শুক্রবার ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩৮ পিএম


এক মাদরাসার সব পরীক্ষার্থীই ভুয়া!

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩:০১, ১৪ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:৩৮, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি দাখিল মাদরাসা থেকে এ বছর ২২ জন শিক্ষার্থী জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষা শুরুর দিনই অনুপস্থিত ছিল ৬ জন। আর বুধবার (১৩ নভেম্বর) পর্যন্ত অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ১২জনে। অভিযোগ উঠেছে এসব পরীক্ষার্থীর সবাই ভুয়া। ইতোমধ্যে অনুপস্থিত ১২জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২ জনকে ভূয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২ নভেম্বর থেকে সারা দেশে জেডিসি পরীক্ষা শুরু হলে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার বৈরাতি দাখিল মাদরাসা থেকে ২২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য প্রবেশপত্র সংগ্রহ করে। উপজেলার কাকিনাহাট মোস্তাফিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্র থেকে প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

কিন্তু পরীক্ষা শুরুর দিনেই ওই মাদরাসার ৬ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। বাকী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে এলে পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তার চোখে শিক্ষার্থীদের অনেকের বয়সের বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর তিনি তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টি তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারেন, প্রতিষ্ঠানটির হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়া অনেকেই বিভিন্ন স্কুলও কলেজ থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রী।

এদের মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলার বাবর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ১০ম শ্রেনীর ছাত্রী সিতুলী বেগম জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। জেডিসি পরীক্ষায় তার রোল নম্বর ২৩৮৭৮৪।

সিতুলী বেগমের মা সাদেকা বেগমের সাথের যোগাযোগ করা হলে তার মেয়ে জেডিসি পরীক্ষার অংশ নিয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, মেয়েকে ৫’শ টাকা দিয়ে আবুল কাশেম পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেন। তিনি বুঝতেও পারেননি যে এটা অন্যায়।

আরেক ছাত্রী আফসিন খাতুন । তিনি করিম উদ্দিন পাবলিক ডিগ্রী কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৩.৪৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনিও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। আফসিন খাতুনের রোল নম্বর ২৩৮৭৮৬।

ওই দিন থেকেই বাকী শিক্ষার্থীরা বিষয়টি আচ্ করতে পেরে ওই ২ শিক্ষার্থীসহ আরো ৪ শিক্ষার্থী বাকী পরীক্ষাগুলো দিতে আসেন নাই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈরাতি দাখিল মাদরাসার সুপার ফাতেমা বেগম ও তার স্বামী আবুল কাশেম এসব ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছেন। ১৯৯৭ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করে এখন পর্যন্ত ১৭জন শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছেন সুপার। আর এসব শিক্ষকদের প্রত্যেকের নিকট থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা।

বুধবার (১৩ নভেম্বর) সরেজমিন গিয়ে বৈরাতি এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, দুই তিন বছর থেকেই মাদরাসাটি বন্ধ রয়েছে। জরাজীর্ণ মাদরাসা ঘরটির ভিতরে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় বখাটেরা জুয়ার খেলার আসর বসান।

স্থানীয় বাসিন্দা সমসের আলী জানান, মাদরাসাটি প্রথম প্রথম কিছুদিন চলছিল। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে।

তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘এটি তৈরী হয়েছে জুয়া খেলার জন্য ।’এসময় উপস্থিত শহিদুল ইসলাম আরেক বাসিন্দাও একই কথা বলেন।

এ ব্যাপারে বৈরাতী দাখিল মাদরাসা সুপার ফাতেমা বেগমের সাথে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে রংপুরে অবস্থান করছেন জানিয়ে মোবাইল কেটে দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাকিনাহাট মোস্তাফিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রের সচিব মো. সাহেদার রহমান বলেন, শারীরিক গঠন দেখে প্রথমে সন্দেহ হয়। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তাসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হয়।

কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও কালীগঞ্জ একাডেমিক সুপারভাইজার মো. জাকির হোসেন বলেন, তাদের মধ্যে ২জন যে ভুয়া পরীক্ষার্থী এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পরীক্ষা কমিটির সভাপতি মো. রবিউল হাসান বলেন, বয়স প্রমাণের জন্য ওই মাদরাসা থেকে জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া সকল শিক্ষার্থীর পিএসসি পরীক্ষার সদনসহ প্রমানাদি নিয়ে ১২ নভেম্বর সুপারকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিনি আসেননি। বুধবার (১৩ নভেম্বর) তাকে আবারও চিঠি দেয়া হয়েছে। সঠিক কাগজপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি ।

এডুকেশন/এমআর/কেআর

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর