মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল, ২০২০ ১৬:৫৪ পিএম


উপসচিব পদে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হোক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:০৫, ১৬ মার্চ ২০২০  



শওকত হোসেন

বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের উপসচিব বা উপরের পদগুলো প্রজাতন্ত্রের হওয়া সত্ত্বেও, কোন বিশেষ ক্যাডারের আধিপত্য কেন? মোট ক্যাডার ২৭ টি, অথচ উপসচিব বা উপরের পদগুলোয় বিশেষ ক্যাডারের ভাগে ৭৫%, আর অন্যসব ক্যাডার মিলে ২৫%, কতটা হাস্যকর ! এটা কতটা বিবেচনাপ্রসুত, কতটা আইনসিদ্ধ তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
জনপ্রশাসনের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতায় বেড়ে ওঠা ক্ষুদে আমলারাই একসময় সবই নিজেদের রাজত্ব ভেবে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ।
সহকারি কমিশনার হয়ে যোগদান করা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী প্রশিক্ষণ শেষেই নিজের মূল পরিচয় লুকিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে নিজেকে নিরঙ্কুষ ক্ষমতার অধিকারি মনে করে, জনগনের চাকর না হয়ে প্রভূ হয়ে ওঠে। কোথাও কোন জবাবদিহিতা না অযাচিত ক্ষমতা প্রয়োগে ডোমিনেটিং টেনডেন্সি গড়ে ওঠে। কিছুদিন যেতে না যেতেই উপজেলার সর্বময় কর্তকর্তা । ডেপুটি কালেক্টর হয়ে যান জেলা প্রশাসক। তাঁরাই একসময় পূর্ব সুরীদের রেখে যাওয়া রাজত্বে অন্য সব ক্যাডারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সবার উপরে ছড়ি ঘুড়াবার অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী হন, সব মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন।তাদের মধ্যে `কী হনু রে!` মানসিকতার বেড়ে ওঠাদের দ্বারা অন্য ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তাকে অসম্মান, ক্ষমতার অপব্যবহার, এমনকি নিজের নামে পুকুরের নামকরণ তাঁদের মানসিক দেউলিয়াত্বের প্রমান ৷

পরীক্ষা কেন্দ্রের ম্যাজিষ্ট্রেসি করার জন্য শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিলে কাজ গুলো সহজ হয়৷ পরীক্ষা কেন্দ্রে ৩-৫ ঘন্টা কাজ করেন, নকল প্রতিরোধ করেন, ঝুঁকি নেন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা৷ অথচ, কেন্দ্রে ৩ মিনিট উপস্থিত থেকে ক্রেডিট নেন অন্যজন৷ অবৈধ ক্লিনিক ব্যবসা কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ দেখতে স্বাস্থ্য ক্যাডার কর্মকর্তারা অযোগ্য ? খাদ্য ভেজাল, বাজার নিয়ন্ত্রণ সব কিছু কেন তাদের করতে হবে ?

ক্যাডার সার্ভিসের সবগুলো ক্যাডারের মধ্যে একটি বিশেষ ক্যাডার কী এমন অতিরিক্ত যোগ্যতা অর্জন করেছেন যে, সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলেন ? সব মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চপদ দখলের পারদর্শিতা অর্জন করলেন?
উপসচিব বা তদুর্ধো পদগুলো প্রজাতন্ত্রের হওয়া সত্ত্বেও একক আধিপত্য কেন? মোট ক্যাডার ২৭ টি, অথচ বিশেষ ঐ ক্যাডারের ভাগে ৭৫%, আর অন্য ২৬ ক্যাডার মিলে ২৫% । কতটা হাস্যকর, কতটা অবিবেচনাপ্রসুত, কতটা বেআইনি তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
শিক্ষা বিভাগের সমস্যার খুটিনাটি, সময় উপযোগী পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন কৌশল সমস্যা ও সমাধান বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা যেভাবে জানবেন একজন আমলা নিশ্চয়ই সেটা জানবেন না। অথচ সকল পরিকল্পনা-কৌশল প্রনয়ণ করছে আমলারা। সকল বিভাগ একই চিত্র৷ আর আমাদের দুর্ভাগ্য এটাই।

মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান “ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ”গ্রন্থে বলেন“ ..... একটা বিশেষ ক্যাডারকে সিভিল সার্ভিস(রেভিনিউ) করার পরিবর্তে সিভিল সার্ভিস(প্রশাসন/এডমিন) নামক উদ্ভট, হাস্যকর, অযৌক্তিক ও অবাস্তব নামে অভিহিত করে। বাংলাদেশের চাকরী ব্যবস্থায় সবচেয়ে বিপত্তির কারণ এটাই”)। ঐ ক্যাডারের সদস্যরা মনে করেন, তাদের পূর্বসুরীরা সচিবালয় ক্যাডারের দৈর্ঘ্য বরাবর DCR কেটেছিলেন অনেকে আগে। আর সেই সূত্র ধরেই এখন সব ক্যাডারের উপর দখলদারীর অধিকার রয়েছে। আসলে কী তাই ? নির্বাহী বিভাগ বলতে কী শুধু ঐ বিশেষ ক্যাডারকে বুঝায়? ক্যাডারেটি মূলত ট্যাক্স কালেকটরদের । প্রশাসন শব্দটি স্বঘোষিত । নির্বাহী বিভাগ শব্দটি কারো একক অস্তিত্ব নয় এর সাথে আরো অনেক ক্যাডার জড়িত ।
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান তার লেখা ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ (উত্তরণ, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯) গ্রন্থে বলেন, একটি বিশেষ ক্যাডার সার্ভিস তাকেই বলা হয় যার ল্যাডার থাকে সচিব পর্যন্ত অর্থাৎ একটা বিশেষ ক্যাডারভুক্ত (এনক্যাডারড) সদস্যরাই অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতির সাহায্যে স্ব স্ব ক্যাডারের ল্যাডার বেয়ে স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ধাপ সচিব পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ লাভ করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, যিনি কৃষি সার্ভিসের ক্যাডারভুক্ত হয়েছেন তিনিই অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতি লাভ করে সংশ্লিষ্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যন্ত সমুদয় পদে যাওয়ার অধিকারী হবেন”।
উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে সব ক্যাডারের সমান হারে প্রবেশের অধিকার রয়েছে। এসব পদ নির্দিষ্ট কোনো ক্যাডারের জন্য হতে পারে না। কোটার ভিত্তিতে অন্য ক্যাডার থেকে আসা অনেক কর্মকর্তা তার নিজের ক্যাডারের পদমর্যাদার নিম্নস্তর উপসচিব পদে গেলেও পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের খুব মর্যাদাসম্পন্ন পদে তাদের নিয়োগ প্রদান করা হয় না। এই ২৫% কোটা প্রথা বাতিল করতে হবে। রশিদ কমিশন এবং শামসুল হুদা কমিশনের প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় রখে উপসচিব পর্যায়ে ২৭টি ক্যাডার থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মকর্তা বাছাই করতে হবে। অন্য ক্যাডারের সদস্যদের অযোগ্য বিবেচনায় ২৫% কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রহসন বন্ধ করতে হবে । কোন কোটা নয়, উপ সচিব বা উপরের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ক্যাডারের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ চাই, যোগ্যতা প্রমানে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাই।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক
২৪ তম বিসিএস

এডুকেোশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর