বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৪:১৭ পিএম


এমপিওভুক্তি নয় জাতীয়করণ চাই

প্রদীপ কুমার দেবনাথ

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ৭ আগস্ট ২০২০  

জাতি গঠনের কারিগর, জাতির বিবেক, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান খ্যাত শিক্ষকরা আজ বড় অসহায়। সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী জাতির এ বাতিঘর দের করুণ জীবন-যাপন, কষ্টের দিনাতিপাত, তাদের অসহায়ত্ব, সীমাহীন কষ্টের নিদারুণ প্রাত্যহিক জীবন যেন আদিম কালকেই হার মানায়। বর্তমানকালে শিক্ষকতার পেশাটাই যেন এক অভিশাপের নাম। 

স্কুল জীবনে লক্ষ্য নির্বাচনে শিক্ষকতাকেই আমরা অনেকে নির্ধারণ করি। তখন মনে থাকে রঙ্গিন স্বপ্ন। আমাদের শিক্ষকদের হাসি মাখানো মুখ, সুন্দর পরিপাটি থাকা, গুছিয়ে গুছিয়ে কথা বলা ও চমৎকার অঙ্গভঙ্গি দেখে আমরা কখনও অনুভব করতে পারিনা যে একজন শিক্ষক কত কষ্ট, কত অভাব ও কত যন্ত্রণা মনে পোষণ করে এখানে হাসিমাখা মুখ নিয়ে আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কখনও ভাবিনা মাত্র ১২০০০ থেকে ২৫০০০ টাকায় কিভাবে চলে একজন শিক্ষকের পরিবার?
 
এমপিওভুক্তি নামক পদ্ধতিটিই শিক্ষকদের জন্য এক বিষফোঁড়া। এই পদ্ধতিতে নব্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষকের সকল কাগজপত্র আপডেট থাকার পরও অনলাইন আবেদন করলে দেখা যায় হঠাৎ জারি হওয়া পরিপত্র মোতাবেক আবার নতুন করে কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে কর্তাদের নিজস্ব জারি করা আদেশে দীর্ঘসূত্রতা শুরু হয় এমপিওভুক্তিতে, চলে মাসের পর মাস বছরের পর বছর। দুশ্চিন্তা এবং চরম উৎকন্ঠায় কাটানো শিক্ষকগণ অবশেষে এমপিওভুক্ত হলেও স্বল্প বেতনে কষ্টের জীবনযাপন শুরু হয়। আশায় বুক বাঁধে হয়তো স্বল্পতম সময়ে পেয়ে যাবে জাতীয়করণ। স্বপ্ন আজীবনই স্বপ্ন হয়ে থাকে। এক সময় চাকরির মেয়াদ শেষ হয়।

মেয়াদ শেষে যেখানে নিয়মমাফিক নিজের সঞ্চিত কল্যাণট্রাস্ট ও অবসরভাতা পাওয়ার কথা, সেখানে শুরু হয় আরও চরম ভোগান্তি। এখানে আরও এলোমেলো অবস্থা। দফায় দফায় কাগজপত্র নেওয়া শুরু হয়। একটার পর একটা এভাবে সব চাহিদা পূরণ করার পরও, বছরে ৩৫ বার অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের কর্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে করতে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও জুটেনা চাকরী কালীন সময়ে জমানো অর্থ। এ যেন কল্যাণ নামক অকল্যাণের ভূত অসহায়, বৃদ্ধ, শারীরিক ভাবে অক্ষম জাতির বিবেকদের জীবনে খরগ হয়ে দেখা দেয়।

বেসরকারি শিক্ষকদের উপর যে কত প্রকারের নির্যাতন, উর্ধতন কর্মকর্তাদের যে বিমাতাসূলভ আচরণ তাতে মনে হয় শিক্ষকতাটাই একটা অভিশাপ। এ যেন অভিশপ্তদের জন্য নির্ধারিত চাকরি।

চাকরিতে প্রবেশের সময় অসুবিধা ( অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে নিয়োগ প্রদান), এমপিওভুক্তিতে সমস্যা, টাইমস্কেল ও উচ্চতর স্কেলে সমস্যা, পদোন্নতি নেই, পদোন্নতি চাইলে চাকরি ছেড়ে নতুন ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়া ( অদ্ভুত পদ্ধতি), সিকি ভাগ বোনাস ( নামেমাত্র), শ্রান্তি বা বিনোদন ভাতা নেই, হাস্যকর বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা সর্বোপরি পেনশন ও কল্যাণের নামে নির্যাতন। তাছাড়া একজন শিক্ষককে প্রাতিষ্ঠানিক ও ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নির্যাতন সহ অসংখ্য নির্যাতনের নিরব স্বাক্ষী নিরীহ এই শিক্ষকরা।

তাই এমপিওভুক্তি নামক নির্যাতন থেকে মুক্তি চায় বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। যেখানে শতভাগ বেতন, বৈশাখী ভাতা, বোনাস, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা সবই সরকারি, সেখানে বেসরকারি তকমা লাগিয়ে অসহায় এই শিক্ষকদের কল্যাণট্রাস্ট আর অবসর বোর্ডের নির্যাতন আর সংশ্লিষ্ট অফিস কর্তা ও ম্যানেজিং কমিটির রোষানলের শিকার সহ অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা সমাধানের একমাত্র পথ জাতীয়করণ। জাতীয়করণ হলে শুধু শিক্ষকরা উপকৃত হবে এমন নয়, উপকৃত হবে শিক্ষার্থীরা, উপকৃত হবে জাতি ও উপকৃত হবে সমগ্র দেশ।
তাই, শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে বেসরকারি শিক্ষাকে জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর