বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ১৩:১৩ পিএম


এক বছর জেল খেটেও চাকরিতে থাকার সুযোগ সরকারি কর্মচারীদের

বাহরাম খান 

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ২৯ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১১:৫৩, ২৯ অক্টোবর ২০১৯

পুরনো আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হতেন। নতুন আইনে এক বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেই কেবল বরখাস্তের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ অপরাধের প্রমাণ হয়ে এক বছর জেল খেটেও চাকরিতে বহাল থাকবেন সংশ্লিষ্ট কর্মচারী। এতে করে একজন অপরাধীকে চাকরিতে বহাল থাকার সুযোগ দিল সরকার।

গত ১ অক্টোবর ‘সরকারি চাকরি আইন-২০১৮’ কার্যকর হওয়ার দিন থেকে ছয়টি পুরনো আইন ও অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে গেছে। এর মধ্যে ‘গণকর্মচারী অধ্যাদেশ, ১৯৮৫’ (সাজাপ্রাপ্তির কারণে বরখাস্ত) রয়েছে। এই অধ্যাদেশের ৩(১) ধারা অনুযায়ী, ‘...কোনো গণকর্মচারী ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হলে রায় বা সাজার আদেশ ঘোষণার তারিখ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হিসেবে গণ্য হবেন।’

কিন্তু নতুন কার্যকর হওয়া সরকারি চাকরি আইনে বরখাস্তের বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে। এই আইনের ৪২ ধারায় ‘ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত কর্মচারীর ক্ষেত্রে ব্যবস্থা’ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। আইনের ৪২(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড বা এক বৎসর মেয়াদের অধিক মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইলে, উক্ত দণ্ড আরোপের রায় বা আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে চাকরি হইতে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হইবেন।’ এতে এর কম দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারীর চাকরিতে থাকতে কোনো বাধা থাকল না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসনসংক্রান্ত একাধিক বইয়ের লেখক ফিরোজ মিয়া বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারীকে চাকরিতে বহাল রাখার প্রশ্নই ওঠা উচিত নয়। তিনি বলেন, একজন জেলখাটা কর্মচারী জেল থেকে বের হয়ে অফিসে এলে তার সহকর্মীরাই তো অস্বস্তিবোধ করবে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ একজন জেলফেরত মানুষের কাছে কেমন সেবা আশা করতে পারেন?

তবে এক বছর পর্যন্ত শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন আইনে। সরকারি চাকরি আইনের ৪২(২) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে তিরস্কার, নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, নিম্ন পদ বা নিম্নতর বেতন স্কেলে অবনতি করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সরকারি অর্থ বা সম্পত্তির ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করে থাকলে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে সরকার।

কার্যকর হওয়া নতুন সরকারি চাকরি আইনে বেশ কিছু করণিক ভুলও ধরা পড়েছে। এসব ভুল সংশোধনে আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের চাকরিতে বহাল থাকার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘একজন কর্মচারী দোষী সাব্যস্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়াটাকে আমরা অমানবিক হিসেবে দেখেছি। তাই এক বছরের সময় দেওয়া হয়েছে।’

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা ঘোরতর অন্যায়। দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও কোনো কর্মচারীকে চাকরিতে বহাল রাখা উচিত নয়।’ তিনি বলেন, এতে করে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি করার আত্মবিশ্বাস জন্ম নেবে। সাধারণ মানুষ ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে। এ বিষয়টি সংশোধন হওয়া উচিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুদারের মতে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, এমনিতেই দুর্নীতির সুযোগ বেড়ে যাচ্ছে। আরো কঠোর আইন হওয়া প্রয়োজন। সেখানে আগের চেয়ে দুর্বল আইন! এটা গ্রহণযোগ্য নয়। বদিউল আলম আরো জানান, বঙ্গবন্ধু নিজেই বলে গেছেন, সরকারি কর্মচারীরা আমাদের ভাই-বন্ধু। তাদের জন্য আলাদা আইন লাগবে কেন?

এদিকে কর্মচারীদের গ্রেপ্তারের সরকারি অনুমতির বিষয়ে রিট হয়েছে উচ্চ আদালতে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ধারাকে কেন বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। গত ২১ অক্টোবর বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের বেঞ্চ রুল জারি করেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারোয়ার আহাদ চৌধুরী, এখলাছ উদ্দিন ভূইয়া ও মাহবুবুল ইসলাম রিট করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে যে তারা শাসক নন, সেবক। সরকারি কর্মচারীরা একটি আলাদা জাতি নয়। আইনের চোখে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদেরও সেই অধিকার।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আল-আমিন বলেন, ‘আইনটি নিয়ে আদালতে হওয়া রিট বিষয়ে আমরা খোঁজ নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, অনেক যাচাই-বাছাই হয়ে জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমার জায়গা থেকে কোনো মন্তব্য করার উপায় নেই।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর