বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ৪:৪৮ এএম


উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সাক্ষরতা প্রকল্পে ঘুষ বাণিজ্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮:২৫, ৭ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ১৩:২১, ৭ এপ্রিল ২০১৯

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সেবামূলক মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (বিএলপি) ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে অন্তর্ভূক্তি নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগের পর এবার নবায়নেও একই অভিযোগ উঠল। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক ও প্রকল্প পরিচালকের নাম ব্যবহার করে প্রকল্পের তালিকাভূক্ত এনজিওগুলো থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ভূক্তভোগী কয়েকটি এনজিও সূত্রে জানা গেছে, বিএলপি প্রকল্পে তালিকাভূক্ত ২৫০টি এনজিও নিয়ে গড়ে তোলা সংগঠন নন-ফরমাল এডুকেশন ফোরামের (এনএফই) মাধ্যমে ঘুষের এ টাকা তোলা হচ্ছে। তবে ঘুষ বা তাদের নামে টাকা তোলার বিষয়টি একবোরেই অবহিত নন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আবদুর রহমান। একইভাবে এনএফই’র সভাপতিসহ অন্য কর্মকর্তারাও টাকা তোলার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য তারা কাজ করে চলেছেন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, ১৫ থেকে ৪৫ বছরের নারী-পুরুষদের সাক্ষর সম্পন্ন করে তুলতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অধীনে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (বিএলপি) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০১৩ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এরপর ২০১৪ সালে এটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা কারনে দীর্ঘ দিন এ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পের কার্যপরিধি অনুযায়ি, এনজিও’র মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু এনজিও নিয়োগ ও নবায়নে নয়ছয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএলপি প্রকল্পে তালিকাভূক্ত করতে বিভিন্ন এনজিও’ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম (সাবেক যুগ্ম-সচিব)। সেই সময় উৎকোচের বিনিময়ে এ প্রকল্পের কাজ একশ’ ৩৬টি এনজিও’র মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়। এ প্রকল্পে অর্ন্তভূক্তি করতে প্রতিটি এনজিও থেকে গড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে নেয়া হয়। পরে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের কারণে সাবেক প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম চাকুরিচ্যুত হন। ওই কর্মকর্তার বিদায়ের পরও অনেক এনজিও থেকে টাকা নেয়া হয়। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর বিএলপি সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে প্রকল্পের কাজের জন্য এনজিও নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস আগে এর কার্যক্রম শুরু করেছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ধাপে যারা তালিকাভূক্ত হন দ্বিতীয় ধাপে নবায়নের জন্য গত নভেম্বরে প্রতিটি এনজিও থেকে ফের টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে চুক্তি করতে আসা এনজিওগুলো থেকেও প্রতি উপজেলার জন্য গড়ে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত করে ঘুষ নেয়া হয় বলে ভূক্তভোগীরা জানিয়েছেন। মূলত প্রকল্পের তালিকভূক্ত ২৫০টি এনজিও’র নামে গড়ে তোলা সংগঠন নন- ফরমাল এডুকেশন (এনএফই) মাধ্যমে তোলা এ টাকা চলে যায় ওপর মহলে। এনএফই’র সভাপতি হায়াতুন নবী নিজেও অনেক এনজিওকে ফোন দিয়ে নবায়নের টাকা চেয়েছেন। একই ধরনের অভিযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। একাধিক এনজিও’র কর্মকর্তা মানবজমিনের কাছে এ অভিযোগ করেন।

ভূক্তভোগীরা জানান, তাদের নাম প্রকাশ পেলে নিজের এনজিওর বিরুদ্ধে কোন এক অনিয়মের অভিযোগ এনে মামলা করে দেবে। একবার মামলা হলে বিএলপিসহ কোন প্রকল্পেই কাজ করা যাবে না। এমনকি এনজিও বন্ধ করে দেয়ারও শঙ্কা থেকে যায়। তাই কিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএলপি প্রকল্পের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ঘুষ নেয়া কিংবা আমার নামে টাকা তোলার বিষয়টি একেবারেই অবহিত নই। চুক্তি নবায়নের আগে প্রত্যেক এনজিওকে চিঠি পাঠিয়েছি। আমাদের স্বচ্ছতার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নবায়ন শেষ করেছি। সামান্য কিছু এনজিও বাকি আছে যেগুলোর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। নবায়নের পর শুরু হয়েছে কার্যক্রমও। গত মাসের ১৭ তারিখ প্রজেক্ট মাঠে গেছে। তিনি বলেন, ২০১৪ থেকে ১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছিলো এ প্রকল্পের নির্ধারিত সময়। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে কোন কাজ হয়নি। এক বছরের জন্য ফের প্রকল্প বাড়ানো হয়েছে। এনএফই’র নেতারা টাকা তুলে ঘুষ হিসেবে প্রকল্পের কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনজিগুলো নিজেরা নিজেদের মধ্যে কি কারনে টাকা তোলেন সেটা তাদের ব্যাপার। আর আদৌ তারা টাকা তোলেন কিনা সেটা আমি বলতে পারবো না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিবেদন কমপ্লেক্স নামে এনজিও’র সভাপতি হায়াতুন নবী মজুমদার বিএলপি প্রকল্পের অর্ন্তভূক্ত ২৫০টি এনজিওর সমন্বয়ে নাম সর্বস্ব একটি সংগঠন দাঁড় করায়। নন-ফরমাল এডুকেশন (এনএফই) নামে এ সংগঠনের সভাপতিও হন তিনি। কমিটিতে রয়েছে আরো ১৫টি এনজিও। বিভিন্ন এনজিওর পরিচালকরা অভিযোগ করেছেন, মন্ত্রী, সচিব, ডিজি ও প্রকল্প পরিচালককে টাকা দিতে হবে দাবি করে হায়াতুন নবী টাকা তুলেছেন। তার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বন্ধন সোসাইটি নামে এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন।

এ ব্যাপারে হায়াতুন নবী মজুমদার বলেন, প্রকল্পে সিলেকশনকালে এনজিও থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নেয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিকতার কথা শুনেছি। তবে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে কোন এনজিও যাতে বাদ না পড়ে মুখপাত্র হিসেবে সেদিকে সচেষ্ট ছিলাম। সরকার নীতিগতভাবে দ্বিতীয় ধাপে এ প্রকল্পের কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনএফইর কোন নেতা কারো হয়ে টাকা তোলার বিষয়টি সত্যি নয়। তিনি বলেন, প্রকল্পটিতে অনেক দৈন্যতা আছে। এ সব দৈন্যতা কাটিয়ে উঠলে এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠবে। হায়াতুন নবী বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। তাই দেশের সব ভাল কাজে সব সময় থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু কিছু অর্বাচিনের কথা শুনলে মন খারাপ হয়ে যায়।

এনএফই’র অর্থ সম্পাদক বন্ধন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এনএফই নামে সংগঠনটি দুই মাস আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এনজিওগুলো কি এমনি এমনি কাউকে টাকা দেবে। কেউ যদি টাকা দিয়ে থাকে তা ব্যক্তিগতভাবে নিজে নিজেই দিয়ে থাকতে পারে। কাউকে সাক্ষী রেখে নয়। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমরা কিছু দাবি আদায়ের জন্য কাজ করছি। যেমন আমাদের চেকগুলো যেন আমাদের নামেই আসে। এছাড়াও একাধিক দাবি ছিলো। এর বাইরে আর কিছু হয়নি।

সৌজন্যে: মানব জমিন

এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর