতি। পেয়েছে শুধু ‘নেই’ শব্দটি। বাবা একজন দিনমজুর। দিনে আনেন দিনে খান। সহায়-সম্বল বলতে আছে শুধু বাড়িভিটা। বাবার আয় দিয়ে সংসার চালানোই বড় কষ্টকর। পড়াশোনা চালাবে কিভাবে? তাই এখন ভালো ফল অর্জন করেও চোখে জল খাদিজার। মা শাহনাজ চায় মেয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করুক, কিন্তু সাধ আছে, সাধ্য যে নেই, তাই তো চোখে জল ফেলে মেয়েকে সান্ত্বনা দেন। খাদিজা থানাহাট বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারে এসএসসি (ভোকে.) জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রমাণ করেছে অভাব বা দারিদ্র্য তাকে আটকাতে পারেনি। সে ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হয়ে জীবন গড়তে চায়, দেশের মানুষের সেবা করতে চায়।

রিয়া: রিয়া চায় একজন আদর্শ নারী হয়ে কাজ করতে, চায় সেবা করতে। চায় একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে। কিন্তু দারিদ্র্যতা আর অভাব তাকে বারবার টেনে ধরছে। শত বাধার মুখে এসএসসি পরীক্ষার ফল ভালো করলেও এখন হতাশ, পারবে কি এগিয়ে যেতে, পারবে কি আশা পূরণ করতে। অভাব আর দারিদ্র্যতা দেবে কি তাকে এগিয়ে যেতে? রিয়া উপজেলার মাছাবান্দা নামাচর (পাত্রখাতা) এলাকার রাজু মিয়া প্রথম কন্যা। বাবা দিনমজুর কাজ করলে জোটে আর না করলে পরিবারের সবাই তা বোঝে। কষ্ট দুঃখ আর অভাব যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। শত কষ্ট শত বাধার পরও রিয়া থানাহাট বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (ভোকে.) থেকে জিপিএ-৫ পায়।

সূত্র: মানব জমিন

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর