বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ৭:২১ এএম


একাডেমিসহ রেলের হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটে খাচ্ছেন যুবলীগ নেতা!

নূপুর দেব

প্রকাশিত: ০৭:৫৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯  

 

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনিং একাডেমি (আরটিএ)। সারা দেশে রেলওয়েতে নিয়োগ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে অবস্থিত এই ট্রেনিং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের এই ট্রেনিং একাডেমির হাজার কোটি টাকার জায়গা ও বিভিন্ন স্থাপনা লুটেপুটে খাচ্ছেন যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর।

ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর আগেই চট্টগ্রামে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত কয়েকজন ক্যাডারের বেষ্টনীর মধ্যে চলা বাবর বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাঁর নিয়ন্ত্রণেই আছে অনেক সরকারি সম্পদ। তিনি ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণ সভাপতি (সম্প্রতি বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে সংগঠনের বিভিন্ন নেতা জানান।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ওই ট্রেনিং একাডেমির মোট জায়গা ৬৮ দশমিক ৩৯ একর। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২৫ মে চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ শাহ আলম সিলভার জুবলী লিমিটেডের নামে ২৫ দশমিক ৯০ একর জলাশয় (তত্সংলগ্ন ভূমিসহ) মৎস্য চাষ/মৎস্য শিকার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে লিজ নেন আরটিএ কর্তৃপক্ষ থেকে। এরপর আরো তিন দফায় কয়েক একর জায়গা ও দুটি স্থাপনা (পরিত্যক্ত ভবন) লিজ নিয়েছিলেন বিএনপির কোনো পদে না থাকা এই শাহ আলম।

গত শনিবার মোহাম্মদ শাহ আলম  বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদে লিজ নেওয়া এসব জায়গা ও স্থাপনা এক বছর না যেতেই গোপনে তাঁর কাছ থেকে পাওয়ারনামা (দখলস্বত্ব) নিয়েছেন যুবলীগ নেতা বাবর। এরপর সেখানে কী পরিমাণ জায়গা দখল-বেদখলসহ কী হচ্ছে, তা তাঁর জানা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার অভিযোগ, রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির প্রায় ৩০ একর জায়গা লিজ নিয়ে আশপাশের আরো অন্তত ২৫ থেকে ৩০ একর জায়গা অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। কয়েক মাস আগে শাহ আলমের সঙ্গে জায়গা ও স্থাপনার চুক্তিপত্র (লিজ) বাতিল করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে লিজ বাতিলের পরও অবৈধ দখলে রয়েছে রেলওয়ের হাজার কোটি টাকার সম্পদ।

একাধিক রেলওয়ে কর্মকর্তা জানান, ধরতে গেলে ট্রেনিং একাডেমির ৬৮ একর জায়গার মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ একর জায়গা বেদখলে। এতে ট্রেনিং একাডেমির জায়গা সংকুচিত হতে হতে এখন সাত-আট একর আছে। দখলদারদের দ্রুত উচ্ছেদ করা না হলে ট্রেনিং একাডেমির অস্তিত্ব বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে।

ট্রেনিং একাডেমি ও পূর্ব রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছুদিন আগেও রেলমন্ত্রীসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে গেছেন। এর আগে গত তিন বছরেও বিভিন্ন সময় মন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে তাঁদের অবৈধ দখলদারদের বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা বাবর একাডেমির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও তাঁর ভয়ে কেউ টুঁ শব্দও করছে না।

অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বিএনপি নেতা পরিচয়ধারী শাহ আলম ওই জায়গা একের পর এক লিজ নেন। পরে এসব লিজের জায়গা বাবর দখলে নিয়ে আরো অতিরিক্ত জায়গা দখল করে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছেন। সেখানে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে বাবরের লোকজন আরটিএসহ আশপাশে নজরদারিও করছে।

৬৮ একরের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ একর জায়গা অবৈধ দখলে চলে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ গত শনিবার বলেন, ‘দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।’

একই বিষয়ে গত বুধবার প্রশ্নের জবাবে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা ইশরাত রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভূসম্পত্তি বিভাগ লিজ দেয়নি। লিজ দিয়েছে আরটিএ। জলাশয়ের ২৫ একরের যে লিজ ছিল, সেটি এরই মধ্যে বাতিল হয়েছে। ৭১টি অবৈধ স্থাপনা আছে। অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করব।’

রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির জায়গা লুটেপুটে খাওয়ার অভিযোগ বিষয়ে শাহ আলম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে (ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান) ১৫ থেকে ২০ দিন আগে রেলওয়ে প্রশাসন আমাকে ডেকেছিল। তারা চুক্তি লঙ্ঘনসহ লিজ বাতিলের বিষয়টি জানান। আমি তাঁদের (রেল কর্মকর্তা) বলেছি, আমার নামে লিজ থাকলেও জায়গা এবং স্থাপনা দীর্ঘদিন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০১৫ সালে প্রথমে আমি ২৭ একরের একটি বড় পুকুর লিজ নিয়েছিলাম। এরপর তিন একর জায়গা নার্সারির জন্য, দুটি স্থাপনাসহ মোট চার দফায় লিজ নিয়েছি। পাঁচ বছরের লিজ নেওয়ার পর আমি এক বছর ব্যবহার করেছি। আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক শামসুজ্জামান লিটন নামক একজনের নামে পাওয়ার নিয়েছেন উনি (বাবর)। আমার নামে লিজ থাকলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল না। লিজ পাঁচ বছরের এবং এরপর প্রতিবছর নবায়ন করার কথা। লিজের মেয়াদ আরো এক বছর ছিল। কিন্তু বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে কিছুদিন আগে তা বাতিল করা হয়। এই বাতিলের বিরুদ্ধে তারা (বাবরপক্ষ) আদালতে স্থগিতাদেশ এনেছে বলে শুনেছি।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, মোহাম্মদ শাহ আলম নামে বিএনপির কোনো নেতা চট্টগ্রামে নেই। দল ক্ষমতায় (বিএনপির আমল) থাকাকালে কেউ নিজেকে দলের নেতা পরিচয় দিতে পারে; কিন্তু পদে না থাকলে তো দলের প্রকৃত নেতা হওয়া যায় না। সূত্র কালের কণ্ঠ পত্রিকা

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর