মঙ্গলবার ০২ জুন, ২০২০ ৪:০০ এএম


এনআইডি ও মোবাইল নম্বর পরীক্ষা করে টাকা ছাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫:২১, ১৭ মে ২০২০  

করোনার এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এক ব্যক্তির মোবাইল নম্বর একাধিক ব্যক্তির নামের তালিকার পাশে থাকার অভিযোগ নিয়ে হৈচৈ হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ভেরিফাই করেই প্রত্যেক ব্যক্তির টাকা ছাড় করা হচ্ছে। ফলে অনিয়মের সুযোগ নেই।

গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন তাঁর ফেসবুকের এক পোস্টে লিখেছেন, করোনাকালীন সংকটে নিম্ন আয়ের ৫০ লাখ পরিবারের জন্য দুই হাজার ৫০০ টাকা করে ঈদ উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই তালিকা তৈরি করেছেন স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। হবিগঞ্জ, বাগেরহাটের দুটি ইউনিয়নসহ কয়েকটি জায়গায় কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। শতাধিক নামের বিপরীতে এক বা দুটি ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা গেলে সবার টাকা ওই এক বা দুটি নম্বরের ব্যক্তিরা পেয়ে যাবেন। দেশে মেম্বার ৪১ হাজার ১৩৯ জন, নারী মেম্বার ১৩ হাজার ৭১৩ জন, ইউপি চেয়ারম্যান চার হাজার ৫৭১ জন। এর মধ্যে চার-পাঁচজন এই অপকর্মটি করেছেন।

আশরাফুল আলম খোকন আরো লেখেন, ‘প্রথমত এই অনিয়মটি স্থানীয় পর্যায়ে সরকারই ধরেছে। এমন না যে যাচাই-বাছাই শেষে ওরা টাকা পেয়ে গেছে। আর যদি যাচাই-বাছাই শেষে এই রকম তালিকা কেন্দ্রে আসেও তাও তাদের টাকা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ নামের সঙ্গে ভোটার আইডি নম্বর ও মোবাইল নম্বর অটোমেটেড সিস্টেমে ভেরিফাই করে এরপর টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ১৭ কোটি মানুষের দেশে চার-পাঁচজন দুর্নীতিবাজ এ রকমটি ঘটাবে না, তা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। ঘটনার প্রতিকার হয়েছে কি না সেটা দেখেন? এখন আর কোনো চাল চুরির খবর শোনেন? সব বন্ধ হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখেন। দেশ ভালো থাকবে, আপনারাও ভালো থাকবেন।’

বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মানবিক সহায়তার তালিকায় ৪০ জন উপকারভোগীর নামের পাশে নিজের মোবাইল নম্বর দেওয়া সেই ইউপি সদস্যকে শোকজ করেছে উপজেলা প্রশাসন। মূলত গতকাল কালের কণ্ঠে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়।

এদিকে চারটি ইউনিয়ন থেকে জমা দেওয়া চার হাজার সুবিধাভোগীর নাম সংশোধন করে সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া ওই তালিকায় সরকারি অন্যান্য সুবিধাভোগকারী, চৌকিদার, সচ্ছল ব্যক্তিদের নামসহ বিভিন্ন অনিয়ম থাকায় তা যাচাই-বাছাইয়ে ধরা পড়ার পর সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে পুনরায় তালিকা প্রণয়ন করেন ইউএনও সরদার মোস্তফা শাহিন।

অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. রাকিব হাসান জানান, তাঁর ওয়ার্ডের আট সদস্যবিশিষ্ট কমিটি তালিকা তৈরি করে উপকারভোগীদের নিজ নিজ মোবাইল নম্বরসহ ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু পরিষদ থেকে কম্পিউটার প্রিন্টে ৪০ জন উপকারভোগীর মোবাইল নম্বরের স্থলে তাঁর নম্বরটি ছেপে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টিতে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে তিনি দাবি করেন।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত তালিকায় সুবিধাভোগীদের নামের পাশে প্রত্যেকের মোবাইল নম্বর দেওয়ার কথা। কিন্তু পরিষদ থেকে যে তালিকা এসেছে তাতে বেশ কয়েকজন মেম্বারের মোবাইল নম্বর একাধিক নামের পাশে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এভাবে তিন শতাধিক নাম ও মোবাইল নম্বর সংশোধন করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ত্রাণ প্রাপ্যদের তালিকা প্রস্তুত করার দায়িত্ব পালন করছে সিটি করপোরেশন। ত্রাণ তালিকা তৈরি ও তা যাচাই-বাছাই করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে ২১ সদস্যের একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর। যুগ্ম আহ্বায়ক সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর। একজন নারী কাউন্সিলরের নির্বাচনী এলাকা তিনটি ওয়ার্ড মিলে বিধায় তিনি তিনটি ওয়ার্ডেরই যুগ্ম আহ্বায়ক। কমিটিতে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ছাড়াও রয়েছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ১৬ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি। এঁরা মিলেই তালিকা তৈরি করেন। তাঁদের প্রস্তুত করা ত্রাণের তালিকা ডাটাবেজ করার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন এটুআই প্রকল্পের দুজন কর্মী।

ওয়ার্ডের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ত্রাণ প্রাপ্যদের তিন ধরনের তালিকা করা হচ্ছে। ওএমএস, পারিবারিক কার্ড ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করার একটি তালিকা। ওএমএস কার্ড তৈরির কাজ শেষ হয়েছে, পারিবারিক কার্ডে ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহম্মাদ শরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর ওয়ার্ডে তিন ধরনের তালিকার কাজই শেষ। তবে অন্যান্য ওয়ার্ডে এখনো তালিকা তৈরি চলছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ  বলেন, ‘ঢাকা শহর এলাকার মধ্যে চলা ত্রাণ কার্যক্রমের সার্বিক দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা মেয়রের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ প্রার্থীদের তালিকা তৈরি এবং ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।’ একই তথ্য জানিয়েছেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ত্রাণ বরাদ্দের সময় ঢাকা জেলা, ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদাভাবে উল্লেখ করে দেওয়া হয়। শহর এলাকার ত্রাণ কার্যক্রম সিটি কপোরেশনগুলোই করে।’ (প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন বাগেরহাটের শরণখোলা প্রতিনিধি)

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর