শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ১৮:৪৩ পিএম


‘এভাবে চাকরি পাবো কল্পনাই করিনি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৪০, ৯ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২০:২৪, ৯ জুলাই ২০১৯

মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মাত্র ১০০টাকায় পুলিশে চাকরি পেয়েছেন নীলফামারীর লাবু, লিজা, সুমন, মাসুদাসহ ১২৯জন। নীলফামারী সদর উপজেলার চড়াইখোলা বসুনিয়াপাড়া গ্রামের ওবায়দুর রহমানের ছেলে লাবু ইসলাম। বাবা পেশায় একজন রাজমিস্ত্রির সহকারী। দুইভাই এক বোন। সবার চেয়ে সে বড়। নীলফামারীর মশিউর রহমান ডিগ্রী কলেজে বিএ শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।

বাবার আয়েই সংসার ও তিনভাই-বোন অনেকটাই কষ্ঠ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশে চাকরির পূর্বে সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার আবেদন করে। পাশও করে। কিন্ত অদৃশ্য মামা না থাকায় চাকরি তার ভাগ্যে জোটেনা। লাবুর পুলিশে চাকরি হওয়ায় অপর ভাই ও বোনের পড়াশোনার খরচ আর বন্ধ হবেনা বলে জানালেন তার পিতা ওবায়দুর রহমান।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার পশ্চিম চিকনমাটি দোলাপাড়া গ্রামের কবির হোসেনের চতুর্থ কন্যা শাম্মি আক্তার লিজা। বাবা পেশায় একজন কৃষক। ডোমার সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ ও সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। পুলিশে চাকরি হওয়ার কারণে আর সুযোগ পেলে পড়লেখা চালিয়ে যাবেন বলে জানান লিজা।

সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাহালিপাড়া চৌধুরীবাজার এলাকার মিজানুর রহমানের ছেলে সুমন রানা। বাবা পেশায় একজন রিকশা চালক। নীলফামারী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর নীলফামারী সরকারী কলেজে গণিত বিভাগের অনার্স পড়ছে সে।

সুমন জানান, আমি টিউশনি করে চলি। আমরা তিন ভাই দুই বোন। এভাবে চাকরিটা পাবো কল্পনাই করিনি। আমার চাকরির জন্য একটি টাকাও কোথাও খরচ করতে হয়নি।

আরেক চাকরি পাওয়া মাসুদা আক্তার। জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা ইউনিয়নের ভবনচুর এলাকার গোলাম মাসুদের বড় মেয়ে সে। জলঢাকা ডিগ্রী কলেজ থেকে এবারে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে মাসুদা।

মাসুদা জানান, বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ১০০টাকা দিয়ে ট্রেজারি চালান ফরম সংগ্রহ করে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারী খাতে ১০০টাকা জমা করি।

এরপর ২২জুন শারীরিক পরীক্ষার দিনে পুলিশ লাইন্সে গিয়ে দাড়িয়ে প্রথম স্তরে সফলতা পাই। এরপর লিখিত পরীক্ষা এবং সাক্ষাৎকার শেষে আমি চাকরির জন্য নির্বাচিত হই।

তিনি বলেন, আমার ইচ্ছে ছিলো পুলিশে চাকরি করবো সেটি পূরণ হয়েছে। এর পেছনে আমার বাবার সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে। মাসুদা বলেন, যেভাবে স্বচ্ছ পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এজন্য পুলিশ বিভাগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

শুধু লাবু, লিজা, সুমন, মাসুদাই নয় মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নীলফামারীতে মাত্র ১০০ টাকায় চাকরি হয়েছে ১২৯জনের। এদের মধ্যে এবারই প্রথম এতিম কোটায় চাকরি পেয়েছেন একজন এতিম।

তবে ডোপ টেষ্টে মাদকাসক্ত প্রমাণ হলে চাকরি থেকে বাদ পড়ারও শংকা রয়েছে চুড়ান্ত ভাবে নির্বাচিতদের। জেলা পুলিশ সুত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

সুত্র জানায়, সারাদেশে পুলিশে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নীলফামারীতে প্রথম ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় গেল ২২জুন।

এদিন নীলফামারী পুলিশ লাইন্স মাঠে প্রায় দুই হাজার ৫’শ জনের মধ্য থেকে শারীরিক বাছাই শেষে (প্রাথমিক বাছাই) ৭৭৮জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়।
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৪৬জনকে নির্বাচন করা হয় সাক্ষাৎকারের জন্য। সাক্ষাৎকার শেষে ২৭ জুন সকালে প্রকাশ করা হয় চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা।

নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে পুলিশ মহাপরিদর্শকের প্রতিনিধি হিসেবে নীলফামারীতে ছিলেন এসপি ও অতিরিক্ত এসপি পর্যায়ের দু’জন কর্মকর্তা। জেলা পুলিশ সুত্র জানায়, নীলফামারীতে ২৯জনকে নেওয়ার কথা থাকলেও ১২৯জনকে নির্বাচিত করা হয়। দীর্ঘদিন থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ না হওয়ায় সেগুলো পূরণ করেও অবশিষ্ঠ অপূর্ণ পদগুলো পূরণ করতে মেধাবীদের নেওয়া হয়েছে এবারে। বাদ যায়নি আনসার ভিডিপি, এমনকি এতিম কোটাও।

জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন(পিপিএম) বলেন, অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। যোগ্য ও মেধাবীদের মুল্যায়ণ করা হয়েছে চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, যারা চাকরি পেয়েছেন বেশির ভাগই দরিদ্র ঘরের সন্তান।

চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি এমনকি সরকারী কোন নিয়মকে উপেক্ষা করা হয়নি। তবে তিনি বলেন, ডোপ টেষ্টে কেউ মাদকাসক্ত প্রমাণ হলে সে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না।

আরও পড়ুন: ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন খারিজ করে দিল আদালত

এদিকে নীলফামারী সরকারী শিশু পরিবার থেকে এবারই প্রথম রবিউল ইসলাম নামের একজন এতিমের চাকরি হলো। যা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সমাজ সেবা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা।

সমাজ সেবা অধিদপ্তর নীলফামারীর উপ-পরিচালক ইমাম হাসিম বলেন, কোটা থাকলেও পিছিয়ে পড়ে এখানকার ছেলেরা। নীলফামারীতে যেটি করা হয়েছে নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

চাকরি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে এখানে অবস্থানকারীরা আরো উৎসাহী হবেন এবং মনোযোগ বাড়াবে পড়াশোনায়।

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর